খুলনার নদনদীতে ১২ মাসে ৫০ লাশ

খুলনা অঞ্চলের নদ-নদীতে ক্রমবর্ধমান লাশ উদ্ধারের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গত ১২ মাসে এ অঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে মোট ৫০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩০টি লাশের পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও ২০টি লাশ এখনো অশনাক্ত রয়ে গেছে। এই ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। 

নৌ-পুলিশ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর ও সাতক্ষীরা জেলার নদ-নদী নিয়ে গঠিত নৌ-কার্যালয় খুলনাঞ্চল। এই কার্যালয়ের অধীনে রয়েছে খুলনা জেলার ভৈরব, রূপসা, কাজিবাছা, আঠারবেঁকী ও শিবসা নদী; বাগেরহাট জেলার পশুর ও শ্যালা নদী; পিরোজপুর জেলার সন্ধ্যা, কচা ও বলেশ্বর নদী; এবং সাতক্ষীরা জেলার নওবেঁকীসহ অন্যান্য নদ-নদী। 

নৌ-পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২ মাস ১ দিনে মোট ৫০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ জন পুরুষ, ৭ জন নারী এবং ১১ জন শিশু। লাশগুলোর মধ্যে রূপসা নদী থেকে ৪০ শতাংশ, ভৈরব নদী থেকে ৩০ শতাংশ, পশুর নদী থেকে ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য নদী থেকে ১০ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে।

মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায় খুলনা অঞ্চলের নদ-নদী থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ৫টি লাশ উদ্ধার হয়; যার মধ্যে ১টির পরিচয় শনাক্ত হয়, ৪টি লাশ শনাক্ত করা যায়নি। সেপ্টেম্বর মাসে ৪টি লাশ উদ্ধার হয়; এর মধ্যে শনাক্ত হয় ৩টি, শনাক্ত হয়নি ১টি। অক্টোবর মাসে ১টি লাশ উদ্ধার হয়, যা শনাক্ত হয়। নভেম্বর মাসে ৩টি লাশ উদ্ধার হয়; যার ২টি শনাক্ত হলেও অশনাক্ত ১টি। ডিসেম্বর মাসে ২টি উদ্ধার হয়; যার পরিচয় শনাক্ত হয়। চলতি বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারি মাসে ১টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ২টি ও মার্চ মাসে ৪টি লাশ উদ্ধার হয়। লাশগুলোর পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এপ্রিল মাসে ৩টি লাশ উদ্ধার হয়; এর মধ্যে ১টির পরিচয় শনাক্ত হয়, শনাক্ত করা যায়নি ২টির। মে মাসে ৬টি লাশ উদ্ধার হয়; যার ২টি শনাক্ত হলেও অশনাক্ত থাকে ৪টি। জুন মাসে ৬টি লাশ উদ্ধার হয়, এর মধ্যে শনাক্ত হয় ৪টি, শনাক্ত হয়নি ২টি। জুলাই মাসে ৩টি লাশ উদ্ধার হয়; এর মধ্যে ২টি শনাক্ত, শনাক্ত হয়নি ১টি। আগস্ট মাসে উদ্ধার হওয়া ৮টি লাশের ৫টি শনাক্ত হলেও অশনাক্ত লাশ ৩টি। এছাড়া চলতি মাসের ১ সেপ্টেম্বর বটিয়াঘাটা কাজীবাছা নদী থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই দিন রূপসা নদী থেকে আরেকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। যার পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

নৌ-পুলিশ সুপার ড. মঞ্জুর মোর্শেদ দেশ রূপান্তরকে জানান, নদ-নদীতে লাশ ফেলা অপরাধীদের কাছে নিরাপদ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নৌকা বা ফেরি থেকে পড়ে অথবা গোসল করতে গিয়ে অনেকের মৃত্যু হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।’

তিনি আরও জানান, স্থলভাগে লাশ ফেলার তুলনায় নদীতে ফেললে হত্যাকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়। পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে লাশের চেহারা বিকৃত হয়, জলজ প্রাণী দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শরীরের টিস্যু নষ্ট হয়ে যায়। এতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা অন্যান্য শনাক্তকরণ পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে পড়ে। শুধুমাত্র ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নির্ণয় সম্ভব হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। তিনি বলেন, ‘হত্যার ঘটনা বোঝা গেলে মামলা দায়ের করা হয়। লাশের পরিচয় পাওয়া গেলে স্বজনদের মাধ্যমে মামলা দায়ের হয়, আর পরিচয় না পাওয়া গেলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। অশনাক্ত লাশগুলো আঞ্জুমান মুফিদুলের মাধ্যমে দাফন করা হয়।’

নৌ-পুলিশ সুপার জানান, ইদানীং উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং তদন্তে দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগই হত্যাকাণ্ডের শিকার। তিনি বলেন, ‘হত্যার পর লাশ লুকানো কঠিন। নদীতে ফেলে দিলে অপরাধীদের ধরা কঠিন হয়।’

তিনি আরও জানান, কিছু অপরাধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংঘটিত হলেও হত্যাকাণ্ডে সাধারণত সিন্ডিকেট জড়িত থাকে না। তবে, মামলার সঠিক তদন্ত ও আসামিদের বিচার নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। 

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে। বৈধ-অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি করা প্রয়োজন।’ 

খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা সভা ও জনসভায় আমরা বারবার বলছি, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। গত বছর ৫ আগস্টের পর থেকে অসংখ্য মানুষ হত্যার শিকার হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে এই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হবে না।’

তিনি পুলিশের তৎপরতার ঘাটতির কথাও উল্লেখ করেন। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নদ-নদীতে লাশ ফেলার প্রবণতা কমাতে নৌ-পুলিশের টহল জোরদার করা, নদীপথে নজরদারি বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এছাড়া, স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এই সমস্যা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।