উসাইন বোল্ট। বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের ইতিহাসে নামটি লেখা রয়েছে স্বর্ণাক্ষরে। ১০০ ও ২০০ মিটারের বিশ্বরেকর্ডের মালিক ট্র্যাককে ইতি জানিয়েছেন অনেকদিন। তার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্যামাইকানদের সোনালি পদক ভাগ্যও কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল। সেই ২০১৬ সালে বিশ্বমঞ্চে জ্যামাইকার জন্য সর্বশেষ সোনার পদক এনে দিয়েছিলেন বোল্ট। রিও অলিম্পিকে ট্রেবল জয়ের এক বছর পর লন্ডনে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে জীবনের শেষ স্প্রিন্টে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন বোল্ট। বোল্ট-উত্তর সময়ে জ্যামাইকানদের ভুগতে দেখা গেছে ট্র্যাকে। সেই ব্যাড প্যাচ থেকে দেশকে বের করে আনলেন ২৪ বছরের অবলিক সেভিল। মার্কিন আগ্রাসন থামিয়ে টোকিওতে জিতে নিলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের সবচেয়ে মর্যাদার ১০০ মিটারের সোনা। আর অনুজের বিশ্বজয় গ্যালারি থেকে বুনো উদযাপনে মেতে ওঠেন বোল্ট।
সেভিলের প্রমাণের দিনে ইতিহাস রচেছেন মার্কিন তরুণী মেলিসা জেফারসন-উডেন। অথচ রবিবার সন্ধ্যায় সব আলো ছিল পকেট-রকেট খ্যাত শেলি-অ্যান ফ্রেজার-প্রাইসের ওপর। জীবনের শেষ স্পিন্টে নেমেছিলেন জ্যামাইকান কিংবদন্তি। পদক জিততে পারেননি, তবে শেষটা রাঙিয়েছেন দারুণ উদযাপনে। শেষবারের মতো ট্র্যাকে দৌড়ে গোটা বিশ্বকে জানিয়েছেন হাসিমুখে বিদায়।
বোল্ট যুগে জ্যামাইকার ছিল ট্র্যাকে জয়জয়কার। বোল্টের ছায়ায় থেকেই ফুরিয়ে গেছেন আসাফা পাওয়েল, ইয়োহান ব্ল্যাকরা। প-িতরা বলে থাকেন, বোল্টের সমসাময়িক না হলে পাওয়েল-ব্ল্যাকরাও ইতিহাস ভাঙা-গড়ায় মেতে উঠতেন। তবে বোল্টের বিদায়ের কিছু পরেই পাওয়েল-ব্ল্যাকরাও হারিয়ে যান। তাতে জ্যামাইকানদের মধ্যে সৃষ্টি হয় শূন্যতা। অলিম্পিক কিংবা বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ। কোথাও পেরে উঠছিলেন না বোল্টের উত্তরসূরিরা। এই সেভিলের কথাই ধরুন। ২০২১ টোকিও অলিম্পিকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন। সে বছর ওরেগনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারতেন ফাইনালে। তবে জেতা হয়নি পদক (চতুর্থ হন)। বুদাপেস্টে ২০২৩ বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ব্যক্তিগত সেরা ৯.৮৬ সেকেন্ডে দৌড়ালেও হতে হয় চতুর্থ। ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে নিজের টাইমিংয়ের উন্নতি করলেও (৯.৮১ সেকেন্ড) ফাইনাল শেষ করেন আটে থেকে। তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পদকের চেষ্টাটা বজায় রেখে শেষ পর্যন্ত টোকিওতে দৌড়ালেন ৯.৭৭ সেকেন্ডে। তাতেই ঘুচল জ্যামাইকানদের সোনার অপেক্ষা। হারালেন স্বদেশি কিশান থম্পসন (৯.৮২) ও মার্কিন নোয়াহ লাইলসকে (৯.৮৯)। এক দশক পর বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে জ্যামাইকার ঘরে যুক্ত হলো প্রথম সোনার পদক। ট্র্যাকে সেরা হয়ে গায়ের পোশাক ছিঁড়ে ফেলে পাগলাটে উদযাপনে মাতলেন সেভিল। গ্যালারিতে সেই উদযাপনে যোগ দিয়েছিলেন বোল্টও। সোনা জয়ের প্রতিক্রিয়ায় সেভিল বলেন, ‘সত্যি আমি অভিভূত ও রোমাঞ্চিত জ্যামাইকার ঘরে সোনার পদক ফিরিয়ে দিতে পেরে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো আমি সত্যিকারের একজন দাবিদার ও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সব সামর্থ্য আমার আছে। ২০১৬ সালে শেষবার আমরা সোনা জিতেছিলাম। সেটা উসাইন বোল্টের হাত ধরে। যখন জানলাম আমিই জিতেছি, তখন আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।’ বোল্টও ভীষণ উচ্ছ্বসিত দুই স্বদেশিকে সেরা হতে দেখে। সেভিলের সেরা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে বোল্টের চোখেমুখে তাতেই বোঝা গেছে এই সাফল্য তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বোল্ট নিশ্চয় খুব করে চেয়েছিলেন তার যুগে নারীদের সেরা শেলি-অ্যান ফ্রেজার-প্রাইসের শেষ রেসে পদক জয়। সেটা হয়নি। স্বদেশি কেউ সোনাও জিততে পারেনি। ইতিহাস গড়ে সেটা জিতেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেলিসা জেফারসন-উডেন। ১০.৬১ সেকেন্ড সময় নিয়ে তিনি জিতে নেন সোনার পদক, যা নতুন চ্যাম্পিয়নশিপ রেকর্ড। রুপা জিতেছেন জ্যামাইকার টিনা ক্লেটন (১০.৭৬), আর ব্রোঞ্জ পান গত অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন সেন্ট লুসিয়ার জুলিয়েন আলফ্রেড (১০.৮৪)। জেফারসন-উডেন সোনা জয়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি এই মুহূর্তটার স্বপ্ন দেখছিলাম। চাপ হিসেবে না দেখে এটাকে উপভোগ করেছি, আর সেই মানসিকতার ফলেই আজ সোনার পদক পেলাম।’
জাপান ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের হাজারো ভক্ত অবশ্য অপেক্ষায় ছিলেন ফ্রেজারের জন্য। এই কিংবদন্তি ১১.০৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে থাকলেও দর্শকদের হৃদয় জয় করেছেন বিদায়ী দৌড়ে। ৩৮ বছর বয়সী ফ্রেজার-প্রাইসের এটাই ছিল নবম ও শেষ বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ব্যক্তিগত ইভেন্ট। যদিও তিনি এখনো ৪ী১০০ মিটার রিলেতে নামার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ফ্রেজার-প্রাইসের ক্যারিয়ারে ২৪টি আন্তর্জাতিক পদক এর মধ্যে ৮টি অলিম্পিক (৩টি সোনা) আর ১৬টি বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের পদক রয়েছে (১০টি সোনা)।