বগুড়ায় চলতি আমন ও রবি শস্য উৎপাদনের ভরা মৌসুমে সারের সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রান্তিক পর্যায়ের চাষীরা। এদিকে বিসিআইসি ও বিএডিসি সুত্র বলছে, চলতি সেপেম্বর মাসে চাহিদার সমপরিমাণ বরাদ্দ রয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ ডিলারদের সিন্ডিকেট ও কৃষি অফিসের গাফিলতি রয়েছে। এদিকে কৃষি অফিস, বিএডিসি ও বিসিআইসি বলছে চলতি আমন ও রবি মৌসুমে পর্যাপ্ত পরিমানে সার রয়েছে। সারের কোন সংকট হবে না। এছাড়া কিছু কৃষক আগামী বোরো চাষের জন্য আগেভাগেই সার মজুদ করেন। এজন্য চলতি মৌসুমে সারের সংকট দেখা দিয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত বিএডিসি ও বিসিআইসি দুটি প্রতিষ্ঠানে সারের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া সার রয়েছে ৯৩ হাজার ৯৩৪ মেট্রিক টন, টিএসপি ২৫ হাজার ৮৭ মেট্রিক টন, ডিএপি ৪৫ হাজার ৮৪৬ মেট্রিক টন ও এমওপি ৩৬ হাজার ৪১৮ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে ৭ হাজার ৮৯৩ মেট্রিক টন, টিএসপি ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন, ডিএপি ২ হাজার ৫৩ মেট্রিক টন ও এমওপি ২ হাজার ৬৭৪ মেট্রিক টন। বর্তমান মজুদ রয়েছে ৪ হাজার ৩৫৮ মেট্রিক টন সার।
কৃষি কর্মকর্তারা আরও বলছেন, ডিলারদের মাধ্যমে সার কৃষকদের মাঝে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগ থেকে মাঠ পর্যায়ে সার্বক্ষনিক মনিটরিং করা হচ্ছে। সারের কোন সংকট নেই। কোন অনিয়মের অভিযোগ পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে ইউরিয়া সার প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ১৩৫০ টাকা, টিএসপি প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ১৩৫০ টাকা, এমওপি প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ১০০০ টাকা ও ডিএপি প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ১০৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদি কোন অসাধু ব্যবসায়ী সারের ন্যায্য বন্টন না করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তাহলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি বিভাগ সুত্রে জানা যায়, চলতি বছর বগুড়ায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপণ করা হয়েছে। এরমধ্যে রোপণ কাজ প্রায় ৮৪ শতাংশ শেষ হয়েছে। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন। প্রতি হেক্টর ধান উপরোক্ত লক্ষ্যমাত্রায় ৩ দশমিক ২৬ মেট্রিক টন ধান ফলন ধর ধরা হয়েছে। গত বছর জেলায় সমপরিমাণ আমন ধানের চাষ করা হয়েছিল।
এদিকে চলতি মৌসুমে সরকার অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। সরকার ইউরিয়া ও টিএসপি প্রতি কেজি ২৭ টাকা, এমওপি ২০ টাকা এবং ডিএপি ২১ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু এই মূল্য শুধুই কাগজ-কলমে। বাজারে এর চিত্র ভিন্ন। খুচরা বিক্রেতারা সার সংকট দেখিয়ে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের ও চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করছেন।
এদিকে এই সারগুলো বগুড়া শেরপুর উপজেলায় বিক্রি হচ্ছে ইউরিয়া ও টিএসপি প্রতি কেজি ৪০ টাকা, এমওপি ৩০ টাকা এবং ডিএপি ২৫ টাকা; জেলার কাহালু উপজেলায় ইউরিয়া ও টিএসপি প্রতি কেজি ৩৬ টাকা, এমওপি ২৪ টাকা এবং ডিএপি ২৫ টাকা এবং শিবগঞ্জ উপজেলায় ইউরিয়া ও টিএসপি প্রতি কেজি ৩৭ টাকা, এমওপি ২৩ টাকা এবং ডিএপি ২৪ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একই চিত্র জেলার অন্যান্য উপজেলায়।
বগুড়া বিএডিসি সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সেপ্টেম্বর মাসে টিএসপি ১ হাজার ৯২ টন, এমওপি ২ হাজার ৬৭৪ টন, ডিএপি ২ হাজার ৫৩ টন বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বর্তমানে গোডাউনে টিএসপি ১৩ হাজার ১৬০টন, এমওপি ২০ হাজার ৪৬টন, ডিএপি ২০ হাজার ৯০৭টনসহ মোট ৫৪ হাজার ১৮৪টন সার মজুদ রয়েছে। কৃসি অফিসের চাহিদা অনুযায়ী ডিলারদের কাছে সার সরবরাহ করা হচ্ছে। বগুড়ায় সারের কোন সংকট নেই।
বগুড়া বাফার (বিসিআইসি) ইনচার্জ মো. মোস্তফা কামাল জানান, বগুড়া জেলায় চলতি মাসে ৭ হাজার ৮৯৩ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। জেলায় ১৬৩ জন ডিলার রয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী ডিলারদের নিকট সার সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে গত বছরের চেয়ে এবার বরাদ্দ কম। সারাদেশে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন সার কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, গোডাউন থেকে ডেলিভারি দেওয়ার পর উপজেলা কৃষি অফিস ও উপজেলা প্রশাসন মনিটরিং করে থাকেন মাঠ পর্যায়ে।
বগুড়া কাহালু উপজেলার মুরইল গ্রামের কৃষক নুরল ইসলাম, আমিনুর রহমান, নবাব আলী জানান, চাহিদা মাফিক সার কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দামে এসব সার কিনতে হচ্ছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার ভায়ের পুকুর এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম, মোকামতলা এলাকার কৃষক গাজীউর রহমান, সদরের শেখেরকোলা এলাকার কৃষক ডালিম উদ্দিন জানান, এবার সার সংগ্রহ করতে কষ্ট হচ্ছে। বেশি দাম দিয়েও টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার পাওয়া যাচ্ছেনা।
শিবগঞ্জে ভায়েরপুকুর এলাকার নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক খুচরা সার বিক্রেতা বলেন, ডিলাররা সার দিয়েছে। কিন্তু এখন বিক্রি করতে নিষেধ করেছে। আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে বলেছে। তারপর সার বিক্রি হবে।
বগুড়া সার ডিলাররা বলছেন ভিন্নকথা। সার ডিলারদের বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী সার পেতে দেরি হচ্ছে, তাই কৃষকদের সার পেতে দেরি হচ্ছে।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দিন ফিরোজ জানান, জেলায় চাহিদা অনুযায়ী সারের বরাদ্দ রয়েছে। কৃষকদের মাঝে চাইলে অনুযায়ী সার পৌঁছানোর কথা। বাজার সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, গতবারের পরিমাণ এবারও জেলায় আমন ধানের চাষ হচ্ছে। প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।