বিশ্বকাপের আগে বিপদসংকেত

আসন্ন ওয়ানডে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে প্রস্তুতিমূলক সিরিজ খেলছেন বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটাররা। বিকেএসপিতে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা সম্ভাব্য ক্রিকেটারদের লাল ও সবুজ দল নামে দুটো দলে ভাগ করা হয়েছে। তৃতীয় দল হিসেবে খেলছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দল। বুধবার ১৫ বছরের কম বয়সী ছেলেদের কাছেই হেরে গেছে নিগার সুলতানা, মারুফা আখতারদের নিয়ে গড়া লাল দল। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ হাসিঠাট্টার সৃষ্টি হলে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রুমানা আহমেদের মতো নারী ক্রিকেটারসহ আরও অনেকেই। কিন্তু শুক্রবার ছেলেদের অনূর্ধ্ব-১৫ দল যখন নারীদের সবুজ দলকেও হারিয়ে দেয়, তখন ব্যাপারটা আর অন্তর্জালের হাসিঠাট্টায় সীমাবদ্ধ থাকে না, প্রশ্ন ওঠে দীর্ঘ প্রস্তুতির কার্যকারিতা ও সামর্থ্যরেও। বিশ্বকাপের আগে এমন হার নিঃসন্দেহে মেয়েদের ক্রিকেটে বিপদ সংকেত।

কক্সবাজারে চলেছে প্রায় মাসব্যাপী শারীরিক প্রশিক্ষণ, এরপর মিরপুরের শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ১ মাসের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতাও তো কম হলো না জ্যোতিদের। তারপরও যখন আক্ষরিক অর্থেই স্কুলে পড়াদের কাছে হেরে যান নারী ক্রিকেটাররা, তাও পরপর দুটো ম্যাচে সেটা তাদের সামর্থ্য নিয়েই প্রশ্ন তোলে। বৃষ্টিবিঘিœত ম্যাচে আগে ব্যাট করে ছেলেদের অনূর্ধ্ব-১৫ দল ৩৯ ওভারে করে ৭ উইকেটে ১৮৯ রান। খেয়াল রায় করেন ৮২ রান, আব্দুর রহমান করেন ৪৮ রান। ৩৩ রানে ৪ উইকেট রাবেয়া খানের। জবাবে বৃষ্টিতে ভিজেডি পদ্ধতিতে নারী সবুজ দলের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩০ ওভারে ১৭৭ রানের।  ৩০ ওভার খেলে ৭ উইকেটে ১৩৫ রান করতে পারে নারী দল, অনূর্ধ্ব ১৫ দল জিতে যায় ৪১ রানে।

নারী দল প্রথম ম্যাচটা হারের পর জাতীয় দলের হয়ে ৫০ ওয়ানডে ও ৮৭ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলা রুমানা আহমেদ ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘নারী ক্রিকেটারদের অবদান বা সংগ্রাম নিয়ে তারা কখনো কথা বলেন না, অথচ একজন ক্যাপ্টেনের আবেগঘন কথা নিয়েও ট্রল করেছিল কয়েকদিন আগে। এই কি আমরা? এই কি আমাদের মনুষ্যত্ব? আমরা ভুলে যাই, এরা আমাদেরই মেয়ে, বোন। দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তারা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কঠিন পরিশ্রম করে। একটা হারেই সব অস্বীকার করা কি ঠিক?’ ক্রিকেট মাঠে লড়াইটা যদিও ব্যাট-বলের, এখানে ধনী-গরিব বা সাদা-কালোর কোনো তফাৎ নেই। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকা একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, নারী দলের পরপর দুটো ম্যাচে হারের কারণ মূলত সামর্থ্যরে অভাব। দক্ষতা না বাড়ানো, আত্মতুষ্টি আর ব্যক্তিগত লক্ষ্যপূরণই বাড়তে দিচ্ছে না দেশের নারী ক্রিকেটকে। কাছ থেকে দেখা তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘মেয়েদের সঙ্গে ছেলেদের শারীরিক পার্থক্য তো আছেই যেটা বড় ব্যবধান গড়ে দেয়। মেয়েরা যেখানে ১ রান নেয় ছেলেরা সেখানে ২ রান নিতে পারে, ফিল্ডিংয়েও ছেলেরা যেভাবে বলের পেছনে দৌড়ায় রান বাঁচায় বা বাউন্ডারি বাঁচায় সেটা মেয়েরা পারবে না। এখানে একটা বড় ব্যবধান তৈরি হয়। এছাড়া ছেলেদের দলের পেসাররা ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার বেগে বোলিং করে, এই গতিতে বোলিং করার মতো পেসার মেয়েদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই কম। আমি দেখেছি মাত্র ২ জনকে। এছাড়া আরেকটা বড় সমস্যা ব্যাটিংয়ে অফসাইডে শট খেলতে না পারা, বিশেষ করে ড্রাইভ খেলতে সমস্যা। সবাই লেগসাইডে টেনে মারতে চায়। এর ফলে অর্ধেক মাঠে তাদের স্কোরিং অপশনই তৈরি হয় না।’ তার কাছ থেকে আরও জানা যায়, এখনো নারী দলের ব্যাটাররা ৬৫ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তারা নিজেদের কমফোর্ট জোন থেকে বের হতে চান না। জোরে বোলাররা চোটের ভয়ে সাইড-আর্ম অ্যাকশনে বল করতে চান না। মেয়েদের ক্রিকেটে সামর্থ্য বাড়াতে ব্রিটিশ নাগরিক ইয়ান ডুরান্টকে ২ বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছিল বিসিবি, কিন্তু গত নভেম্বরে মেয়াদের মাঝপথেই তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে যান। নারী দলে তার থাকাটা প্রয়োজন ছিল বলেই মনে করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক কোচ।

বাংলাদেশ নারী দলের স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচ হিসেবে বর্তমানে কাজ করছেন সাবেক অ্যাথলেট ফৌজিয়া হুদা জুঁই। কিশোরদের কাছে পরপর দুটো ম্যাচে হারের পেছনে শারীরিক সামর্থ্যরে পার্থক্যই কি প্রধান কারণ এমন প্রশ্নে জুঁই এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এটা তো প্রধান কোচ বলতে পারবেন। আমি একটু পরে ফোন করছি আপনাকে।’ এরপর জুঁই আর ফোন করেননি।