দেশ রূপান্তর : বর্তমানে আপনার প্রতিষ্ঠান কতটি দেশে রেমিট্যান্স সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করছে? দেশে আনার ক্ষেত্রে সেগুলো কী ধরনের ভূমিকা পালন করছে?
মো. ওমর ফারুক খাঁন : বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব খ্যাতনামা এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে। আমাদের সঙ্গে বিশ্বের ২২টি দেশের ১৫৭টি ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজের চুক্তি রয়েছে। এর মাধ্যমে ২০০-এর অধিক দেশ থেকে প্রবাসীরা সহজে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন এবং সরাসরি বেনিফিশিয়ারির হিসাবে জমা হচ্ছে। আমাদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান এবং জর্ডানে। এ ছাড়া এশিয়ার সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া এবং ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও আমাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। এসব দেশে নিয়োজিত আমাদের ২৯ জন প্রতিনিধি কর্মকর্তা প্রবাসীদের সরাসরি সহযোগিতা করছেন, যাতে তারা নিরবচ্ছিন্ন, নিরাপদ ও দ্রুত সেবা পেতে পারেন। রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে সৌদি আরব শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ওমান, ইতালি, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ ইউরোপ ও এশিয়ার আরও অনেক দেশ। আমাদের এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন এবং প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার ও দ্রুত সেবা পাওয়ার কারণে বৈধপথে রেমিট্যান্সের প্রবাহ দিন দিন বাড়ছে।
দেশ রূপান্তর : রেমিট্যান্সে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, সেটি কি অব্যাহত থাকা উচিত? হলে কেন?
মো. ওমর ফারুক খাঁন : হ্যাঁ, রেমিট্যান্সে প্রদত্ত প্রণোদনা অব্যাহত রাখা উচিত। বর্তমানে রেমিট্যান্সের বিপরীতে শতকরা ২.৫০ টাকা হারে যে প্রণোদনা তা মূলত বৈধ উপায়ে দেশে অর্থ প্রেরণের জন্য উৎসাহিত করা ও প্রবাসীদের মূল্যবান অবদানের স্বীকৃতিও বটে। এই প্রণোদনা প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেল ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। বৈধপথে রেমিট্যান্স আসায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে, আমদানি ব্যয় নির্বাহ সহজ হচ্ছে, মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল থাকছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হচ্ছে। এছাড়া, প্রণোদনার কারণে অনেক হুন্ডি ব্যবসায়ী ধীরে ধীরে এই অবৈধ ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। যদি এ প্রণোদনা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা আবার সক্রিয় হয়ে প্রবাসীদের কাছ থেকে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করবে ফলে সরকার বৈধ রেমিট্যান্স থেকে বঞ্চিত হবে যা দেশের অর্থনীতি অস্থিতিশীল করবে।
দেশ রূপান্তর : বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে আপনার ব্যাংক কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?
মো. ওমর ফারুক খাঁন : বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে আমরা বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছি। রেমিট্যান্স প্রেরণ আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ করতে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক্সচেঞ্জ হাউজ ও মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছি এর পাশাপাশি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, জর্ডান ও সিঙ্গাপুরে আমাদের প্রতিনিধি রয়েছে। ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় রেমিট্যান্স লাউঞ্জ চালু করেছি যাতে রেমিট্যান্স বেনিফিশিয়ারিরা সর্বোচ্চ সেবা পান। বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনার পাশাপাশি নানা ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া প্রবাসীদের জন্য বিশেষ আমানত ও বিনিয়োগ স্কিম যেমন মুদারাবা এনআরবি সেভিংস বন্ড ও এক্সপ্যাট্রিয়েট হাউজিং ডিপোজিট স্কিম চালু রয়েছে যা প্রবাসীদের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করছে। দ্রুত লেনদেন এবং দক্ষ জনবলের মাধ্যমে উন্নত সেবা প্রদানের ফলে ইসলামী ব্যাংক আজ দেশে বৈধপথে রেমিট্যান্স আহরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। জানুয়ারি থেকে এই পর্যন্ত আমরা ৩ হাজার ৫২৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আহরণ ও বিতরণ করেছি যা বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান বাড়াতে আপনার পরামর্শ কী?
মো. ওমর ফারুক খাঁন : দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান আরও বাড়াতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন প্রবাসীদের বৈধপথে টাকা পাঠাতে আকৃষ্ট করতে ব্যাংকিং পরিষেবা যেমন মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা আরও বাড়াতে হবে। বিদেশগামী কর্মীদের প্রস্থানকালেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার বাধ্যবাধকতা এবং তাদের জন্য বিশেষ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ স্কিম চালু করা যেতে পারে, যাতে তারা কেবল টাকা পাঠিয়েই ক্ষান্ত না থেকে দেশের উন্নয়নেও অংশ নিতে পারেন। পাশাপাশি, অবৈধ হুন্ডি বন্ধে নজরদারি বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রবাসীদের সম্মান এবং তাদের পরিশ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা যাতে তারা দেশের প্রতি আরও বেশি আস্থাশীল হয়ে বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে আগ্রহী হন।
দেশ রূপান্তর : রেমিট্যান্সের বেশিরভাগ অর্থ ভোগবিলাসে ব্যয় হয় বলে বিবিএসের এক জরিপে জানা যায়। এই অর্থ বিনিয়োগে কাজে লাগানোর জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
মো. ওমর ফারুক খাঁন : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে দেখা গেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোগবিলাসে ব্যয় হয় যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে সীমিত করে। প্রবাসীরা কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ পরিবারের কাছে পাঠালেও এর বেশিরভাগ জমি কেনা, ঘরবাড়ি নির্মাণ বা বিলাসিতায় ব্যয় হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি আয় বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না। ফলে, ২০-২৫ বছর পর দেশে ফিরে অনেক প্রবাসী সম্পত্তির মালিকানা হারান কিংবা পারিবারিক সমস্যায় পড়েন। এই অর্থকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে রূপান্তর করতে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে যেমন সরকার প্রবাসীদের জন্য উচ্চ মুনাফায় বন্ড এবং মিউচুয়াল ফান্ড স্কিম চালু করে বিনিয়োগকে আকর্ষণীয় করতে পারে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবাসী ও তাদের পরিবারের জন্য ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি প্রোগ্রাম এবং মোবাইল অ্যাপভিত্তিক বিনিয়োগ পরামর্শ সেবা চালু করতে পারে যেখানে অর্থের সঠিক ব্যবহার শেখাবে। কমিউনিটি-ভিত্তিক যৌথ বিনিয়োগ গ্রুপ গঠন করে পরিবারগুলোকে কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগে উৎসাহিত করা যেতে পারে। রেমিট্যান্স শুধু ভোগবিলাস নয় বরং দেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে রূপান্তর হবে বলে আমি মনে করি।
দেশ রূপান্তর : আপনাদের ব্যাংকে রেমিট্যান্স প্রেরক ও গ্রহীতাদের জন্য বিশেষ কোনো সেবাপণ্য চালু আছে?
মো. ওমর ফারুক খাঁন : আমাদের ব্যাংকে রেমিট্যান্স প্রেরক ও গ্রহীতাদের জন্য সাধারণ ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি রয়েছে বিশেষায়িত কিছু সেবাপণ্য। এর মধ্যে মুদারাবা এনআরবি সেভিংস বন্ড (এমএনএসবি) অন্যতম জনপ্রিয়। এ সেবার মাধ্যমে প্রবাসীরা ৫ বছর বা ১০ বছর মেয়াদি বন্ড ক্রয়ের সুযোগ পান, যা তাদের সঞ্চয়কে নিরাপদ রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিশ্চিত মুনাফা দেয়। প্রবাসীদের মধ্যে আরেকটি বহুল জনপ্রিয় সেবা হলো মুদারাবা এক্সপাট্রিয়েট হাউজিং ডিপোজিট স্কিম। যারা নিজস্ব বাড়ি করার পরিকল্পনা করেন তারা এই স্কিমে নিয়মিত সঞ্চয়ের মাধ্যমে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পান।
এছাড়া, প্রবাসী ও তাদের পরিবারের আর্থিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ইসলামী ব্যাংক চালু করেছে প্রবাসী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় সহজ শর্তে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন এবং জামানত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। এই বিশেষ সেবাগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীরা শুধু অর্থ প্রেরণই নয় বরং সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের আর্থিক ভবিষ্যৎকে আরও সুদৃঢ় করতে পারছেন। ফলে ইসলামী ব্যাংকের এসব উদ্যোগ প্রবাসীদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
দেশ রূপান্তর : বৈধপথে রেমিট্যান্স বাড়াতে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে?
মো. ওমর ফারুক খাঁন : বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রেরণ বাড়াতে সরকারকে প্রবাসী ও তাদের পরিবারের জন্য শুধু আর্থিক নয় বরং অ-আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার দিকেও নজর দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে রেমিটার স্মার্ট কার্ড চালু করা। এই কার্ডের মাধ্যমে রেমিটার বা তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সরকারি সেবা দপ্তর থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। এছাড়া ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য আলাদা ও উন্নতমানের সেবা নিশ্চিত করা যেতে পারে যাতে তারা দেশে ফিরে বিশেষ মর্যাদা ও সুবিধা অনুভব করেন। একইভাবে যারা নিয়মিত ও অধিক পরিমাণে বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রেরণ করছেন তাদের প্রায়োরিটি কার্ড প্রদান করা যেতে পারে যা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবায় বিশেষ সুবিধা পেতে সহায়তা করবে। এ ধরনের উদ্যোগ শুধু প্রবাসীদের উৎসাহিত করবে না বরং বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দেশ রূপান্তর : প্রবাসীরা যাতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়, সে জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
মো. ওমর ফারুক খাঁন : প্রবাসীদের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে আগ্রহী করতে হলে প্রথমেই একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও লাভজনক বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এজন্য প্রবাসী বিনিয়োগ বান্ধব নীতি প্রণয়ন করে কর-সুবিধা ও বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ডায়াসপোরা বন্ড, প্রবাসী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ তহবিল কিংবা এসএমই প্রকল্পে বিনিয়োগের মতো সুবিধাজনক আর্থিক পণ্য চালু করা দরকার। বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে প্রবাসীরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই দ্রুত সেবা পান। আর্থিক শিক্ষা ও সচেতনতা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রবাসীদের বোঝানো প্রয়োজন, কীভাবে তাদের সঞ্চয় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই আয় তৈরি হবে। এ ধরনের পদক্ষেপ প্রবাসীদের জমি বা বাড়ি কেনার প্রবণতা থেকে সরিয়ে এনে দেশের শিল্প, কৃষি ও সেবা খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে, যা জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।