জাকসু নির্বাচনে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চায় শিক্ষক নেটওয়ার্ক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে ওঠা নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং পক্ষপাতের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’ নামের একটি সংগঠন। আজ সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সংগঠনটির প্রেস টিম থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবি জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন ছিল ১১ সেপ্টেম্বর। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির পর এই নির্বাচন ভীষণ আগ্রহ ও উদ্দীপনা তৈরি করেছিল। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচনটি একদিকে যেমন ছিল ত্রুটিপূর্ণ, তেমনই বিতর্কিত। অব্যবস্থাপনায় ভরা নির্বাচনটির এই প্রক্রিয়ায় মাশুল গুনতে হয়েছে আমাদের একজন তরুণ শিক্ষককে তার জীবন দিয়ে। নির্বাচন কমিশন গঠনের শুরু থেকেই এর অদক্ষতা, লোকবল বাড়াতে অনীহা, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব, প্রার্থী বিশেষের প্রতি বিরূপতা ইত্যাদি বিবেচনা করলে সহকর্মী জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যুর পটভূমিতে মারাত্মক অদক্ষতার একটা পরিবেশ আমরা দেখতে পাই। মরহুম জান্নাতুল ফেরদৌসের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমরা সমবেদনা জানাই। একই সঙ্গে অদূরদর্শী কর্মপরিকল্পনারহিত নির্বাচন কমিশনের নিন্দা করি।

নির্বাচনের দিন যেসব সমস্যা দেখা গেছে

সংগঠনটি আরও জানায়, নির্বাচন প্রক্রিয়াটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেসব গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত ছিল, সেগুলো হলো:

  • ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকা ও ব্যালট।
  • ভিপি প্রার্থী অমর্ত্য রায়কে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর এবং নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর অনিয়মিত ছাত্র হিসেবে দেখিয়ে নির্বাচনের চার দিন আগে তার প্রার্থিতা বাতিল করা।
  • ব্যালট পেপার ছাপানো হয়ে যাওয়ার পর ডোপ টেস্টের প্রাসঙ্গিকতা জানতে চাওয়া হলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয় ব্যালট পেপার এখনো ছাপানো হয়নি।
  • নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স হলে হলে পাঠানোর অভিযোগ।
  • পোলিং এজেন্ট না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নির্বাচনের আগের দিন রাত আড়াইটার সময় পোলিং এজেন্ট রাখার ঘোষণা।
  • ভোট কেন্দ্রে প্রার্থীদের ঢুকতে বাধা দেওয়া এবং ছাত্রীদের হল পরিদর্শনে প্রার্থী ও সাংবাদিকদের বাধা প্রদান।
  • নির্ধারিত ভোটারের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার সরবরাহ, যা বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি করে।
  • অমোচনীয় কালির দাগ উঠে যাওয়ার ঘটনা, যা ভোট কারচুপির সুযোগ তৈরি করে।
  • ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় অনেক বৈধ শিক্ষার্থী ভোট দিতে পারেননি।
  • জাল ভোটের প্রমাণ পাওয়া।
  • কোনো কোনো হলের একাধিক প্রার্থীর নাম ছাপা না হওয়া বা কতজন সদস্যকে ভোট দিতে হবে, সেই নির্দেশনায় ভুল সংখ্যা লেখা।
  • নির্ধারিত সময়ে সব হলে ভোট গ্রহণ শেষ না হওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের আড়াই ঘণ্টা পরেও ভোট গ্রহণ চলতে থাকা।
  • ওএমআর পদ্ধতিতে ভোট গণনায় প্রশ্ন ওঠায় হাতে গণনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও বাস্তব পদ্ধতি অনুসরণ না করা।
  • নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা তিনজন সহকর্মীর অতিরিক্ত ব্যালট পেপার সরবরাহ এবং অমোচনীয় কালির দাগ উঠে যাওয়ার অভিযোগ তুলে দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়া।
  • একই অভিযোগ এনে আটটি প্যানেলের মধ্যে পাঁচটি প্যানেলের নির্বাচন বর্জন।
  • নির্বাচনের দিন ক্যাম্পাসের সব খাবার ও চায়ের দোকান বন্ধ রেখে উৎসবমুখর পরিবেশকে দমবন্ধ দশায় পরিণত করা।
  • নির্বাচনের দিন দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফটকে জড়ো হওয়া।
  • পাঁচজন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে দুজনের নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে পদত্যাগ।  

বিবৃতিতে বলা হয়, এসব থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যেকোনো প্রকারে একটি দলকে জিতিয়ে নিয়ে আসার লক্ষ্যে সমস্ত মনোযোগ দেওয়া হয়েছে এবং প্রার্থী, রিটার্নিং অফিসার এবং নির্বাচন কমিশনারদের বর্জন, পদত্যাগ ও সমস্ত অভিযোগকে উপেক্ষা করা হয়েছে। উল্লেখিত কারণগুলো থেকে এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, নির্বাচনটি পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছে এবং গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এর দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপরই বর্তায়। একই কারণে আমরা এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করি এবং মনে করি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এইসব কারসাজি উন্মোচন হওয়া জরুরি।