কুয়াকাটায় লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ বিলুপ্তির পথে 

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকতের বিস্তীর্ণ বালুচরে একসময় চোখে পড়ত হাজারো লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ। সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের পাশাপাশি এই দৃশ্যই ছিল কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু এখন সেই সৌন্দর্য প্রায় হারিয়ে গেছে। বন উজাড়, লাগামহীন পর্যটন, বেপরোয়া যানবাহন চলাচল এবং দূষণের কারণে দ্রুত কমে যাচ্ছে লাল কাঁকড়ার সংখ্যা। ফলে ধ্বংস হচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক আবাসভূমি, হুমকির মুখে পড়ছে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন শিল্প।

কুয়াকাটার পরিচিতি শুধু সমুদ্র নয়, এখানকার অনন্য লাল কাঁকড়ার জন্যও। দীর্ঘ বালুকাবেলায় হঠাৎ দৌড়ে বেড়ানো হাজারো কাঁকড়ার লালচে ঝলকই পর্যটকদের মুগ্ধ করত। অনেক বিদেশি ভ্রমণকারীর কাছেও এটি ছিল বাড়তি আকর্ষণ। কিন্তু আজ সেই দৃশ্য বিরল হয়ে গেছে। সৈকতে গেলে এখন হাতে গোনা কয়েকটি কাঁকড়াই চোখে পড়ে।

রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক সাকুর বলেন, কুয়াকাটায় আসার মূল কারণ ছিল লাল কাঁকড়ার দল দেখা। কিন্তু এসে দেখলাম সৈকত প্রায় ফাঁকা চোখে পড়ছে খুব কম, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।

মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বন বিভাগ মহিপুর রেঞ্জের সহযোগিতায় লেম্বুরবন সৈকতের একাংশে গাছের ডাল-ফালা দিয়ে কাঁকড়ার জন্য অস্থায়ী আশ্রয় তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে এ উদ্যোগ অস্থায়ী এবং সীমিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিত সংরক্ষণ না থাকায় কাঁকড়ার প্রজনন ও বসবাস ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।

IMG-20250909-WA0036

ট্যুর গাইড রহমান বিশ্বাস জানান, সৈকতে বেপরোয়া যানবাহন চলাচল এবং হোটেল-রিসোর্টের বর্জ্য ফেলার কারণে কাঁকড়ার সংখ্যা কমছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো কুয়াকাটায় লাল কাঁকড়া আর দেখা যাবে না।

উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কুয়াকাটা (উপরা) সদস্য শামীম রেজা বলেন, ২০২১ সালে আমরা লাল কাঁকড়া ও কচ্ছপ সংরক্ষণের জন্য আলাদা অঞ্চল ঘোষণার দাবি জানাই। কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা ছিল অস্থায়ী। এখন পরিস্থিতি ভয়াবহ।

পর্যটন সংগঠন টোয়াকের সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, কাঁকড়া শুধু কুয়াকাটার সৌন্দর্য নয়, জীববৈচিত্র্যেরও অংশ। পর্যটন উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে একসঙ্গে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। নইলে কুয়াকাটা তার বিশেষত্ব হারাবে।

বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম মনিরুজ্জামান বলেন, আমরা সীমিত আকারে কিছু সংরক্ষণ উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু টেকসই সমাধান সম্ভব নয় সরকারি পরিকল্পনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও পর্যটকদের সচেতনতা ছাড়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, লাল কাঁকড়া উপকূলীয় ইকোসিস্টেমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরা সৈকতের মাটি নরম রাখে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। আবাসভূমি ধ্বংস হলে প্রভাব পড়বে পুরো ইকোসিস্টেমে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বন ধ্বংস ও বর্জ্য দূষণের কারণে কাঁকড়ার প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এখনই সুরক্ষিত এলাকা ঘোষণা না করলে কয়েক বছরের মধ্যেই কাঁকড়ার অস্তিত্ব হারিয়ে যেতে পারে। তখন কুয়াকাটা শুধু কাঁকড়া হারাবে না, হারাবে তার স্বকীয়তাও।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কাঁকড়ার কারণে অনেক পর্যটক কুয়াকাটায় আসতেন। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণে আসা পর্যটকরা শিশুদের দেখানোর জন্য এই স্থানকে প্রাধান্য দিতেন। কাঁকড়া না থাকায় পর্যটক আকর্ষণ কমে গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কিছু কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে লাল কাঁকড়া ইতিহাস হয়ে যাবে। লাল কাঁকড়া শুধু কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয় বরং উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শিগগিরই বিলীন হয়ে যাবে এ প্রাণীর আবাসভূমি। এতে কুয়াকাটা হারাবে তার স্বকীয়তা, ক্ষতিগ্রস্ত হবে পর্যটন শিল্প এবং ধ্বংস হবে জীববৈচিত্র্য।