বিসিবির অধিনায়কত্ব নীতিতে বিব্রত নির্বাচক

বাংলাদেশকে আসন্ন এশিয়া কাপের শিরোপা জিততে দেখার ব্যাপারে কতটা আশাবাদী, সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর কাছে প্রশ্নটা রেখেছিলেন একজন সাংবাদিক। উত্তরে লিপু বলেছেন, আবেগ এবং যুক্তির পার্থক্যের কথা, একই সঙ্গে শুনিয়েছেন ১৯৮৩’র বিশ্বকাপে সমস্ত পূর্বাভাষকে মিথ্যে প্রমাণ করে ভারতকে জিততে দেখার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও। সাফল্য চট করে ধরা দেয় না। এর পেছনে থাকে পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও পরিশ্রম। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পরিশ্রম ও আত্মনিবেদন নিয়ে প্রশ্ন নেই, তবে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির চেয়ে স্বল্প মেয়াদের মুখরোচক প্রক্রিয়াতেই বাংলাদেশের ক্রিকেট কর্তাদের মনোযোগ বেশি।

নির্বাচকরা এশিয়া কাপের দল দিয়েছেন শুক্র ও শনিবার দুপুরে, গণমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন প্রধান নির্বাচক। এশিয়া কাপের দলে নেই ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ, আবার আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে ছিলেন না টি-টোয়েন্টির অধিনায়ক লিটন দাস। সাদা বলের দুই সংস্করণে দুই অধিনায়ক থাকাটা বিরল হলেও বিচিত্র নয়। তবে ওয়ানডের অধিনায়ক টি-টোয়েন্টিতে জায়গা পান না এবং একই সঙ্গে টি-টোয়েন্টি অধিনায়কের ওয়ানডে দলে সুযোগ হয় না, এ এক জটিল পরিস্থিতি! একজনকে দুই সিরিজের জন্য সহ-অধিনায়ক বানানো হয়েছিল, এখন আবার সেই পদে শূন্যতা। এমন গোঁজামিলের অধিনায়কত্ব নিয়ে দল গঠন করতে গিয়ে নির্বাচকরাও যে বিব্রত হচ্ছেন, তা স্পষ্ট করে বলেই দিয়েছেন লিপু।

ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজের কথা উল্লেখ করে এশিয়া কাপে ভারতের দলের উদাহরণ টেনে লিপু বলেছেন, বাংলাদেশে এত বেশি আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার নেই যে আলাদা দল করা সম্ভব। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বহুজাতিক সংস্কৃতিও নেই বাংলাদেশে। তাই ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টিতে আলাদা আলাদা অধিনায়ক করার মতো বিলাসিতা বা প্রয়োজনীয়তা না থাকার পরও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে লিপু তার অপছন্দ লুকাননি, ‘দেখেন আসলে এখানে কিছু কিছু জিনিস বেশ স্পর্শকাতর এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপার যদি বলেন, সেখানে আমাদের কর্র্তৃত্বও সীমিত, আপনাকে আমার ব্যক্তিগত ভাবনাটা বলতে পারি, এখানে যে ব্যাপারগুলো বোর্ড অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আগামীতে যাতে দলের জন্যও ভালো হয়, দলনায়কের জন্যও ভালো হয়, সে রকম চিন্তাভাবনা করেই তারা এই ক্ষেত্রে স্ব স্ব জায়গা থেকে নেতৃত্ব দেবেন, এ রকম একটা সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা হয়তো বা ভবিষ্যতে টেস্ট ম্যাচ এবং টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট যেহেতু আছে, আশা করি দেখতে পাব, তার আগেও হয়তো দেখতে পাব। আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য সঠিক ব্যক্তি না।’

এমন নয় যে লিটন এবং মিরাজ কোনো একটা সংস্করণে খেলছেন না বা সরে দাঁড়িয়েছেন। দুজনেই খেলছেন কিন্তু কেউই সাদা বলে নিজের নেতৃত্বের বাইরের সংস্করণে দলেই জায়গা ধরে রাখতে পারছেন না। ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর, ডানেডিনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২২ রানের ইনিংস খেলার পর লিটন ৮টি ওয়ানডে ইনিংস খেলেছেন, এর কোনোটিতে তিনি দুই অঙ্কের রানও করতে পারেননি। চার ইনিংসে আউট হয়েছেন শূন্য রানে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দল থেকে বাদ পড়ে প্রায় মাস ছয়েক বিরতির পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে সুযোগ পেয়েছিলেন, সেখানেও শূন্য রানে আউট হয়ে পরের দুই ম্যাচে লিটন দর্শক বনে গেছেন। অথচ টি-টোয়েন্টি সিরিজ, যেখানে লিটন অধিনায়ক, সেখানে তিনি ৩ ইনিংসে ১১৪ রান করে সিরিজসেরা!

মেহেদী হাসান মিরাজ ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পেয়েছেন শ্রীলঙ্কা সিরিজেই, তার আগে নাজমুল হোসেন শান্তর অবর্তমানে দায়িত্ব পালন করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। সেখানে দুটো হাফসেঞ্চুরি আছে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজেও তার পারফরম্যান্স মন্দ নয়। ওয়ানডেতে অলরাউন্ডারদের র‌্যাংকিংয়ে মিরাজের চারে থাকাটা প্রমাণ করে এই সংস্করণে তার উপযোগিতার কথা। কিন্তু খেলাটার দৈর্ঘ্য কমে ২০ ওভারে নেমে এলেই মিরাজ যেন উপযোগিতা হারিয়ে ফেলেন। কখনো তাকে চেষ্টা করা হয়েছে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান বানাতে, কখনো অলরাউন্ডার। দুইয়ের টানাপড়েনে মিরাজ দলেই হয়ে গেছেন ব্রাত্য। তার জায়গায় একাদশে কাক্সিক্ষত হয়ে উঠেছেন শেখ মেহেদি হাসান, যার সম্পর্কে লিটন কলম্বোতে সিরিজ নির্ধারণী টি-টোয়েন্টি ম্যাচের আগে বলেছিলেন যে, উইকেট দেখেই তার মাথায় যে একাদশটা এসেছে তাতে প্রথম নামটাই শেখ মেহেদির। অন্যদিকে পাকিস্তানের বিপক্ষে মিরপুরের মাঠেই সিরিজ জয়ের পর ডেড রাবার ম্যাচে একাদশে সুযোগ পেয়ে ১ ওভারে ১৪ রান দেওয়ার পর আর হাতে বলই পাননি মিরাজ।

এক বছর আগেও নাজমুল হোসেন শান্ত ছিলেন তিন সংস্করণেই অধিনায়ক, এখন শান্ত কোনো সংস্করণেই অধিনায়ক নন। টি-টোয়েন্টি দলে জায়গাও হারিয়েছেন। আরব আমিরাত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে সহ-অধিনায়ক করা হয়েছিল শেখ মেহেদিকে। এখন কেন দলে কোনো সহ-অধিনায়ক নেই, এমন প্রশ্নে লিপু বলেছেন, ‘আমার মনে হয় আপনার প্রশ্ন বোর্ডের কর্মকর্তারা শুনতে পেয়েছেন এবং আমি আপনার প্রশ্নটা নিঃসন্দেহে পৌঁছে দেব, আমিও মনে করি এই জায়গাটায় স্ট্যাবিলিটি রাখা দরকার, তাহলে দলগঠন ও দল পরিচালনা অনেক সহজ হয়। তার পাশাপাশি আমার মনে হয় সহ-অধিনায়ক হওয়ার মতো পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা নিয়েও যেন কিছু বিকল্প অফিশিয়ালদের সামনে থাকে, সেটাও আমি আশা করব।’

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কোনো টেস্ট অধিনায়ক নেই, ওয়ানডে অধিনায়ক টি-টোয়েন্টি দলে সুযোগ পান না আর টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক ওয়ানডে দলে। টি-টোয়েন্টিতে যাকে সহ-অধিনায়ক করা হয়েছিল, তাকে আবার সব উইকেটে একাদশেও রাখা যায় না! এমন জটিল সমস্যার সমাধান হতে পারত ওয়ানডেতে লিটনের আর টি-টোয়েন্টিতে মিরাজ এবং মেহেদির নিয়মিত ভালো করা। সেটাই যে তারা করতে পারছেন না!