ধর্মসাগর পাড়ে বসুন্ধরা বিস্ফোরণ

ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামের ঠিক পাশেই প্রাচীন জলাধার ধর্মসাগর। বৃত্তাকার স্টেডিয়ামটি নান্দনিক সৌন্দর্য চোখ জুড়িয়ে যাবে। তবে এ মাঠকে যারা হোম ভেন্যু করেছে, সেই মোহামেডান ও আবাহনীর অবহেলায় মাঠের অবস্থা তথৈবচ। একেবারেই অপ্রস্তুত মাঠে হলো ঘরোয়া মৌসুমের সূচনা। গত মৌসুমের মতো শুরুটা হলো বসুন্ধরা কিংসের শিরোপা উৎসবে। চ্যালেঞ্জ কাপে মর্যাদার ম্যাচে ১০ জন নিয়েও তারা মোহামেডানকে হারায় ৪-১ ব্যবধানে। গত মৌসুমে যুক্ত হওয়া এই আসরের রোল অব অনার থাকল অপরিবর্তিত।

গতবার শিরোপা লড়াইটা হয়েছিল বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায়। সেবার লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ঘরের মাঠে ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ পায় বসুন্ধরা। এবার সে সুযোগটা মোহামেডান নিয়েছে ঠিক, তবে ঘরের মাঠের বাড়তি সুবিধা কাজে লাগাতে পারেনি তারা। তাই তো বসুন্ধরাকে টানা দুই ম্যাচে হারানোর পর লজ্জার হারের তেতো স্বাদ পেতে হয়েছে সাদা-কালোদের।

অথচ ৩০ মিনিটের বেশি সময় বসুন্ধরাকে খেলতে হয়েছে ১০ জন নিয়ে। ম্যাচের ৬৩ মিনিটে অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার সোহেল রানা দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। তবে তার বিদায়ের পর যেন আরও সুসংহত হয়েছে বসুন্ধরা। তার বিদায়ের সময়ে ম্যাচে ছিল ১-১ সমতা। সোহেল যাওয়ার পর বসুন্ধরা আরও তিন গোল করেছে। দলটির হয়ে জোড়া গোল করেছেন এক মৌসুম বাদে ফেরা ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার ডরিয়েলটন গোমেজ। এছাড়া আবাহনী থেকে আসা ব্রাজিলিয়ান রাফায়েল আগুস্তো ও মোহামেডানকে লিগ জয়ে বড় ভূমিকা রাখা নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড ইমান্যুয়েল সানডে করেন একটি করে গোল। পেনাল্টি থেকে মোহামেডানের একমাত্র গোলটি করেন উজবেক প্লে-মেকার মোজাফফরভ।

মাঠ প্রস্তুত করতে দেরি হওয়ায় ১১ মিনিট পিছিয়ে শুরু হয় খেলা। চতুর্থ মিনিটে স্যামুয়েল বোয়েটাংকে বক্সের ঠিক বাইরে ফেলে দিয়েছিলেন তারিক কাজী। তবে মোজাফফরভের ফ্রি-কিক মানব দেয়ালে বাধা পায়।

সপ্তম মিনিটে বক্সের ভেতরে ডরিয়েলটনকে পেছন থেকে ফেলে দেন মোহামেডান কিপার মেহেদী হাসান মিঠু। পেনাল্টি থেকে ডরিয়েলটন এগিয়ে নেন বসুন্ধরা কিংসকে। ৭ মিনিট পর মোহামেডান ম্যাচে ফিরেছে পেনাল্টি সুযোগ কাজে লাগিয়ে। থ্রো-ইন থেকে বল আদায়ের লড়াইয়ে বসুন্ধরা ডিফেন্ডার তারিক কাজী ঘানাইয়ান ডিফেন্ডার এলি কেকে ইমান্যুয়েলকে বক্সের ভেতর ফেলে দিলে পেনাল্টি বাঁশি বাজান রেফারি সায়মন হাসান। মোজাফফরভ সহজেই ধরাশায়ী করেন বসুন্ধরা কিপার মেহেদী হাসান শ্রাবণকে।

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন ডরিয়েলটন। ডান দিক দিয়ে দ্রুত আক্রমণে উঠে কাটব্যাক দিয়েছিলেন রাফায়েল। ফাহিম ডামি করে বল ছাড়লে তা ভালো জায়গা পেয়েও গোল করতে পারেননি ডরিয়েলটন। তার শট সোজাসুজি যায় মোহামেডান কিপার সুজন হোসেনের কাছে। দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় বল আয়ত্তে নেন তিনি।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুটা ম্যাড়ম্যাড়ে ছিল। তবে ৬৩ মিনিটে ঘটে লালকার্ডের ঘটনা। মোহামেডানের বদলি মিডফিল্ডার মিনহাজুর আবেদীনকে জোড়া পায়ের ফাউল করে লাল কার্ড (দ্বিতীয় হলুদ কার্ড) দেখতে হয় সোহেল রানাকে। ৬৭ মিনিটে ডান দিক থেকে ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের ক্রসে হেড করেন ডরিয়েলটন। তবে তা আয়ত্তে নিতে সমস্যা হয়নি মোহামেডান কিপার সুজন হোসেনের। ম্যাচের ৭২ মিনিটে রাফায়েল আগুস্তো অসাধারণ গোলে এগিয়ে নেন ১০ জনের বসুন্ধরাকে। বদলি সোহেল রানার কর্নার মোহামেডানের এক ডিফেন্ডার ক্লিয়ার করেছিলেন। বক্সের বাইরে পাওয়া চলন্ত বল রাফায়েল বাঁ পায়ের ভলিতে জালে পৌঁছে দেন। তিন মিনিট পর ৩-০ করেন ইমানুয়েল সানডে। ডান দিক থেকে রাকিবের ক্রস অনেকটা দৌড়ে আয়ত্তে নিয়ে ডরিয়েলটন মার্কারকে পরাস্ত করে আড়াআড়ি পাস দেন আনমার্কড সানডেকে। কোনাকুনি শটে পুরনো ক্লাবের দুর্ভোগ বাড়ান নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড। ম্যাচের ৮৬ মিনিটে ডরিয়েলটন দ্বিতীয় গোলের দেখা পান। সানডের আড়াআড়ি পাস ধরে মার্কারকে পরাস্ত করে ঠান্ডা মাথায় সুজনকে বোকা বানান ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। ঘরের মাঠে মোহামেডানের অসহায় রূপ দেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মোহামেডান সমর্থকরা। তার বহিঃপ্রকাশ তারা ঘটান মাঠে পানির বোতল ও স্মোক ফ্লেয়ার ছুড়ে মেরে। তাতে ম্যাচ ৫ মিনিট বন্ধ থাকে। এরপর খেলা শুরু হলেও কোনো দল গোল পায়নি।

পুরো ম্যাচ অগোছালো ফুটবলে মোহামেডান কেবল বিরক্তিই বাড়িয়েছে। তাই গত মৌসুমের লিগজয়ীদের শুরুটা হলো বড্ড বাজে। আর ধর্মসাগর পাড়ে তাদের মাঠে শিরোপা উৎসবে মেতে বসুন্ধরার শ্রেষ্ঠত্ব ফেরানোর মিশনটা শুরু হলো সত্যিকারে কিংসের মতো।