হেরেও টেনিসে নতুন প্রাণ ফেরালেন নাওমি ওসাকা

২০২০ সালের পর থেকে সেরেনা উইলিয়ামস আর গ্র্যান্ড স্ল্যাম মঞ্চে বড় হুমকি ছিলেন না। তবে ২০২২ সালে ইউএস ওপেনে আনুষ্ঠানিক অবসর নেওয়া পর্যন্ত নারীদের টেনিসের ভার ছিল তারই কাঁধে। সেরেনাার বিদায়ের পর তৈরি হওয়া শূন্যতার মাঝেও নারী টেনিসের হাল ধরে রেখেছিলেন কয়েকজন।

ইগা শোয়ানতেক ছয়টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতে মাত্র ২৪ বছর বয়সেই হয়ে ওঠেন ভবিষ্যতের কিংবদন্তি হওয়ার অন্যতম দাবিদার। কোকো গফ তার ক্যারিশমায় মাঝে মধ্যে আমেরিকান ক্রীড়াপ্রেমীদের হৃদয় জয় করেছেন। যদিও তার খেলায় ধারাবাহিকতার অভাব রয়ে গেছে। আরিনা সাবালেঙ্কা যেকোনো গ্র্যান্ড স্ল্যামের শেষ অবধি থাকেন নিয়মিতিই। অদম্য শক্তি ও আগ্রাসী খেলায় শিরোপা ধরে রাখার লড়াই চালান। তবুও সেরেনার পর থেকে টেনিসে যে বিষয়টি অনুপস্থিত ছিল, তা হলো একজন আসল ‘সুপারস্টার’ এর। যিনি খেলার বাইরেও বৈশ্বিক ক্রীড়া সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারেন।

ঠিক এই জায়গাটায় একমাত্র নাম নাওমি ওসাকা। এবারের ইউএস ওপেনে তার দুর্দান্ত যাত্রা শেষ হলো সেমিফাইনালে। শুক্রবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের ২৪ বছর বয়সী অ্যামান্ডা আনিসিমোভার কাছে ৬-৭ (৪), ৭-৬ (৩), ৬-৩ গেমে হেরে বিদায় নেন ওসাকা। তবুও এই দুই সপ্তাহের পারফরম্যান্সকে নারীদের টেনিসের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২১ সালের পর ওসাকার  ক্যারিয়ার যেন গড়িয়ে পড়ছিল অন্ধকারের দিকে। কিন্তু এবার প্রমাণ হলো, সঠিক অনুপ্রেরণা ও লড়াই চালিয়ে গেলে ওসাকা আবারও হয়ে উঠতে পারেন নারী টেনিসের মুখ্য চরিত্র।

ম্যাচ শেষে ওসাকা বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি দুঃখিত নই। মনে হচ্ছে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। বরং এটা আমাকে অনুপ্রাণিত করছে আরও অনুশীলন করার জন্য, আরও ভালোভাবে ফিরে আসার জন্য। আমি নিজেকে নিয়ে রাগান্বিত নই।’ সেমির লড়াইয়ে প্রথম সেট জেতার পরও জয় হাতছাড়া করেন ওসাকা। অনিয়মিত ফর্মে থাকা আনিসিমোভার বিপক্ষে কয়েকবার ম্যাচ শেষ করার সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি। সময় যত গড়িয়েছে, ওসাকার পারফরম্যান্স কিছুটা নেমে এসেছে, শারীরিক অস্বস্তি বেড়েছে আর সেই সুযোগে আনিসিমোভা ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন।

অন্যদিকে আনিসিমোভার গল্পও কম নাটকীয় নয়। কয়েক মাস আগেই উইম্বলডনের ফাইনালে শোয়ানতেকের কাছে ৬-০, ৬-০ গেমে বিধ্বস্ত হওয়ার পর এবার আবারও বড় মঞ্চে উঠে এসেছেন তিনি। শনিবার তিনি নামবেন ইউএস ওপেন শিরোপার জন্য লড়াইয়ে। টানা দুই গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনালে উঠে নারী টেনিসে নিজের আগমনী বার্তার জানান দিচ্ছেন তিনি।

তবে আনিসিমোভার সাফল্য যাই হোক, নারী টেনিসের টিকে থাকা নির্ভর করে তারকাখ্যাতি ও ব্যক্তিত্বের ওপর। আর এই জায়গায় এখনো এককভাবে এগিয়ে আছেন নাওমি ওসাকা। ২০১৮ সালে সেরেনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে ইউএস ওপেন জেতার পর থেকেই তাকে মনে করা হয় নারী টেনিসের নতুন মুখ।

কিন্তু সেই হঠাৎ খ্যাতিই ভেঙে দিয়েছিল তাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান—দুই মহাদেশে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনসাধারণের এক বিশাল আইকন, যার কাঁধে চাপে খেলোয়াড়ী নৈপুণ্য ছাপিয়ে তারুণ্যের আদর্শ হিসেবে দায়িত্ব পালনের গুরুভার। ২০২১ সালে টোকিও অলিম্পিকের মশাল প্রজ্জ্বলনের সম্মান পেলেও তখন তিনি ছিলেন ভেতরে ভেতরে বিপর্যস্ত। গণমাধ্যম এড়িয়ে চলা, মানসিক এবং আরো নিখুঁত হওয়ার চাপ তাকে প্রায় ভেঙে দিয়েছিল। এরপর জন্ম দেন কন্যা সন্তানকে।

কিন্তু এ বছরের ইউএস ওপেন প্রমাণ করল, মানসিক ভাঙন কাটিয়ে তিনি আবারও লড়াইয়ে ফিরেছেন। ওসাকার ঈশ্বরপ্রদত্ত টেনিস প্রতিভা যেন নতুন করে জেগে উঠছে। এবারের ইউএস ওপেনে সেমিফাইনালে উঠে নিজের জায়গায় ফিরে আসার প্রমাণ রেখেছেন। শিরোপা শেষ পর্যন্ত আনিসিমোভা কিংবা সাবালেঙ্কার ঘরেই যাক না কেন, ওসাকার উপস্থিতিই নারী টেনিসের সবচেয়ে বড় জয়। তার প্রত্যাবর্তন শুধু একজন তারকার পুনর্জন্ম নয়, বরং পুরো খেলাটির জন্যই এক বিশাল আশীর্বাদ।