সালাহউদ্দিনের প্রিয় ছাত্রকে যেন আউট করতে চায় না প্রতিপক্ষ

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বছর দুয়েক তো হতে চলল জাকের আলী অনিকের। গাত্রবর্ণের কারণে নির্বাচকরা তাকে চেনেন না কিংবা চোখে দেখেন না, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের কোচের দায়িত্ব পালন করার সময় এমন অভিযোগ করেছিলেন মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। তিনি গত মাস দশেক ধরে জাতীয় দলের সহকারী কোচ। জাকেরও খেলছেন নিয়মিত, তিন সংস্করণেই। ৫ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে সালাউদ্দিনকে নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, ২ অক্টোবর জাকেরের টেস্ট অভিষেক আর ৯ নভেম্বর ওয়ানডে। মাসে ৪ লাখ টাকা বেতনে বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তির সি গ্রেডেও আছেন জাকের। টি-টোয়েন্টিতে যখন ব্যাটিংয়ে নামেন জাকের, তখন তার কাছে প্রত্যাশা থাকে ইনিংসের শেষটা টানা। ইনিংসের সমাপ্তির কাছাকাছি ওভারগুলোতে যতটা বেশি সম্ভব বাউন্ডারি এবং ওভার বাউন্ডারি আদায় করা। এই কাজটায় প্রতিনিয়তই ব্যর্থ হচ্ছেন জাকের, বরং টপ অর্ডার যেদিন অল্পতেই ধসে পড়ে তখন ইনিংসের মাঝামাঝি সময়ে ২২ গজে এসে সাবধানী ইনিংস খেলে নিজের ব্যাটিং গড়টা ঠিক রাখছেন। অপরাজিত থাকার অপচেষ্টায় দলীয় সংগ্রহটা বড় হতে দিচ্ছেন না জাকের।

এবারের এশিয়া কাপে জাকেরের মোট রান ৩ ইনিংসে ৫৩, গড় অসীম। কারণ একটা বারও প্রতিপক্ষের বোলাররা আউট করতে পারেননি জাকেরকে। এইটুকু পড়ে মনে হতে পারে অসাধারণ কৃতিত্ব। কিন্তু আসলে প্রতিপক্ষ হয়তো জাকেরকে আউটই করতে চায় না, কারণ তাকে উইকেটে রাখলেই যে সীমিত ওভারের খেলায় বাংলাদেশের ইনিংসটা বড় হয় না!

হংকং-এর বিপক্ষে জাকের যখন ব্যাটিং পেয়েছেন তখন বাংলাদেশ জয়ের দ্বারপ্রান্তে, ১টা বল খেলেছেন তাতে ফ্লিক করতে গিয়ে ব্যাটে বলে করতে না পারলেও লেগবাই নিয়ে দুই দলের রান সমান করেছেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৪ বলে করেছেন ৪১*।  কারও কারও চোখে বাংলাদেশকে সম্মানজনক সংগ্রহে পৌঁছে দেওয়ার কারিগর জাকের। কিন্তু ইনিংসটা বিশ্লেষণ করলেই বেরিয়ে আসবে তার দুর্বলতা। ব্যাটিংয়ে নেমেছেন ৮ম ওভারের তৃতীয় বলে, চতুর্থ উইকেট পতনের পর। শুরুতে না হয় ব্যাটিং অর্ডারের ভঙ্গুর দশা বাঁচাতে একটু সাবধানী ভঙ্গিতেই খেলেছেন সিঙ্গেলস আর ডাবলসে, মুখোমুখি হওয়া অষ্টম ডেলিভারিতে প্রথম বাউন্ডারি। সেটা ছিল ১১তম ওভারের চতুর্থ বল। জাকের পরের বাউন্ডারিটা মেরেছেন ২০তম ওভারের পঞ্চম বলে। তার ৩৪ বলের ইনিংসের ৩৩তম বল। মাঝে ৩টা ডট। ১৮তম ওভারে দুষ্মন্থ চামিরার ৪টা বল খেলেছেন জাকের, কোনো বাউন্ডারি মারতে পারেননি। ১৯তম ওভারেও ৪ বল খেলেছেন জাকের, তাতেও কোনো বাউন্ডারি নেই। ২০তম ওভারে খেলেছেন ৪ বল, তাতে ১টা মাত্র বাউন্ডারি। ১০ম ওভারের পঞ্চম বলের পর কোনো উইকেটই পড়েনি বাংলাদেশের, ডেথ ওভারেও হাতে ৫ উইকেট থাকার পরও পর্যাপ্ত বাউন্ডারি মারতে না পারার দোষটা জাকের চাপিয়েছেন বাতাসের ওপর! এই ব্যাটিং পজিশনে ১২০ স্ট্রাইক-রেটে ব্যাট করাটা বেমানান এবং মোটেও পরিস্থিতির দাবি মেটানোর উপযুক্ত নয়।

আফগানিস্তানের বিপক্ষেও জাকের ১৩ বলে করেছেন ১২* রান। ১৯তম ওভারের শেষ ৩টা বল স্ট্রাইকে থেকেও রান করতে পারেননি। সব মিলিয়ে ১৩ বলের ইনিংসে ৭টাই ডট। ১৮তম ওভারের শেষ বল এবং ১৯তম ওভারের শেষ ৩টা বল-সহ স্ট্রাইক ফিরে পাওয়ার পর ১৯তম ওভারের পঞ্চম বলটাও ডট দিয়েছেন জাকের। টি-টোয়েন্টিতে শেষের দিকের ওভারগুলোতে যেখানে ব্যাটসম্যানরা ১৫-২০ রান নেওয়ার প্রচেষ্টায় থাকেন, তখন জাকের একের পর এক বল ডট দিয়েছেন একই ভঙ্গিতে শট খেলার প্রচেষ্টায়। অফস্টাম্পের দিকে সরে এসে জাকের চেষ্টা করেন ফ্রন্টফুট ক্লিয়ার করে বলটা লং অন দিয়ে উড়িয়ে মারার চেষ্টায় সর্বশক্তি দিয়ে ব্যাট ঘোরান। কিন্তু এত বেশি আগে নিজের উদ্দেশ্য বোলারের কাছে জাকের স্পষ্ট করে তোলেন যে বোলার তখন বলের গতি কমিয়ে জাকেরের টাইমিং গড়বড় করে দিচ্ছেন অথবা ওয়াইড ইয়র্কার দিয়ে বলটাকে জাকেরের হিটিং রেঞ্জের বাইরে ফেলছেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৪ বল আর আফগানদের বিপক্ষে ১৩ বল, মোট ৪৭টা বল খেলে জাকের বাউন্ডারি মেরেছেন মাত্র ৩টি। কোনো ছক্কা নেই।

জাকেরের এই একমুখী চিন্তা থেকে ব্যাটিংয়ের সমালোচনা করেছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও কোচ মিসবাহ উল হক। একটি টিভি অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে এসে প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের ট্র্যাজিক হিরো মিসবাহ বলেছেন, ‘ঠিক আছে জাকের বল মারতে পারছে না। কিন্তু এটা অপরাধ যে আপনি তিন ওভারে শুধু বল মিসই করে গেলেন। সেøায়ার বল কিপারের কাছে যাচ্ছে, একটু সামনে বল দিলে সেটাও আপনি মিস করছেন। ফিনিশার হিসেবে আপনি বল মারতে চাইবেন ঠিক আছে, কিন্তু ব্যাটার হিসেবে বল ব্যাটে লাগা জরুরি। এক রান তো আপনি যেকোনো জায়গায় খেললে পাবেন। একটু ফাঁকা জায়গায় খেললে দুই রানও নেওয়া যায়। পুরোপুরি পরাস্ত হলে তো বল আর রানও সমান হবে না।’ পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শোয়েব মালিকও জাকেরের এই কৌশলের তীব্র সমালোচনা করেছেন, ‘মাঠের একপ্রান্তে খেলে জাকের যদি মনে করে রান আসতে থাকবে, সেটা আসলে হবে না। অফস্টাম্পের বাইরে তাকে বোলিং করা শুরু করে। আমরা দেখেছি, শেষের চার ওভারে সেট ব্যাটার হিসেবে আপনি খেলছেন, কিন্তু বল ব্যাটে লাগাতে পারলেন না। মানে হচ্ছে কোনো সমস্যা হচ্ছে। ওটা ঠিক করতে হবে। আপনার কাছে পুরো মাঠ আছে, যেখানে বল আসে সেখানে খেলেন।’

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের হয়ে বিপিএলের একটা মৌসুমে উইকেট আগলানোর পাশাপাশি ব্যাটিংয়ে ফিনিশিং রোলে জাকেরের কিছু কার্যকর ইনিংস তাকে জাতীয় দলের আলোচনায় নিয়ে আসে। তবে সব বলেই একই ভঙ্গিমায় অর্থাৎ অফ সাইডে সরে এসে ওপেন চেস্ট স্টান্সে লেগ মিডলে আসা বলকে অনসাইডে উড়িয়ে মারার প্রচেষ্টা শোয়েব মালিকের কাছে মনে হয়েছে দৃষ্টিকটু, ‘জাকের আলীকে ওরা ফিনিশার বলে। কিন্তু তাকেও চিন্তা করতে হবে ক্রস অ্যাঙ্গেলেই মিড উইকেটের দিকে রান আসবে না। তাকে চিন্তা করতে হবে, আপনার বিপরীতে অনেক অ্যানালিস্ট কাজ করে, বিশ্লেষণ হয় গেম প্ল্যান নিয়ে, আপনাকে কাভারেও খেলা শুরু করতে হবে।’

এশিয়া কাপ খেলতে আসার আগে বিমানবন্দরে জাকের শুনিয়েছিলেন শিরোপা জয়ের প্রত্যাশা। তবে দল মাঠে নামার পর তার ব্যাটিং কৌশল এবং মানসিকতাই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা।