বিচার বিভাগের জন্য প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ ঘোষিত রোডম্যাপ ঘোষণার বছরপূর্তি হচ্ছে আগামীকাল রবিবার। গত বছরের ১১ আগস্ট দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ইনার গার্ডেনে সারা দেশের অধস্তন আদালতের বিচারকদের উদ্দেশ্যে অভিভাষণ দেন প্রধান বিচারপতি। দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষতা আনয়ন করে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রয়াস হিসেবে বিচারকদের উদ্দেশ্যে ওইদিন গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন তিনি। একই সঙ্গে বিচারকদের সমস্যার কথাও শোনেন প্রধান বিচারপতি। ওই দিন তার রোডম্যাপে প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের অর্থপূর্ণ সংস্কার নিশ্চিতে বিভিন্ন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার রূপরেখা ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
আজ শনিবার সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বিগত এক বছরে প্রধান বিচারপতি ঘোষিত রোডম্যাপ বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরে প্রধান বিচারপতি কর্তৃক বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ প্রণয়ন
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের উদ্যোগে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এ লক্ষ্যে প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে যে সকল প্রক্রিয়া অনুসৃত হয় তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ এর খসড়া প্রস্তুত করে গত বছরের ২৮ অক্টোবর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে উপদেষ্টা পরিষদে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এর খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন হয় এবং গত ২১ জানুয়ারি অধ্যাদেশটি পাশ হয়। ইতোমধ্যে এই অধ্যাদেশের আওতায় প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে ‘সুপ্রিম জুডিসিয়াল অ্যাপোয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়
বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্রীকরণ নিশ্চিতকরণে প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে গক বছরের ২৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট থেকে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠন সংক্রান্ত প্রস্তাব আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রস্তাবে সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ যথাযথরূপে পালনের উদ্দেশ্যে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি অধ্যাদেশের খসড়া, প্রস্তাবিত সচিবালয়ের অর্গানোগ্রাম এবং রুলস অব বিসনেস ও অ্যালোকেশন অব বিসনেস’র সম্ভাব্য সংস্কার সম্পর্কে পরিপূর্ণ প্রস্তাব পাঠানো হয়।
সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া সংবিধানের ৪র্থ তফসিলের অন্তর্গত ‘অন্তবর্তীকালীন ও সাময়িক বিধানাবলী’র দফা ৬ (৬) অনুযায়ী অধস্তন আদালত সম্পর্কিত সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগের ২য় পরিচ্ছেদের বিধানগুলো শিগগির বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আলোকে সুপ্রিম কোর্ট পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা, ছুটি ইত্যাদি বিষয়ে প্রচলিত দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটবে এবং বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে।
বিচার সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা আনতে ১২ নির্দেশনা
বিচার বিভাগ হতে সকল প্রকার দুর্নীতি বিলোপের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীর জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক বিচারসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিতে প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের সেবার মানোন্নয়নে প্রধান বিচারপতি গত ১৮ সেপ্টেম্বর ১২ দফা নির্দেশনা দেন। এই ১২ দফা যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে মরিটরিং সভা নিয়মিত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজ নিজ দপ্তর কর্তৃক সেবা সহজিকরণে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রধান বিচারপতিতে প্রতিবেদন দিয়ে থাকেন।
পেপার ফ্রি বেঞ্চ চালু
গত ২ জানুয়ারি থেকে হাইকোর্ট বিভাগের কোম্পানি সংক্রান্ত একটি বেঞ্চে সম্পূর্ণ কাগজমুক্ত (পেপার ফ্রি) বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব তত্ত্বাবধায়ন ও উদ্ভাবনে বেঞ্চের সকল কাগজাদি অনলাইনে জমা পদ্রানের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম প্রস্তুত করা হয়েছে। পরবর্তীতে হাইকোর্টের আরও একটি বেঞ্চে পেপার ফ্রি কার্যক্রম শুরু হয়।
লিগ্যাল এইড প্রদানে ক্যাপাসিটি টেস্ট চালু
গত ২৫ আগস্ট প্রধান বিচারপতির নির্দেশক্রমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত আদালতে উপস্থিত সকল আসামিদের আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা আবশ্যক বিধায় আদালতে উপস্থিত আসামিদের কেউ যেন আইনগত সহায়তা বঞ্চিত না থাকেন তা নিশ্চিত করতে অধস্তন আদালত/ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আসামীর পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকলে আসামির জন্য লিগ্যাল এইডের আইনজীবী প্যানেল থেকে আইনজীবী নিয়োগ করতে হবে।
জুডিসিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ
বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতে প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা প্রণয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। এর প্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস (সার্ভিস গঠন, সার্ভিস পদে নিয়োগ এবং সাময়িক বরখাস্তকরণ, বরখাস্তকরণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৭ রহিত করে বিগত ২৮ জুলাই বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা, ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়।
দেওয়ানি ও ফৌজদারি পৃথক আদালত চালু
প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে পৃথক এখতিয়ার প্রয়োগের সুবিধার্থে এবং মামলা জট নিরসনের নিমিত্তে বিচার বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করে পৃথক আদালত স্থাপন ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক পদ সৃজন করার প্রয়োজনীয়তা থেকে পৃথক দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে দেশের প্রতিটি জেলায় পৃথক দায়রা বিভাগ পুনর্গঠন করা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
প্রধান বিচারপতি ফেলোশিপ চালুকরণ
প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিচার বিভাগে মেধার বিকাশসহ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাগণের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রধান বিচারপতি ফেলোশীপ চালু করার ঘোষণা দেন। তারই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রধান বিচারপতি ফেলোশীপ নীতিমালার একটি খসড়া প্রস্তত করে গত ২০ ফেব্রুয়ারি আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
অধস্তন আদালতের বিচারকগণের সংখ্যা বৃদ্ধি
দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিসহ বিচার সেবায় বিচারপ্রার্থী জনগণের অভিগম্যতা বৃদ্ধিতে প্রধান বিচারপতি অধস্তন আদালতের বিচারকগণের সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাধায়নে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা ২০২৫ এর অধীনে গঠিত সার্ভিসের বিচারিক পদ সৃজনে গঠিত কমিটি এ বিষয়ে ইতোমধ্যে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত ২ সেপ্টেম্বর সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ইতোমধ্যে জেলা ও দায়রা জজ পর্যায়ে ১৯১টি পদসহ মোট ২৩২টি পদ সৃজন করা হয়েছে।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্গঠন
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর কারণে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ কর্তৃক ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হলেও এ সংক্রান্ত রিভিউ দরখাস্তটি ছিল অনিষ্পন্ন। গত বছরের ২০ অক্টোবর আপিল বিভাগ কর্তৃক রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি হলে বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল পুনরুজ্জীবিত হয়। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্য বিশিষ্ট সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে।
বদলি ও পদায়ন নীতিমালা
প্রধান বিচারপতি ঘোষিত বিচার বিভাগ সংস্কারের রোডম্যাপে অধস্তন আদালতের বিচারকগণের বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত বৈষম্য দূর করতে নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে। এর ধারাবাহিকতায়, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত একটি নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করে বদলি ও পদায়ন নীতিমালাটি বাস্তবায়নের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট হেল্পলাইন
গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টে আগত বিচারপ্রার্থী বা সেবাগ্রহীতা সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কোনো শাখায় সেবা গ্রহণে কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হলে বা সেবা গ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো অসুবিধার মুখোমুখি হলে সেবাগ্রহীতাকে সহায়তা করার নিমিত্তে একটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়। সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত প্রতি রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত হেল্পলাইন সার্ভিস হতে সেবা গ্রহণ করা যায়। একইসাথে হেল্পলাইন নাম্বারে হোয়াটসঅয়াপ ও মোবাইল অ্যাপ সার্ভিস চালু রয়েছে। এই হেল্পলাইনে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশ থেকে আইনি পরামর্শ, মামলা সম্পর্কিত তথ্য ও অভিযোগ দাখিল-সংক্রান্ত ৩ হাজার ৭২টি কল এসেছে। এ ছাড়া জেলা ও মহানগর পর্যায়ে এরুপ হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে।
সচেতনতামূলক কার্যক্রম
বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা কি এবং সেই প্রত্যাশা পূরণে বিচার বিভাগের কি করণীয় সে সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের উদ্দেশ্যে চলতি বছর প্রধান বিচারপতি দেশের সকল বিভাগীয় শহরে ইউএনডিপির সহায়তায় জুডিশিয়াল ইন্ডিপেনডেন্স অ্যান্ড ইফিসিয়েন্সি রিজিওনাল কনফারেন্সের আয়োজন করেন। এতে বিচারক, আইনজীবী, উন্নয়ন সহযোগীসহ নানা অংশীজনগণ অংশগ্রহণ করেন। প্রধান বিচারপতি ঘোষিত রোডম্যাপ’র বাস্তবায়নের বাস্তব রূপরেখা তৈরির মূল ভিত্তি হিসেবে স্টেকহোল্ডার মিটিংগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এ ছাড়া গত ৩ মার্চ রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে ‘আপহোল্ডিং এনভাইরনমেন্টাল জাস্টিস: দ্য রুল অব জাজ’স ফর এ সাসটেইনেবল ফিউচার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল হাইকোর্ট অব ব্রাজিলের প্রধান বিচারপতি বিচারপতি অ্যান্তোনিও হারম্যান বেনজামিন। এ ছাড়া গত ২২ জুন রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে ‘জুডিশিয়াল ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যান্ড ইফিসিয়েন্স ইন বাংলাদেশ শীর্ষক একটি জাতীয় সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইন ও বিচার উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
বিচারিক কূটনীতি ও বিচারব্যবস্থার আন্তর্জাতিকীকরণ
প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের বিচারব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক বিচার ব্যবস্থা হিসেবে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন প্রধান বিচারপতি। এক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী যেমন, ইউএনডিপি, কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট, জিআইজেড, ইউনিসেফ, ওএইচসিএইচআর, ইউএনএইচসিআর, জেআইসিএ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর সাথে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সভা, সেমিনার করেছেন এবং প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। বিদেশি এই সকল উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় প্রধান বিচারপতির পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া প্রধান বিচারপতি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, পোল্যান্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে বিভিন্ন সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। এছাড়া প্রধান বিচারপতি দেশের বাইরে বেশকিছু আন্তর্জাতিক সেমিনারে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
জুডিসিয়াল সার্ভিস পে- কমিশন পুনর্গঠন
প্রধান বিচারপতি তার রোডম্যাপ ভাষণে বিচারকগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। এর ধারাবাহিকতায় প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং এ লক্ষ্যে তিনি বিগত ৬ আগস্ট আপীল বিভাগের বিচারপতি এস এম এমদাদুল হককে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এর সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন প্রদান করেন। এছাড়া, প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে বিগত ১৩ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট থেকে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ৩০ শতাংশ বিচারিক ভাতা বিদ্যমান পে-স্কেপ হতে প্রদান সংক্রান্ত একটি পত্র আইন, বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, যা বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিচারকদের সুদমুক্ত গাড়ি নগদায়ন
সরকারের অন্যান্য কর্মবিভাগের কর্মকর্তাদের অনুরূপ বিচারকদের সুদমুক্ত গাড়ি নগদায়ন সুবিধা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন প্রধান বিচারপতি এবং এ লক্ষ্যে গত বছরের ১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হয়। এরই প্রেক্ষিতে ১২ ডিসেম্বর বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অনুকুলে সুদমুক্ত গাড়ি নগদায়ন সুবিধা প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণীত হয়।
আদালত প্রাঙ্গণসহ বিচারকগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
সারা দেশে অবস্থিত আদালতসমূহের প্রাঙ্গণসহ আদালতে কর্মরত বিচারকগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রধান বিচারপতি বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। গত বছরের ২৮ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক এ লক্ষ্যে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। এ ছাড়া আদালত ও আদালতে কর্মরত বিচারকগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের নির্দেশনা প্রদান করে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে নির্দেশনা জারি করা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংস্কার
গত ৭ জানুয়ারি সংস্কারকৃত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল ভবন ও এজলাস কক্ষের উদ্বোধন করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এ সময় তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন যে ২০২৪ এর জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনয়ন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের শ্বাশ্বত নীতিসমূহের অনুসরণের মাধ্যমে তা নতুন মাত্রায় পূর্ণতা পাবে।
চৌকি আদালতগুলোতে কম্পিউটার প্রদান
প্রধান বিচারপতি দেশের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত চৌকি আদালতগুলোতে আগত বিচারপ্রার্থীদের কাঙ্খিত বিচার সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণসহ উক্ত চৌকি আদালতসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আদালতের অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রয়োজনীয় ডেস্কটপ কম্পিউটার সরবরাহের জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। এই নির্দেশনার আলোকে গত ২ জুলাই দেশের ৪০ টি চৌকি আদালতের এজলাস ও দপ্তরে ব্যবহারের জন্য মোট ৭১ টি ডেস্কটপ কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া দেশের আদালতগুলোতে বিচার কার্যে গতিশীলতা আনতে প্রধান বিচারপতির নির্দেশনার আলোকে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে জেলা আদালতগুলোতে এখন পর্যন্ত মোট ৪০০ টি ডেস্কটপ কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া এই সময়ে দেশের ১২০ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক ল্যাপটপ কম্পিউটার প্রদান করা হয়েছে।