শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ‘পাওয়ার হিটিং’ নিয়ে কোচিং ক্যাম্প পরিচালনা করার আগে শ্রীলঙ্কাতেও একই কাজ করেছিলেন জুলিয়ান উড। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগের মতো উডের কোচিংও বোধহয় পিক টাইমে ‘পাওয়ার কাট’। অথবা বলা যায়, নেদারল্যান্ডস আর হংকং এর মতো স্বঘোষিত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সুযোগ পেয়েও আগে ব্যাটিং না করে নিজেদের দুর্বলতা আড়াল করে রাখার যে প্রবণতা, তারই মাশুল দেওয়া শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে।

স্মার্ট ক্রিকেট, পাওয়ার হিটিং... কত কথাই তো বললেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। ম্যাচের প্রথম ২ ওভার মেডেন উইকেট, প্রথম রান ১৪তম বলে, তার আগে স্কোরবোর্ডে উইকেটের ঘরে বসেছে ২। এমন শুরুর পর স্পষ্ট হয়ে যায় কেন আসলে লিটন দাস টস জিতলেও ব্যাটিং নিতে চাইতেন না! শুরুতেই এমন বিপর্যয় হলে পরের দিকের ব্যাটসম্যানদের জন্য বিপর্যয় থেকে উত্তরণের নামে সময়ক্ষেপণটা ‘বৈধ’ হয়ে যায়। লিটন আর তাওহীদ হৃদয় সেটাই করছিলেন। হৃদয় একবার জীবন পেলেন চারিথ আসালাঙ্কা সহজ ক্যাচ ছাড়ায়, পরের বলে ৩ রান নিতে গিয়ে রানআউট হয়ে হৃদয় যেন জানান দিলেন কুৎসিত ব্যাটিং চালিয়ে যাবার ধৈর্য্য তার নিজেরও নেই। লিটন বেশ কিছু বলে পরাস্ত হচ্ছিলেন, কিছু বলে অল্পের জন্য ব্যাটের কানা লাগাননি। দাসুন শানাকার বলে খোঁচা মেরে স্লিপে ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান। ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গার বলে ২০ রানে থাকা অবস্থায় আম্পায়ার লেগ বিফোর উইকেটের সিদ্ধান্ত দিলেও রিভিউ নিয়ে ইনসাইড এজ হবার কারণে বেঁচে যান লিটন। এতকিছুর ভিড়ে ৪টা চারও মেরেছেন লিটন, ২৬ বলে ২৮ রানের ইনিংসের সমাপ্তি হাসারাঙ্গার বলে কট বিহাইন্ড হয়ে। এবারে হয়েছে উলটো। আম্পায়ার ফয়সল আফ্রিদি আউট দেননি, আসালাঙ্কা রিভিউ নিলে দেখা যায় বল লেগেছে লিটনের গ্লাভসে। শেখ মেহেদি হাসানকে কেন পাঁচে ব্যাট করতে পাঠানো হয়েছিল সেটা বোঝা যায়নি, অবশ্য তিনি নিজেই হাসারাঙ্গার গুগলি বুঝতে না পেরে ৯ রান করে আউট হয়ে যান। 

৯.৫ ওভারে ৫৩ রানে ৫ উইকেট নেই বাংলাদেশের। এমন অবস্থা থেকে ২০ ওভার শেষে বাংলাদেশের রানটা যে ১৩৯ হলো এবং আর উইকেট পড়ল না, সেই কৃতিত্ব শামীম হোসেন পাটোয়ারী আর জাকের আলী অনিকের। দল খারাপ করলে জাকের ভালো খেলেন, এটাই ক্রমশ সত্যি হচ্ছে। তবে তার ৩৪ বলে ৪১ রানের ইনিংসে মাত্র ২টা চার, পরিস্থিতি যাই হোক শেষ দিকের ওভারগুলোতে আরেকটু বেশিই তার কাছে প্রত্যাশিত। শামীম বাঘের মতো লাফিয়ে একটা নিশ্চিত রান আউট থেকে বেঁচেছেন, বেঁচে ৩৪ বলে ৪২ রানের ইনিংস খেলেছেন, মেরেছেন ৩ চার আর বাংলাদেশের ইনিংসের একমাত্র ছক্কা। পাওয়ার হিটিং কোচ আসার আগে শ্রীলঙ্কা সফরের টি-টোয়েন্টিতে বেশ ছক্কা মেরেছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। লিটন হংকংয়ের সঙ্গে ম্যাচের পর বলেছিলেন আবুধাবির মাঠ বড়, সেই মাঠে ছক্কা মারতে যদি সমস্যা হয় তাহলে পাওয়ার হিটিং কোচের কর্মশালা থেকে লাভটা হলো কি?

২০ ওভারে ৫ উইকেটে ১৩৯ রান বাংলাদেশের। শুক্রবার দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিংকে লন্ডভন্ড করে দেওয়া ফিল সল্ট-এর অর্ধেক বল (৬০) খেলে করেছিলেন বাংলাদেশের চেয়ে ২ রান বেশি (১৪১)। এখন পর্যন্ত টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের দুজন মাত্র ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করেছেন, তামিম ইকবাল ২০১৬ সালে আর পারভেজ হোসেন ইমন এই বছর। দুটোই এসেছে অপেশাদার ক্রিকেটারদের দল ওমান আর আরব আমিরাতের বিপক্ষে। সল্টের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি ৪টা। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশ দল হিসেবে অবস্থান কতটা তলানিতে, সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য এই পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। পাথুম নিশাঙ্কা ঠিক ফিল সল্টের মতো আগ্রাসী নন, তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে বেশ ভুগিয়েছেন। শ্রীলঙ্কা সফরে যাওয়া বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে ১৮৭ ও ১৫৮ করেছিলেন, রান করার অভ্যাসটা থাকলে সেটা সহজে চলে যায় না। নিসাঙ্কা ৩৪ বলে ৫০ রান করে শ্রীলঙ্কার ইনিংসের সুরটা বেঁধে দিয়েছেন। সঙ্গে কামিল মিশারা (৪৬*) আর চারিথ  আসালাঙ্কা (১০*) মিলে শেষ করেছেন বাকি কাজটা। ম্যাচের তখনো ৩২ বল বাকি।

শ্রীলঙ্কার কাছে হার বাংলাদেশকে ঠেলে দিল খাদের কিনারায়। ২ ম্যাচে ১ জয় আর ১ হার, ৪ দলের গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুইয়ে থেকে পরের পর্বে যাওয়ার সমীকরণটা কঠিন হয়ে গেল বাংলাদেশের জন্য। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে নিট রানরেটে। হংকংয়ের বিপক্ষে ধীরলয়ের ব্যাটিং আর শ্রীলঙ্কার কাছে ৩২ বল আগে হেরে যাওয়া, দুইয়ে মিলে বাংলাদেশের নিট রানরেট নেমে গেছে -০.৬৫০ তে। ফলে গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়াটাও এখন কঠিন লিটন বাহিনীর জন্য, যার অর্থ হচ্ছে সুপার ফোরের আগেই দেশে প্রত্যাবর্তন।