জাপানি শর্তে অস্বস্তিতে বেবিচক

থার্ড টার্মিনাল নিয়ে আবারও সংকটে পড়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। যখনই টার্মিনাল চালুর বিষয়টি সামনে আসছে তখনই নানা সমস্যায় পড়ছে তারা। টার্মিনালের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৯৯ ভাগ। কিন্তু কে পরিচালনা করবে টার্মিনাল তা নিয়ে বেধেছে বিপত্তি।

জাপানের ছয়টি প্রতিষ্ঠান কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়ায় অস্বস্তিতে পড়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিমান পরিচালনাকারী সংস্থাটি। এ নিয়ে গত মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলোর শর্ত নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে; তাদের শর্তগুলোর বিকল্প বের করার জন্য বেবিচককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার পাশাপাশি নিজস্বভাবে টার্মিনাল পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।

টার্মিনালের সর্বশেষ প্রস্তুতি ও ইমিগ্রেশনের অবস্থা দেখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা মঙ্গলবার রাতে টার্মিনাল পরিদর্শন করেছেন। বেবিচকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তখন উপস্থিত ছিলেন। ইইউ প্রতিনিধিরা থার্ড টার্মিনালের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তুষ্টিও প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, জাপানের কঠিন শর্তের পাশাপাশি আরও কিছু সমস্যায় পড়েছে বেবিচক। দক্ষিণ কোরিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্যামসাং কোম্পানি থার্ড টার্মিনালে অতিরিক্ত ৬০৫টি কাজ করেছে। তারা ৩০০০ কোটি টাকা দাবি করেছে সংস্থাটির কাছে; বেবিচক দিতে পারছে না। পুরো টাকা চেয়ে গত জুন মাসে প্রথম চিঠি দেয় স্যামসাং। কাজ না হওয়ায় গত ১৫ আগস্ট আবারও চিঠি পাঠিয়ে বলা হয়েছে, চলতি মাসের মধ্যে পাওনা অর্থ না দিলে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করবে তারা। আগামী সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে বেবিচকের। 

সার্বিক বিষয়ে জানতে গত রাতে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিককে একাধিকবার ফোন দিলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

বেবিচক সূত্র জানায়, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ পরিচালনায় শুরু থেকেই জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছিল বেবিচক। জাপানের দুটি সরকারি ও চারটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত ‘বিশেষায়িত কোম্পানি’ ১৫ বছরের জন্য টার্মিনালটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছে। মাস দুয়েক আগে বেবিচক কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধারদের সঙ্গে বৈঠক করে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো টার্মিনালের অপারেশনের দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে সেগুলো হচ্ছে, জাপানের সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশন, চারটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি একই কনসোর্টিয়ামের অংশীদার জাপানের মিনিস্ট্রি অব ল্যান্ড, ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

প্রতিষ্ঠানগুলো কঠিন কিছু শর্ত দিয়েছে বেবিচককে। শর্তগুলো হচ্ছে থার্ড টার্মিনালের দোকানপাট ও লাউঞ্জ নিয়ন্ত্রণ, পার্কিং চার্জ, বিলবোর্ড, বিভিন্ন অফিসের ভাড়া, বিমানের ল্যান্ডিং চার্জ, যাত্রী ভ্রমণ চার্জ, নিরাপত্তা চার্জসহ নানা ধরনের চার্জ বাড়ানোসহ আরও কিছু বিষয়।

মঙ্গলবারে বৈঠকে উপস্থিত থাকা বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাপানের শর্তগুলো অবাস্তব। প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব শর্ত দিয়েছে তা মানা সম্ভব নয়। জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলো টার্মিনালের অপারেশনের দায়িত্ব নিক এটা আমরাও চাই। কিন্তু সবকিছু যদি তারা নিয়ন্ত্রণ করবে তাহলে আমাদের কাজটা কী হবে? মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সবাই শর্তগুলোর বিরোধিতা করেছে। আমরা এখন অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করব। জাপানের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাবে বেবিচক।’

তিনি বলেন, ‘কোরিয়ান স্যামসাং কোম্পানির পাওনা নিয়ে আমরা বিপাকে পড়েছি। পাওনার অর্থও বেশি। এ অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। স্যামসাং কোম্পানির সঙ্গেও আমরা আলোচনা করছি। চলতি মাসের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার হুমকি দিয়ে রেখেছে। তারা যদি মামলা করেই বসে তাহলে চলতি বছর টার্মিনাল উদ্বোধন করা অসম্ভব হতে পারে।’ 

বেবিচক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। নির্মাণকাজে অর্থায়ন করেছে জাইকা। ভবনটির নকশা করেছেন বিখ্যাত স্থপতি রোহানি বাহারিন। তিনি এনওসিডি-জেভি জয়েন্ট ভেঞ্চার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সিপিজি করপোরেশন প্রাইভেট লিমিটেডের (সিঙ্গাপুর) স্থপতি। জাপানের শীর্ষ নির্মাতা কোম্পানি সিমুজি ও কোরিয়ার স্যামসাং নামের দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।

দুই দেশের চার শতাধিক দক্ষ জনবল সক্রিয় আছে নির্মাণকাজে। ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। টার্মিনালটিতে থাকবে ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটারের ৩৭টি উড়োজাহাজ রাখার অ্যাপ্রোন ও ১ হাজার ২৩০টি গাড়ি রাখার সুবিধা, ৬৩ হাজার বর্গফুট জায়গায় আমদানি-রপ্তানি কার্গো কমপ্লেক্স ও ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার। টার্মিনালের অন্যতম আকর্ষণ ফানেল টানেল। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমানবন্দরের সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে তৃতীয় টার্মিনালে।

সূত্র জানায়, থার্ড টার্মিনাল নিয়ে বেবিচক কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারও চাচ্ছে দ্রুত সময়ে টার্মিনাল উদ্বোধন করতে। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে টার্মিনাল চালুর বিষয়টি। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর শর্ত মেনে চুক্তি করলে থার্ড টার্মিনালে গাড়ি পার্কিংসহ অন্যান্য সার্ভিস চার্জ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। এর খেসারত গুনতে হবে টার্মিনাল ব্যবহারকারী দেশি-বিদেশি যাত্রীদের। থার্ড টার্মিনালের কাজ প্রায় শেষের দিকে। তারপরও বেবিচক চেষ্টা চালাচ্ছে আগামী ডিসেম্বরে উন্মুক্ত করতে। টার্মিনাল উদ্বোধনের দিনক্ষণ ঠিক করা নিয়েও সরকারের শীর্ষপর্যায়ে আলোচনা চলছে।

এ প্রসঙ্গে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বছরখানেক আগে টার্মিনালের বিভিন্ন কাজের জন্য টেন্ডার আহ্বান করেছিল বেবিচক। এতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুব্ধ। ফলে তারা শর্ত জুড়ে দিয়েছে। থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান না পেলে বেবিচকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করার বিষয়টি ভাবনায় আছে। এতে বাংলাদেশ লাভবান হবে। ১৪টি নতুন এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনার জন্য আবেদন করেছে টার্মিনালকে সামনে রেখে। সুন্দরভাবে সাজানো হচ্ছে পুরো টার্মিনাল।