পশ্চিমের দুয়ার খুলছে আগামীকাল

প্রমত্ত্য তিস্তার বুকে সেতু নির্মাণের স্বপ্ন ছিল দীর্ঘদিনের। প্রায় দুই যুগ ধরে স্বপ্নের সেতু বাস্তবায়ন দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যান দুই জেলার মানুষ। উত্তরের তিন জেলার সাথে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ও উন্নয়ন বৈষম্য নিয়ে চলা আন্দোলন সংগ্রামের সেই স্বপ্ন এখন সত্যি। দীর্ঘসূত্রিতা আর নানা জটিলতা কাটিয়ে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে সেতুটি। 

উত্তরবঙ্গের সর্ববৃৎ সেতু হিসেবে বুধবার ( ২০ আগস্ট)  সর্বসাধারণের জন্য উম্মুক্ত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে পূর্ব-পশ্চিমের সন্ধি এখন সন্নিকটে। 

বহুল প্রত্যাশীত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ঘাট থেকে কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দর পর্যন্ত তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে সেতুটি। ১ হাজার ৪৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটির প্রস্থ ৯ দশমিক ৬ মিটার। যা এলজিইডির ইতিহাসে দীর্ঘতম সেতুর মাইলফলক। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত এ সেতু বুধবার দুপুর ১২টায় উদ্ধোধন করবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূইয়া। সেতু উদ্ধোধনের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ায় নতুন আশায় বুক বাঁধছে এ অঞ্চলের লাখ-লাখ মানুষ।

এলজিইডি কর্তৃপক্ষ বলছে, ইতোমধ্যে সেতুটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সকল প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নামে সেতুটির নাম করণ করা হয়েছে। এই সেতুর কারণে কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার লাখো মানুষের ভাগ্যে বদলে যাবে।

এদিকে, উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘতম সেতুটির উদ্বোধন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার কমতি নেই। সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে সাজসাজ রবে মেতে উঠেছে দুই জেলার মানুষ। স্থানীয়রা বলছেন, মাওলানা ভাসানী সেতুটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। ব্যবসা-বানিজ্যের প্রসার ঘটলে অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ চরাঞ্চলবাসীর কষ্ট লাঘব হবে। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার কয়েক লাখ মানুষের দুর্ভোগ ঘুচিয়ে  রাজধানী ঢাকার সাথে অন্তত ১০০ কিলোমিটার দুরত্ব কমে আসবে।

তবে উদ্বোধনের আগে সেতুর নামকরণ ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ এর নামকরণ করেছে ‘মাওলানা ভাসানী সেতু’। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, এটি হওয়া উচিত ছিল ‘শরিতুল্যাহ মাস্টার তিস্তা সেতু’।

‎স্থানীয় সরকার প্রকৌশল (এলজিইডি) অফিস সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার (জিওবি), সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের (ওফিড) অর্থায়নে ৯২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ২০১২ সালে তিস্তা নদীর উপর দ্বিতীয় সেতু হিসেবে নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয় করে সরকার। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি সেতুটির নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে দরপত্র আহ্বান করা হলেও কাজ আরম্ভ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

তবে নানা জটিলতা কাটিয়ে ২০২১ সালে পুরোদমে নির্মাণকাজ শুরু হয়। সৌদি সরকারের অর্থায়নে ১ হাজার ৪৯০ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতুটির নির্মাণ, ৯৬ মিটার আর্চ সেতু, এপ্রোচ সড়ক, ৭ কিলোমিটার নদী শাসন ও বক্স কালভার্টসহ ব্যয় হয়েছে  ৪৫০ কোটি টাকা। ১৫৪ একর জমি অধিগ্রহণ ও ৮২ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪৭৫ কোটি টাকা। এলজিইডির তত্ত্বাবধানে সেতুটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেন চায়না স্টেট কন্সট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন। সেতুটি নির্মাণে ২৯০টি পাইল, ৩০টি পিলার, ২৮টি স্প্যান এবং ১৫৫টি গার্ডার বসানো হয়েছে। উভয় প্রান্তে পানি নিষ্কাশনের জন্য ১২টি ব্রিজ ও ৫৮টি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও সেতুর উভয় পাশে স্থায়ী তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে এলজিইডি। সেতুর এই সড়ক সংযোগের মাধ্যমে বেলকা বাজার, পাঁচপীর, ধর্মপুর, হাট লক্ষ্মীপুর, সাদুল্যাপুর ও ধাপেরহাটসহ অন্তত ১০টি বাজার যুক্ত হচ্ছে মহাসড়কের সঙ্গে। এতে সুন্দরগঞ্জ ও চিলমারী অঞ্চলসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎৩৬ বছরের আকাঙ্ক্ষার অবসান-

‎তিস্তা নদীর উপর সেতু নির্মাণের দাবি তোলা হয় ১৯৯০ সালে। নব্বইয়ের দশকে সেতু নির্মাণের দাবি তুলে আন্দোলন করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি তখনো। কিন্তু ২০০১ সালে আবারো সেতু নির্মাণের দাবিতে সভাসমাবেশ ও মানববন্ধন শুরু করেন এলাকাবাসী। স্থানীয় স্কুল শিক্ষক হাজী শরিয়ত উল্লাহ মাস্টারের নেতৃত্বে এবার আন্দোলনে যোগ দেন কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার হাজারো মানুষ। দফায় দফায় সভাসমাবেশ ছাড়াও স্মারকলিপি দেওয়া হয় বিভিন্ন দপ্তরে। জেলা-উপজেলা পেরিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় সেই দাবি আদায়ের স্মারকলিপি। এক পর্যায়ে সেই স্মারকলিপি পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে। নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু প্রকল্প। ২০১২ সালে তিস্তা নদীর উপর দীর্ঘতম পিসি গার্ডার সেতুটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (একনেক) অনুমোদন দেওয়া হয়। সেতুটি নির্মাণে আর্থিক সহায়তায় এগিয়ে আসে সৌদি সরকার। এরপর ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্বোধন করেন।

দীর্ঘসূত্রিতা ও নানা জটিলতা-

‎২০১৪ সালে সেতুর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হলেও শুরুতেই দেখা দেয় স্থবিরতা। সেতু নির্মাণের নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করায় আর্থিক সহায়তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় দাতা সংস্থা। এরপর তিন বছর বন্ধ থাকে নির্মাণ কাজ। কয়েক দফায় প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে কাজের অনুমতি দেয় দাতা সংস্থা। সব জটিলতা কাটিয়ে ২০১৮ সালে সেতুর দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু কাজ শুরুর আগে পেরিয়ে যায় প্রকল্পের মেয়াদ। মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাব পাঠানো হলেও ৯ মাস ঝুলে থাকে একনেকে। এরপর ২০২১ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় আবার বাড়ানো হয় প্রকল্পের মেয়াদ। সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো বাড়িয়ে প্রকল্পটির কাজ শেষ করা হয়। তবে, মূল সেতুর কাজ শেষ হলেও ৯৬ মিটার আর্চ সেতু নির্মাণ কাজ বিলম্বিত হওয়ায় তিন দফায় সেতু উদ্বোধনের তারিখ পরিবর্তন করা হয়।

‎হরিপুর গ্রামের আজগর আলী বলেন, “সেতুটির উদ্বোধনের ফলে আমাদের যোগাযোগ যেমন সহজ হবে, তেমনি জীবনমানেরও উন্নতি ঘটবে। আগে আমরা নৌকায় চলাচল করেছি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। সেই ভোগান্তির অবসান হচ্ছে সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে।”

স্থানীয় বাসিন্দা মমিনুল ইসলাম বলেন, “এটি শুধু যোগাযোগের সেতু নয়, অর্থনীতিতেও আসবে বড় পরিবর্তন। আমরা স্বপ্নের সেতুটি উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছি।”

‎পাঁচপীর বাজারের রফিক মিয়া জানান, দুই যুগ আগে সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হলেও নানা জটিলতায় তা থেমে যায়। পরে ২০২১ সালে পুরোদমে কাজ শুরু হয়। সেতু নির্মাণ শেষে কয়েক দফা উদ্বোধনের তারিখ পিছিয়ে অবশেষে এবার ২০ আগস্ট চূড়ান্ত হয়েছে।

‎চিলমারি থেকে ঘুরতে আসা রুনা বেগম বলেন, “এত সুন্দর সেতু আমাদের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য আশীর্বাদ। ছেলেমেয়েকে নিয়ে সেতুটি দেখতে এসে ভীষণ ভালো লাগছে।”

এ বিষয়ে শরিতুল্যাহ মাস্টার জানান, আমি ১৯৯৫ সাল থেকে সেতুর দাবিতে আন্দোলন করেছি। যদিও এই সেতুর দাবি ওঠে ১৯৯০ সালে। আমার নেতৃত্বেই আন্দোলনের পথ ধরে আজকের সেতু বাস্তব হয়েছে। অথচ আজ আমার কথা কেউ স্মরণ করছে না। আমি চাই সেতুটি আমার নামে নামকরণ করা হোক।

সেতুটি উদ্বোধনের সব প্রস্তুতি সম্পন্নের কথা জানিয়েছেন গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী। তিনি বলেন, ' “মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেতুটির নামকরণ ইতোমধ্যে ‘মাওলানা ভাসানী সেতু’ করা হয়েছে। উদ্বোধনের পর বিকেল থেকে সেতুটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।”