দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান বাড়াতে আপনার পরামর্শ কী?
মো. রবিউল ইসলাম : বাংলাদেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। অর্থাৎ নিম্নআয়ের শ্রমিকরা সিংহভাগ রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। রেমিট্যান্স আহরণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেত যদি আমরা দক্ষ জনবল বিদেশে পাঠাতে পারতাম। এ জন্য প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি এক্সচেঞ্জ কোম্পানি ভেদে বৈদেশিক মুদ্রার হারে বড় পার্থক্য থাকে, সেটাও দূর বিনিময়হারে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে এবং প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : আপনারা রেমিটারদের কি বিশেষ কোনো সুবিধা দেন?
মো. রবিউল ইসলাম : এসবিএসি ব্যাংক রেমিটারদের জন্য অগ্রাধিকারমূলক বিশেষ সেবা চালু রেখেছে। আমরা নিশ্চিত করি যাতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ তাদের পরিবার দ্রুততম সময়ে পেয়ে যান। পাশাপাশি আমাদের ব্যাংকে রেমিটারদের জন্য লয়্যালটি প্রোগ্রাম, প্রবাসী সঞ্চয়পত্র, উচ্চ মুনাফাযুক্ত ডিপোজিট স্কিম এবং বিনিয়োগে অগ্রাধিকার সুবিধা চালু আছে। আমরা নিয়মিত ক্যাম্পেইন ও গ্রাহক সেবা সপ্তাহ আয়োজন করি, যেখানে রেমিটার ও তাদের পরিবারকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। ফলে গ্রাহকরা ব্যাংকের প্রতি আরও আস্থা রাখতে পারেন। বর্তমানে প্রবাসীরা অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে (ওবিইউ) বৈদেশিক মুদ্রায় হিসাব খুলে সঞ্চয় করতে পারছেন এবং বিশে^র যেকোনো দেশে মুনাফাসহ স্থানান্তরও করার সুযোগ পাচ্ছেন। সুতরাং প্রবাসী রেমিটারদের সেবার জন্য এসবিএসি ব্যাংক সদা প্রস্তুত রয়েছে।
দেশ রূপান্তর : রেমিট্যান্সে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, সেটি কি অব্যাহত থাকা উচিত? হলে কেন?
মো. রবিউল ইসলাম : বাংলাদেশের মতো আর্থিক অবকাঠামোগত দেশে বৈধপথে রেমিট্যান্স আনা বড় চ্যালেঞ্জ। হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমাতে নিরাপদ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় আহরণে আর্থিক প্রণোদনা অবশ্যই অব্যাহত থাকা উচিত। প্রয়োজনে প্রণোদনার হার আরও বাড়ানো যেতে পারে। সরকার রেমিট্যান্সে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করতে উৎসাহিত করছে। নেতিবাচক প্রবণতা থেকে বিগত এক বছর যাবৎ রেমিট্যান্স আহরণ বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ জুলাই, ২০২৫ মাসে দেশে ২৪৭ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। ফলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, একই সঙ্গে চলতি হিসাবও ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। আমি বিশ্বাস করে, এই প্রণোদনা অব্যাহত থাকলে আরও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসবে। এতে দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
দেশ রূপান্তর : রেমিট্যান্সের বেশিরভাগ অর্থ ভোগবিলাসে ব্যয় হয় বলে বিবিএসের এক জরিপে জানা যায়। এই অর্থ বিনিয়োগে কাজে লাগানোর জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
মো. রবিউল ইসলাম : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের জরিপে প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে, যা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী হন না। এজন্য এসবিএসি ব্যাংক প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সঞ্চয় স্কিম, ডিপোজিট প্রোডাক্ট ও বিনিয়োগবান্ধব ঋণ কর্মসূচি চালু করেছি। আমি মনে করি, প্রবাসীর পরিবারগুলো যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ হয়, তাহলে জাতীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
দেশ রূপান্তর : বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে আপনার ব্যাংক কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?
মো. রবিউল ইসলাম : এসবিএসি ব্যাংক বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বিশ্বস্ত ও প্রসিদ্ধ মানি এক্সচেঞ্জ হাউজ, যেমন ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, মানিগ্রাম, রিয়া, ট্রান্সফাস্ট, আমান, আল-আনসারি এক্সচেঞ্জ, স্মল ওয়ার্ল্ড, ন্যাশনাল এক্সচেঞ্জ, নেক মানি, প্লাসিড, এসএইএ, ক্যাশ এক্সপ্রেস, এক্সমানি, টার্বো ক্যাশ, সানম্যান এক্সপ্রেস ইত্যাদি এক্সচেঞ্জ কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে প্রবাসীরা যেন কম খরচে, দ্রুততম সময়ে এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় তাদের কষ্টার্জিত টাকা দেশে পাঠাতে পারেন। বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের উন্নয়নে হাত বাড়িয়ে দিতে প্রবাসীদের প্রতি এসবিএসি ব্যাংক নানান মাধ্যমে সচেতনামূলক প্রচারণা চালিয়ে থাকে। ব্যাংকের প্রত্যেকটা শাখা, উপশাখা এবং এজেন্ট আউটলেটে রেমিট্যান্স গ্রহীতাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমরা সেবা প্রদান করি। পাশাপাশি ব্যাংকিং লেনদেন সহজ করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের ওপর আমরা বিশেষ জোর দিচ্ছি। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে বৈধ চ্যানেল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।
দেশ রূপান্তর : প্রবাসীরা যাতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে আগ্রহী হন, সে জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
মো. রবিউল ইসলাম : বাংলাদেশে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে নানামুখী চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়। বিশ্বব্যাংকের ‘বিজনেস রেডি’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চতুর্থ সারিতে রয়েছে। অর্থাৎ ১০০ স্কোরের মধ্যে মাত্র ৫৩.৮৬ পয়েন্ট পেয়েছে বাংলাদেশ। বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসা-বাণিজ্যবান্ধব পরিবেশ গড়া অত্যন্ত জরুরি। সরকারের বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড (বিডা) ওয়ানস্টপ সার্ভিসসহ বিনিয়োগের পরিবেশ গড়তে নানামুখী কৌশল হাতে নিয়েছে। আমি মনে করি, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ট্যাক্স ছাড়, বিশেষ ঋণ সুবিধা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে প্রবাসীরা সহজেই উদ্যোক্তা হতে পারবেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যারা দেশে ফেরত আসছেন, তাদের জন্য একটি বিশেষ সুবিধা সংবলিত সিএমএসএমই খাতে বিনিয়োগ প্রডাক্ট চালু করতে যাচ্ছি। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।