এমনিতেই নেপালে জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত ক্রীড়া ক্ষেত্র। নেপালে ছড়িয়ে পড়া চলমান জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে আরও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ খাত। এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৪৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন, গুরুতর আহত অনেকেই। দেশের ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যে স্থান করে নিয়েছে এই জেন-জি বিপ্লব। দেশটির সিংহ দরবারসহ বিলিয়ন রুপির সম্পদ ছাই হয় তরুণদের ক্ষোভানলে।
নেপালি ফুটবলার ও ভক্তদের জন্য দশরথ রঙ্গশালায় প্রায় দুই বছর পর আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেরাটা ছিল আনন্দের মুহূর্ত। হোম অব ফুটবল হিসেবে পরিচিত এই স্টেডিয়ামকে এএফসি ঘোষণা করেছিল আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের অযোগ্য। ফলে এএফসি ও ফিফা অনুমোদিত ম্যাচ আয়োজন সেখানে বন্ধ ছিল। বাংলাদেশকে নিয়ে দুই লেগের ফিফা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের খবর নিশ্চিত হলে ভক্তদের মধ্যে উন্মাদনা তুঙ্গে পৌঁছায়। শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর) প্রথম ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হলে মঙ্গলবারের (৯ সেপ্টেম্বর) ম্যাচটা নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়ে যায় ফুটবলপ্রেমীদের। এই ম্যাচেই নির্ধারিত হতো সিরিজ সেরা। জয়ীদের হাতে উঠত শিরোপা। নিজেদের দলকে প্রিয় মাঠে শিরোপা নিয়ে উদযাপন করতে দেখতে চেয়েছিলেন তারা। তবে সোমবার থেকেই দেশ জুড়ে অস্থিরতা শুরু হওয়ায় দ্বিতীয় ম্যাচটি বাতিল করা হয়।
মঙ্গলবার ম্যাচটা যদি হতো এবং নিজে যদি গোল পেতেন, তাহলে এককভাবে নেপালিদের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যেতেন অঞ্জন বিস্তা। ম্যাচটি হয়নি বলে হরি খড়কা ও নিরঞ্জন রায়মাঝির সঙ্গে ১৩ আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ডটা এখনো ভাগ করে নিতে হচ্ছে তাকে। অঞ্জন বিস্তা ঘটে যাওয়া ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরলেন এভাবে, ‘অল্প সময়ে এত ধ্বংসযজ্ঞ আর এত প্রাণহানি হৃদয়বিদারক। জীবন ফুটবলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তবে আমরা সত্যিই আনন্দিত ছিলাম দশরথ স্টেডিয়ামে ফুটবল ফেরায়। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী না হওয়াটা হতাশাজনক।’ পোখারায় চলমান ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভিত্তিক এভারেস্ট মহিলা ভলিবল লিগও এই অস্থিরতার শিকার হয়েছে। ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের অংশগ্রহণে ৫-১৩ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত টুর্নামেন্টটির মাত্র ৯ ম্যাচ শেষ হওয়ার পর গত ৯ সেপ্টেম্বর মাঝপথে বাতিল করা হয়। কাঠমান্ডু স্পাইকার্স ও পোখারা নিনজাসের খেলোয়াড়দের থাকা হোটেলগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। এতে সৃষ্টি হয় চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ। থাইল্যান্ড, সার্বিয়া, রাশিয়া ও ক্রোয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ১৮ জন বিদেশি খেলোয়াড় এ আসরে অংশ নিয়েছিলেন। সহিংসতায় আতঙ্কিত হয়ে বেশিরভাগ বিদেশি এরই মধ্যে নেপাল ছেড়েছেন।
দেশটির সবচেয়ে বড় বহুমুখী ক্রীড়া আসর জাতীয় গেমসের ভাগ্যও এখন অনিশ্চিত। দশম আসরটি গত বছর কার্নালি প্রদেশে হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকারি অনীহায় স্থগিত হয়। চলতি বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে তা আয়োজনের নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই গেমস মাঠে গড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, রাষ্ট্রপতির দপ্তর ও সংসদ ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসগুলো ছাই হয়ে যাওয়ায় বাজেট বরাদ্দ পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের অক্টোবরে গন্ডকি প্রদেশে অনুষ্ঠিত সবশেষ আসরটি আয়োজনের পেছনে খরচ হয়েছিল প্রায় ৫৩৭.৯ মিলিয়ন নেপালি রুপি।
দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বার্ষিক ক্রীড়া পুরস্কার ‘পালসার স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ড’-এর ২২তম আসরও স্থগিত করা হয়েছে। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর পোখারায় এ অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা থাকলেও আয়োজক নেপাল স্পোর্টস জার্নালিস্টস ফোরাম (এনএসজেএফ) অনির্দিষ্টকালের জন্য তা পিছিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে তারা।
এই বিপ্লবে অর্থনৈতিকভাবেও বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে নেপালকে। সারা বিশ্বের পর্যটকরা হিমালয়ের দেশে ঘুরতে আসা নিয়ে দুবার ভাববেন। এ ঘটনায় আগামীর পথচলা যেমন থমকে গেছে, পিছিয়ে থাকা ক্রীড়াঙ্গনও চড়ে বসেছে উল্টোরথে। নেপালে অধিকাংশ খেলার ইভেন্ট স্পনসরশিপ-নির্ভর। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হওয়ায় এখন তারাই খেলাধুলা নিয়ে খুব বেশি ভাববে না। সামনে আরও অনেক টুর্নামেন্ট বাতিল বা স্থগিত হওয়ার শঙ্কায় কপালে ভাঁজ ক্রীড়া সংগঠকদের।
লেখক : সিনিয়র সহ-সভাপতি, নেপাল স্পোর্টস জার্নালিস্ট ফোরাম