আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেজর চালাতে চালাতে কোনো কারণ ছাড়াই কবেকার ছেড়ে আসা বড়বাজারের কুয়োটার কথা তোমার মনে পড়ল। বাজার জুড়ে হই-হট্টগোল, তুলাপট্টি, কালিবিগ্রহের পাশেই কুয়োটা ছিল বেমানান এবং এমনকি, অপ্রয়োজনীয়। তোমার তখন ফুলপ্যান্ট বয়স। তোমার তখন ক্লাস নাইন। তোমার তখন সায়েন্স ক্লাস। মোহনপুর তখন টিউবওয়েল। কুয়োটা তখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অনেকক্ষণ নিচের গাঢ় অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হঠাৎ ঝিলিক দিয়ে পানি দেখা যায়, কিন্তু এখন তোমার মনে হয়, সেটা পানি নাও হতে পারে, হয়তো ছিল মরীচিকা!
তবে মরীচিকা সম্পর্কে তোমার ধারণা তো তখন ছিলই না। বরং, স্কুল থেকে আসতে যেতে তোমার বেশ একটা নেশার মতো হয়েছিল কুয়োটার দিকে ঝুঁকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকা। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকার দার্শনিকতা তোমার মধ্যে থাকার কথা ছিল না, কিন্তু কে জানে, হয়তো সে দার্শনিকতা আসলে জন্মাতেও শুরু করেছিল। মানুষের জীবনে কী কী কখন কখন তৈরি হতে থাকে তা বলা আসলে সহজে যায় না। গেলে, জীবন বেশ স্বপ্নের মতো সরলরৈখিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। তা তো আর নয়!
রেজর তুমি টান দিয়ে নিয়ে আসো চোয়ালের কাছে। রেজরটা বেশ। আরামদায়ক। তোমার জন্মদিনে রুনা এটা তোমাকে গিফট করেছে। এর সঙ্গে আরও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রও। সুগন্ধী তুলো তুলো ফোম, আফটার সেভ লোশন। প্রতিটা জিনিসই তোমার পছন্দ হয়েছে, কিন্তু এ নিয়ে রুনাকে থ্যাঙ্কস বলা হয়নি। বিয়ের ১২ বছর পর পার্টনারকে থ্যাঙ্কস বলা বেশ কঠিন কাজ বলে মনে হয় তোমার। এমন কি বানিয়ে বানিয়ে আই লাভ ইউ বলাও। তোমার শুধু মনে হয়, ধরা পড়ে যাবে তুমি রুনার কাছে এসব কথা বলতে গেলেই।
অথচ ধরা পড়ার মতো তুমি বাহ্যিক কিছু করোনি বৈবাহিক লাইফে। তুমি ঘরোয়া ও স্বপ্নের মতো সরলরৈখিক মানুষ। তোমার জীবনে তাই ঘটে, যা তুমি ঘটানো প্রয়োজন বলে মনে করো। এর বাইরে কোনো অ্যাডভেঞ্চার করার ইচ্ছা, চাহিদা, প্রয়োজন, অনুষঙ্গ কিছুই তোমার নেই। তবু রুনাকে ভালোবাসার কথা বলতে গেলে তোমার মুখের পেশি শক্ত হয়ে যায় বলেই তোমার ধারণা। থুতনির খুচরো দাড়িগুলো নামাতে নামাতে তোমার মনে হয়, এটা কি শুধু এ জন্যই যে রুনাকে তুমি ভালোবাসো না... নাকি তুমি অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলেছ?
ভালোবাসাবাসি এক অদ্ভুত অযথা জিনিস বলেই তোমার মনে হয় এখন। অথচ বাজারের বড় কুয়োটার সামনে দাঁড়িয়েই তুমি মুখোমুখি হয়েছিল তোমার প্রথম ভালোবাসার। পাতলা-সাতলা ছিল মেয়েটে। কালো একটা ছাড়া, নীল স্কুলড্রেস, সাদা অপ্রয়োজনীয় ওড়না পরে তোমার সামনে দিয়ে নিয়মিত ঘরে ফিরত সে। অনেক সময় পার করে তুমি জানতে পেরেছিলে তার নাম রিজওয়ানা।
একটু বাঁকাভাবে টানতে গিয়েই কিনা, গলার নিচটাতে অল্প একটু কেটে যায় তোমার। রক্ত বেরিয়ে আসে না। তাতে কিছুটা বিস্ময়ই জাগে রক্ত কি আর বেরোবে না তোমার শরীর থেকে? অথচ, সে সময়, রক্তের কি অদ্ভুত নাচনই না ছিল! ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলে মাঠে। ভাঙা বোতলের কাচে ফেড়ে গিয়েছিল হাতের তালু। চারটা সেলাই আর গজ কাপড়ের উদ্ভাসে হাতটা ফুলে উঠেছিল টনটন করে। রিজওয়ানার চোখে তুমি দেখেছিলে সেবারই প্রথম, একটা আশঙ্কা। লিংকনের ওপর কী যে খুশি হয়েছিলে! ভাগ্যিস ক্যাচ ধরতে গিয়ে ধাক্কাটা তোমাকে দিয়েছিল সে! দিয়েছিল বলেই রিজওয়ানার কোথাও যে তুমি আছো, তা বুঝতে পেরেছো আজ!
সে রাতেই প্রথম চিঠিটা তুমি লেখো। বেশ বাহারি পাতায়। গুটি গুটি অক্ষরে। ওপরে লেখো প্রিয় অনামিকা। শেষ করো, তোমার অনন্ত লিখে। কী অদ্ভুত প্রেম! প্রেম হোক চাও, কিন্তু চাও না তোমাদের নাম কোনোভাবে বেরিয়ে আসুক। পরের দিনই একশ সিংহের সাহস বুকে নিয়ে রিজওয়ানার সামনে দাঁড়াও তুমি। ছাতার জন্য পুরো মুখটা দেখা যাচ্ছে না তার। ঠোঁট দুটো অদ্ভুতভাবে বাঁকানো। তাতে কোনো কারণ ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ে বিষাদ। কণ্ঠে কোনো আওয়াজ নেই তোমার। কাঁপা বুকে, ততোধিক কাঁপা হাতে চিঠিটা বাড়িয়ে দাও তুমি। দিয়েই দাও দৌড়... কতদূর তুমি জানো না! কিন্তু তুমি যেন দৌড়াতেই থাকো!
কুলি করতে গিয়ে তোমার মনে হয় পানিগুলো পড়ে গেল একপাশ দিয়ে। মুখের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই। তুমি তো চেয়েছিলে বেসিনের মাঝে কুলিটা ফেলতে। কিন্তু সেটা ঠোঁটের একপাশ দিয়ে গড়িয়ে গেল। আয়নায় নিজেকে দেখলে তুমি। সুপুরুষ কিনা জানো না, তবে সুদর্শন তো বটেই তুমি! চকচক করছে চেহারা। শুধু ঠোঁটের একপাশ বেঁকে আছে তোমার। মৃদু, খুবই মৃদু ব্যথা চোয়ালে। তুমি একবার ডাক দাও রুনা...
পরের দিনটা বৃষ্টি। কী যে বৃষ্টি! তুমি বড় কুয়োটার পাশে। ছোট্ট চালার নিচে। মন দমে গেছে তোমার। আজ আর দেখা হবে না? কে জানে, হয়তো কোনো দিনই আর দেখা হবে না। চিঠিতে তুমি ভালোবাসার কথা লিখেছিলে। কিন্তু তোমাকে কে ভালোবাসবে? কী আছে তোমার? অকারণ ঠ্যাঙা একটা শরীর। তালপাতার সেপাই। শুধু চেহারায় না, পোশাকেও তুমি খুব নিম্নমধ্যবিত্ত! বৃষ্টির শব্দ বদলে যায়। উথাল হয়ে উঠে পৃথিবী। তারই মধ্যে সেই ছাতা, সেই নীল ড্রেস, সেই রিজওয়ানা! চোখে ভীতি। ঠোঁটে আশ্চর্যজনকভাবে মৃদু হাসি। তুমি তার ছাতার ভেতর। তুমি তার ছাতাটাকে ধরতে যাও... ভুল করে ছুঁয়ে ফেলো তার হাত, হাতের আঙুল! বৃষ্টি উথলে ওঠে। পথঘাট ডুবে যেতে থাকে। বড় কুয়োর ভেতর থেকে গলগল করে বেরোতে থাকে পানি! তোমরা ভেসে যেতে থাক প্রবল স্রোতের ভেতর।
রুনা তোমাকে নিয়ে ছুটছে। উবারের গাড়ি। কোলের ওপর তোমার মাথাটা জাপটে ধরে রেখেছে সে। মাঝে মাঝে বলছে, আর একটু! আর একটু! তুমি বুঝতে পারছ মারা যাচ্ছ তুমি! বুঝতে পারছ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তোমার... অথবা এমনই গুরুতর কিছু! চোখ বন্ধ করে, রুনার কোলের ওপর শুয়ে, তোমার রিজওয়ানার কথা মনে আসে।
লাকায় রাষ্ট্র হয়ে যায় খবর। বন্ধ্যা, বন্ধ হয়ে আসা কুয়োটাতে আবার জোয়ার উঠেছে। ভরে উঠেছে পানি। কুয়ো ঘিরে মানুষ। সবার দৃষ্টি নিচে। ঝকমক করছে পানি। তুমি বিরক্ত খুব। এত মানুষের ভিড়ে কীভাবে তুমি রিজওয়ানার ছাতার নিচে ঢুকে যেতে পার? তুমি অপেক্ষা করো। রিজওয়ানা আসে না।
কলিংবেলে চাপ দাও তুমি। রিজওয়ানার মা। কাকে চায়? কী চায়? কিছুই না আসে না উত্তর। শুধু একটা ব্যাগ ধরিয়ে দেয়। জানায় নিচে গাড়ি অপেক্ষা করছে। তারা চলে যাচ্ছে অন্যত্র। ডাক্তার স্বামীর বদলি হয়েছে। তোমাকে কি রিজওয়ানার মা স্টাফ ভেবে নিয়েছে?
তুমি ব্যাগ তোলো। হাত লাগাও জিনিসপত্র নামাতে। ট্রাক বোঝাই মালামাল। রিজওয়ানা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে উঠে যায় মাইক্রোবাসে। একবারও ফিরে তাকায় না। তোমার অনামিকা চলে যায় অনন্তের দিকে। তুমি অনেকক্ষণ চুপ করে এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকো। দাঁড়িয়েই থাকো! তারপর চিঠিগুলো উড়িয়ে দাও সেই কুয়োর ভেতর। পৃথিবীর প্রাচীন পায়রা হয়ে চিঠিগুলো ঘুরে ঘুরে পড়তে থাকে কুয়োর নিচে। অতলে। ভেসে ভেসে ডুবে যেতে থাকে পানির ভেতর।
সে রাতেই ধসে পড়ে কুয়োটা। এদিকে ধসে পড়া তুমি শুয়ে থাকো চিকিৎসকের সামনে। রুনা ধরে থাকে তোমার হাত। তোমার মনে হতে থাকে এই হাত রিজওয়ানার হলেই কি বেশি ভালো হতো?
হার্টে না, অসুবিধা নার্ভ সিস্টেমে। মস্তিষ্কের একটা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। তারা সিগন্যাল পাচ্ছে না তোমার শরীরের। ফলে আলগা হয়ে যাচ্ছে পেশি। ওষুধ আছে, ব্যায়ামও। তাতে কতটা সারবে তার পুরোটাই নির্ভর করছে তোমাদেরই কসরতের ওপর।
বেঁচে থাকা এক কসরত বটে। রুনা প্রাণান্ত করে তোমার জন্য। তোমার এই স্তব্ধতা কি ছড়িয়ে যাচ্ছে তোমার ঘাড়ে? হাতে? শরীরের অন্যত্র? রুনা তোমাকে আঁকড়ে ধরে রাতের বেলা। নিজের বুক খুলে দেয়। প্রেম খুলে দেয়। তোমাকে স্পর্শ করে মুঠোর ভেতর। তুমি জেগে উঠতে শুরু করলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেদিকে। তারপর হেসে তোমাকে বলে, আই লাভিউ!
বিয়ের ১২ বছর পর, তুমি জানো, আই লাভিউ বলা কতটা কঠিন। রুনাকে তোমার প্রথম প্রেমের মতো মনে হয়। বা মনে হয় তারও অধিক কিছু! তবে এসবের ভেতরে তোমার ভাবতে ভালো লাগে, যাবার সময়, বাবা-মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে রিজওয়ানা তোমার দিকে একবার তাকিয়েছিল... তুমি যা খেয়াল করোনি। বড় কুয়োর পাড়ে তোমার জন্য রিজওয়ানা একটা চিঠি রেখেছিল... যা তুমি পাওয়ার আগেই ধসে পড়েছিল কুয়োটা! আর তোমাদের প্রেমের অক্ষরগুলো, তোমাদের অজান্তেই, ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীময়!