পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূলে মৃত ডলফিনের সংখ্যা শতাধিক ছাড়ালেও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্ত বা সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিয়ে ডলফিনগুলোকে তড়িঘড়ি মাটি চাপা দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে। এতে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে গত আট বছরে অন্তত দেড়শ ডলফিন ভেসে এসেছে মৃত অবস্থায়। অথচ এতগুলো প্রাণহানির পরও একটি ডলফিনের ও ময়নাতদন্ত হয়নি। ফলে মৃত্যুরহস্য আজও অন্ধকারে। প্রশ্ন উঠছে, এই মৃত্যুর দায় নেবে কে।
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, মাছ ধরার জালে আটকে শ্বাসরোধ অথবা দূষিত পানির সংস্পর্শে এসে অনেক ডলফিন মরছে। কখনো আবার জাহাজের ধাক্কায় প্রাণ হারাচ্ছে। কিন্তু সরকারি নথিপত্রে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হচ্ছে প্রাকৃতিক মৃত্যু।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও মৎস্য গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ডলফিন সমুদ্রের স্বাস্থ্যের সূচক। এর উপস্থিতি মানে ইকোসিস্টেমে ভারসাম্য অটুট। সমুদ্রের নীল অর্থনীতি রক্ষায় জরুরি ডলফিনের নিরাপদ অভয়ারণ্য।
চলতি বছরে ৭টির মধ্যে আগস্টের ২০ দিনের মধ্যে কুয়াকাটায় ভেসে এসেছে তিনটি মৃত ডলফিন। ১ আগস্ট বটলনোজ প্রজাতির একটি, ১৩ আগস্ট ঝাউবাগান এলাকায় আটকে থাকা একটি ইরাবতী, আর ১৪ আগস্ট ঢেউয়ে ভেসে আসে আরো একটি ইরাবতী। সোমবার বিকেলে সমুদ্রসৈকতে আরো একটি ইরাবতী ডলফিন ভেসে এসেছে। প্রতিটির শরীরে ছিল ক্ষতচিহ্ন।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা) যুগ্ম আহ্বায়ক পরিবেশকর্মী আবুল হোসেন রাজু বলেন, ২০১৭ সাল থেকে মৃত ডলফিন উদ্ধারে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, শুরুর দিকে লাশ পচে দুর্গন্ধ ছড়াত তখনই নিজ উদ্যোগে মাটিচাপা দিতে শুরু করি, পরে পরিবেশ,পর্যটনকর্মী ও ট্যুর গাইডদের সহযোগিতায় ডলফিন রক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। তাদের নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত সৈকতে ভেসে আসা মৃত ডলফিনের সংখ্যা ১৩১। এছাড়াও অসংখ্য কচ্ছপ ও তিমির মৃতদেহ সৈকতে ভেসে আসে যার সংখ্যাও কম নয়।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সম্প্রতি কুয়াকাটার পানিতে ১৭৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছেন। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক থিসিস পেপারে দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রের তুলনায় উপকূলীয় ডলফিনের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি, যেটা ডলফিনের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
ওয়ার্ল্ডফিশের সহযোগী গবেষক বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, ডলফিন একটি নির্দেশক প্রজাতি। অর্থাৎ এর উপস্থিতি নদী ও সমুদ্রের পানির মান, খাদ্যপ্রাচুর্য এবং ভালো প্রতিবেশ ব্যবস্থার সুস্থতা নির্দেশ করে। একের পর এক ডলফিন মারা যাওয়া মানে পানিদূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা, অসাধু জেলে বিষ দিয়ে মাছ ধরে, নৌযানের চাপ ও বাসস্থান ধ্বংসের মতো বড় পরিবেশগত সমস্যার সংকেত। IUCN Red List অনুযায়ী এটি বিপন্ন প্রজাতি প্রাণী। এদের রক্ষা করার জন্য স্থানীয় জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং ডলফিন অভয়ারণ্য এলাকায় জাল, বিশেষ করে অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি।
ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, উপকূলে একের পর এক ডলফিনের মৃত্যু হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো তদন্ত, সান্ত্বনামূলক কর্মসূচি বা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এ অবস্থায় দ্রুত গবেষণার মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সনাক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। তাদের দাবি, যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ডলফিন নিধনের হার আরও বাড়বে এবং উপকূলের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।