বন্ধুত্ব ভুলে শ্রীলঙ্কা এখন প্রতিপক্ষ

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতি ভুলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা হয়ে উঠেছিলেন শ্রীলঙ্কার পরম বন্ধু। আফগানিস্তানের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার জয় ছিল বাংলাদেশের কোটি ভক্তের চাওয়া। কারণ তাতেই যে বাংলাদেশের জন্য খুলে যাবে সুপার ফোর-এর দরজা। হয়েছেও তাই, শ্রীলঙ্কা হারিয়েছে আফগানদের। সুপার ফোর পর্বে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ।

সুপার ফোরে দুবাইতে শনিবার প্রথম ম্যাচে প্রতিপক্ষ সেই শ্রীলঙ্কা, যাদের জন্য মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই সামাজিক মাধ্যমে শুভ কামনার স্রোত বইয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের দর্শকরা!

একটা সময় ক্রিকেট কূটনীতির জগতে শ্রীলঙ্কা ছিল বাংলাদেশের পরম মিত্র। ভারত ও পাকিস্তান, এশিয়ার দুই শক্তিশালী ক্রিকেট দলের পাশে শ্রীলঙ্কা ছিল দুর্বল এক দল। সেই শ্রীলঙ্কা ১৯৯৬ সালে চমক দেখিয়ে জিতে নেয় বিশ্বকাপ, এরপর ধীরে ধীরে সিংহল দ্বীপ থেকে উঠে এসেছেন অনেক কিংবদন্তি, একাধিক বিশ্ব আসরের ফাইনাল খেলে ২০১৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও জিতেছে শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়নের অনেক সহযোগীই শ্রীলঙ্কান, নানান সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কোচ, ট্রেনার-সহ অনেক পদেই কাজ করেছেন শ্রীলঙ্কার নাগরিকরা। তবে সম্পর্কের সমীকরণটা বদলে যায় ২০১৮ সালের নিদাহাস ট্রফি থেকে।

অনুশীলনে বাংলাদেশ দল। ছবি : মোশারফ হোসেন, দুবাই থেকে

ড্রেসিং রুমের কাচের দরজা ভাঙা, নাগিন নাচের ভঙ্গিতে উদযাপন এবং সেখান থেকে ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপের টাইম-আউট কান্ড দুই দেশের ভেতর ক্রিকেট বৈরিতার জন্ম দিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদিও বলেছিলেন, ‘আপনারা একটা কথা মনে রাখবেন, বাংলাদেশ কখনো শ্রীলঙ্কা হবে না, হতে পারে না’। বাংলাদেশের ক্রিকেটে শ্রীলঙ্কার সমান হতে হলে অন্তত একটা করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিততে হবে, যে সামর্থ্যরে ধারেকাছে এই সময়ে বাংলাদেশ নেই। তাই ক্রিকেট অর্জনে বিশাল পার্থক্য হলেও দর্শক ও খেলোয়াড়দের আচরণ যে বৈরিতার জন্ম দিয়েছিল, এক সন্ধ্যায় সেটা ক্ষণিকের জন্য বদলে গেলেও মিলিয়ে যায়নি।

শ্রীলঙ্কা দলের সহকারী কোচ থিলিনা কান্দাম্বি এসেছিলেন সংবাদ সম্মেলনে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে বেশ কিছু ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবার কথাই বলেছেন তিনি, ‘আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায়ই খেলেছি। মানে, গত তিন-চার মাসের মধ্যে আমরা প্রায় চার-পাঁচটা ম্যাচ খেলেছি। তাই আমরা তাদের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে জানি এবং আমি নিশ্চিত যে আমাদের ছেলেরা একটা ভালো লড়াই দেবে’।

বাংলাদেশ দল অবশ্য নিজেদের শক্তি এবং দুর্বলতাই বের করতে পারেনি এখনো, স্বয়ং বিসিবি প্রেসিডেন্টই বলেছেন যে, আফগানিস্তানের বিপক্ষে সাড়ে ৪ বোলার নিয়ে খেলেছে বাংলাদেশ। একাদশ বাছাইতে ছিল গরমিল। গ্রুপ পর্বের ৩ ম্যাচেই অত্যন্ত নেতিবাচক ক্রিকেট খেলে ভাগ্যের জোরে পার পেয়ে যাওয়া বাংলাদেশ সুপার ফোরে কতটা বদলাবে নিজেদের?

সংবাদমাধ্যমের সামনে পেস বোলিং কোচ শন টেইট এসেছিলেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে। বাংলাদেশের চলমান কুৎসিত ব্যাটিং প্রদর্শনী এবং উদ্ভট একাদশ বাছাইয়ের পেছনে এই অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রলোকের কোনো দায় বা অবদান নেই। তাই তো তাকে মাইক্রোফোনের সামনে ঠেলে দেওয়া। টেইট নিজেও স্বীকার করেছেন নিজের কাজের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কোনো ধারণাই তার নেই, ‘পঞ্চম বোলার কে হবে আমি জানি না, সত্যি বলছি কোনো ধারণা নেই। ব্যক্তিগতভাবে এই সিদ্ধান্ত আমার নেওয়ার কথা নয়। আমি হয়তো একটা সুযোগের কথা বললাম। এখানে বসে আমি জানি না কে একাদশে সুযোগ পেতে যাচ্ছে।’

এখন পর্যন্ত এশিয়া কাপে বাংলাদেশ যে ম্যাচটা হেরেছে সেটা শ্রীলঙ্কার সঙ্গেই। প্রথম দুই ওভারই গেছে মেইডেন উইকেট, হার মানতে হয়েছে ৩২ বল আগে। একপেশে হারের স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে আজ আবার যখন মাঠে নামা, তখন ব্যাটিংয়ে কোনো পরিবর্তন কি আসছে? টেইট বললেন, ‘আমাদের দলে কোনো সমস্যা নেই, কাল রাতেই (শনিবার) দেখতে পাবে।’

ইনিংসের গোড়াপত্তনে তানজিদ তামিমের সঙ্গে সাইফ হাসানের জুটি আফগানদের বিপক্ষে খানিকটা রান করেছে ঠিকই, তবে সাইফের কুৎসিত ব্যাটিং চোখ এড়ায়নি। সেই সঙ্গে মাঝের ওভারে তাওহীদ হৃদয়ের স্বার্থপর ব্যাটিং, ফিনিশারের ভূমিকায় জাকের আলীর একমুখী প্রবণতা আর শামীম ও সাইফকে অলরাউন্ডার বানাবার নির্লজ্জ প্রচেষ্টা, সবই ছিল দৃষ্টিকটু। ভাগ্যগুণে আর পরের ঘাড়ে পা রেখে সুপার ফোর পর্বে উঠেছে বাংলাদেশ। বাকিটাও তাই ভাগ্যের ওপরই ছেড়ে দেওয়া ভালো।