উপহারের ফ্ল্যাট পাওয়ার ঘটনা ফাঁস 

বেবিচকের সদস্য প্রশাসনকে নিয়ে অস্বস্তি, প্রত্যাহার দাবি

বেসামিরক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য প্রশাসন এস এম লাবলুর রহমানকে নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে। সদ্য অর্থ থেকে প্রশাসনে যাওয়া এই কর্মকর্তা বিগত ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সরকারিভাবে ফ্ল্যাট উপহার পাওয়ার ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর থেকে এই অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেবিচকের কর্মচারীদের আন্দোলনের সময় তার ছবিসহকারে ব্যানার টাঙিয়ে প্রত্যাহার দাবি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি সেটি ম্যানেজ করে নেন। অতি সম্প্রতি এই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করে প্রত্যাহারের দাবি করেছেন বেবিচকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও অভিযোগ ওঠে ওই ভোট রাতেই হয়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ পেয়ে সরকার গঠন করে। এরপর নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকটা গোপনে ফ্ল্যাট ও প্লট দেওয়া সরকার।

জানা যায়, বেবিচকের বর্তমান সদস্য (প্রশাসন) তৎকালীন সময়ে সেতু বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৯ সালের ১৭ জুন ফ্ল্যাট ব্যবস্থাপনা ও বরাদ্দ প্রদান কমিটির প্রথম সভায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষকসহ ১৪৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে এস এম লাবলুর রহমানও রয়েছেন। তিনি সে সময় সেতু বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার সঙ্গে ফ্ল্যাট পাওয়া অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে সেতু বিভাগের ওই সময়ের পরিচালক আলীম উদ্দিন আহমেদ, পরিচালক (প্রশাসন) এম কায়সারুল ইসলাম, পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) মো. সামসুজ্জামান, প্রধান প্রকৌশলী মো. ফেরদাউস, অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং) রেজাউল হায়দার, সেতু বিভাগের যুগ্ম সচিব এসএম আলম, অতিরিক্ত পরিচালক রূপম আনোয়ার, অতিরিক্ত পরিচালক মনিরুল আলম, অতিরিক্ত পরিচালক মাহমুদ ইবনে কাসেম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী লিয়াকত আলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (নদীশাসন) শফিকুল ইসলাম, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক আবু মো. শাখাওয়াত আকতার, সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শারফুল ইসলাম সরকার, আবুল হোসেন, গোলাম মর্তুজা ও তোফাজ্জেল হোসেন।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময় প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসা এই কর্মকর্তা বেবিচকে সদস্য (অর্থ) হিসেবে যোগ দেন। এরপর থেকেই তিনি যেন আলাউদ্দিনের প্রদীপ হাতে পান। যে কোনও কাজের অর্থ ছাড় করাতে গেলে তাকে নির্দিষ্ট পরিমান ঘুষ না দিলে সেটি পাস হতো না। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমানকে অনেকটা অলিখিত ক্যাশিয়ার বানিয়ে ফেলেছেন।

গত বছরের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় বেবিচক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিগত সরকারের লেজুড়বৃত্তি ও ঘুষ, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বেবিচক থেকে প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এ সময় এস এম লাবলুর রহমানকেও বেবিচক থেকে প্রত্যাহারের দাবি তোলা হয়। অন্যান্য কর্মকর্তা প্রত্যাহার হলেও তিনি ম্যানেজ করে থেকেই যেন।

জানা যায়, গত কয়েকদিন আগে তাকে সদস্য অর্থ থেকে সদস্য প্রশাসন নিযুক্ত করা হয়। এরই মধ্যে বিগত সরকারের নিকট থেকে উপহার হিসেবে ফ্ল্যাট পাওয়ার ঘটনা ফাঁস হলে তার বিরুদ্ধে আবারো ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, তাকে প্রাইজ পোস্টিং করা হয়েছে। বিগত সময়ে লেজুড়বৃত্তি করা এই কর্মকর্তা বেবিচকে সীমাহীন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। দ্রুত তাতে বেবিচক থেকে প্রত্যাহার করা না হলে আবারও আন্দোলন শুরু হবে।

এদিকে উপদেষ্টার নিকট লিখিত অভিযোগে বলা হয়, বেবিচকের উন্নয়ন কাজের বিল আটকে রেখে ঘুষ নেওয়া এই কর্মকর্তার প্রকাশ্য ঘটনা। আবার ঠিকাদারকে বিশেষ সুবিধা দিতে নিজেদের প্রকৌশলীদের নানাভাবে হয়রানিও করান। একজন সহকারী প্রকৌশলীকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে চাকরিচ্যুতির হুমকি দেন। আর হাফিজুর রহমান সমন্বয় কর্মকর্তা হলেও তাকে তার ব্যক্তিগত ক্যাশিয়ার বানিয়েছেন। বিভিন্ন বিল ভাউচার তার কাছে দিতে হয়। এরপর বিলের ওপর দরকষাকষি করে। মনমত অর্থ পেলে বিল ছাড় হয়। নয়তো দিনের পর দিন তাকে ওই বিলের জন্য ঘুরতে হয়।

অনেক সময় বাধ্য ঘুষের দাবিকৃত টাকা দিয়েই বিল পাস করানো হয়। দ্রুত তাকে প্রত্যাহার না করা হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরো আন্দোলনের মাধ্যমে প্রত্যহার করতে বাধ্য করবে।

এদিকে এ বিষয়ে জানতে সদস্য অর্থ এস এম লাবলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমাকে যদি সরকার এখান থেকে বদলি করে আমি চলে যাব। আমার কোনও সমস্যা নেই। সে সময় শুধু আমি একা না অনেকেই ফ্লাট পেয়েছেন আমিও পেয়েছি। আর এটি তো ফ্রি দেয়নি, আমাদের কিনে নিতে হইছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেবিচকে সুবিধা না করতে পারা এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এগুলো করছে। ওরা যা করতে পারে আমি তো সেটা পারি না। তাদের দাবি অনুযায়ী সরকার আমাকে বদলি করলে আমার কোনও সমস্যা নাই