অস্কার যাচ্ছে কোন সিনেমা

বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ড তথা অস্কার। বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রতিযোগিতার ‘বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র’ বিভাগের জন্য একটি করে সিনেমা বাছাই করে অস্কারে পাঠায় অস্কার বাংলাদেশ কমিটি। প্রায়ই দেখা গেছে মাত্র একটি চলচ্চিত্রই জমা পড়ে কমিটিতে। সেটিকেই পাঠানো হয় অস্কারে। তবে এবারের চিত্রটা অনেকটা ভিন্ন। আসন্ন অস্কারের ৯৮তম আসরের জন্য জমা পড়েছে দেশের পাঁচটি সিনেমা। এগুলো হলো ‘নকশিকাঁথার জমিন’, ‘সাবা’, ‘প্রিয় মালতী’, ‘বাড়ির নাম শাহানা’ এবং ‘ময়না’। সব চলচ্চিত্রই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত হয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি সিনেমাই মূলত নারীকেন্দ্রিক। এগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি সিনেমা স্থান পাবে অস্কারে। 

শুরুতেই আসা যাক জয়া আহসানের ‘নকশিকাঁথার জমিন’ প্রসঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন আকরাম খান। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের গল্প ‘বিধবাদের কথা’ অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটিতে মূলত একাত্তরে প্রান্তিক দুই নারীর সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। এ সিনেমায় সংলাপ খুবই কম, নীরবতার ভেতর দিয়েই যাতনা থেকে দ্রোহ, বিপরীত বহু ভাবকে পর্দায় বাক্সময় করে তুলেছেন পরিচালক আকরাম খান। নকশিকাঁথার জমিন সিনেমায় আলাদা করে নজর কেড়েছে রাহেলা। চরিত্রটিকে প্রাণ দিয়েছেন অভিনেত্রী জয়া আহসান। মুখে কোনো কথা নেই, চোখের ভাষাতেই বহু কথা বলেছেন তিনি। জয়া বলেন, ‘চরিত্রটার চোখের পাতা খুব একটা পড়ে না। দুঃখ ভারাক্রান্ত থাকে, চরিত্রটাই সেভাবে নির্মাণ করা হয়েছে।’ রাহেলার বোন সালেহা চরিত্রে অভিনয় করেছেন সেঁওতি। দুই ভাইয়ের চরিত্রে ইরেশ যাকের ও রওনক হাসানকে দেখা যাবে। গুরুত্বপূর্ণ দুই চরিত্রে আছেন দুই ভাই দিব্য জ্যোতি ও সৌম্য জ্যোতি। 

ছোটপর্দার শীর্ষ মডেল-অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সাবা’ কয়েক দিন পরই মুক্তি পাচ্ছে দেশের মাটিতে। তবে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে সুনামের সঙ্গে প্রদর্শিত হয়েছে ছবিটি। এতে আরও দুটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন রোকেয়া প্রাচী ও মোস্তফা মনোয়ার। ৯০ মিনিট দৈর্ঘ্যরে ‘সাবা’ সিনেমার গল্প মূলত মা ও মেয়েকে কেন্দ্র করে। গল্পে দেখা যাবে, শহরের মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের সন্তান সাবা। যার বাবা গত হয়েছেন। মা শিরিন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। হুইলচেয়ার ছাড়া চলতে পারেন না। বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন মেয়ে সাবা। পরিবার আর মায়ের সেবায় নিজের ক্যারিয়ার গুছিয়ে উঠতে পারেনি সাবা। অর্থের টানাটানিতে দিনরাত এক করে মাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা তার। হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয় সাবার মা শিরিনের। চিকিৎসক জানান, অপারেশন করতে হবে। দিশেহারা সাবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। কীভাবে বাঁচাবে মাকে? মাকসুদ হোসেনের প্রথম পরিচালনার পূর্ণদৈর্ঘ্য এই চলচ্চিত্রটি গত বছর টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়। পরে বুসান, রেড সি, গ্যোটেবর্গ, সিডনি, রেইনড্যান্সসহ বহু মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। 

শঙ্খ দাসগুপ্ত পরিচালিত ‘প্রিয় মালতী’ চলচ্চিত্রটিতেও নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মেহজাবীন চৌধুরী। ‘প্রিয় মালতী’ আগে মুক্তি পেলেও মেহজাবীনের প্রথম অভিনীত সিনেমা কিন্তু ‘সাবা’। এখানে মেহজাবীন অভিনয় করেছেন একজন সংগ্রামী নারীর চরিত্রে। গল্পে দেখা যায়, পলাশ আর মালতীর ছোট্ট ছিমছাম সংসার। পলাশ একটি দোকানের সাধারণ কর্মচারী। মালতী অন্তঃসত্ত্বা। বিবাহবার্ষিকীতে দুজন মিলে নৌকায় ঘুরতে বের হয়। কেক কাটে, ঘোরাঘুরি করে। আর দশটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মতো সুখে সংসার করার স্বপ্ন দেখে তারা। তাদের এই সাজানো সংসার হঠাৎ ওলট-পালট হয়ে যায়। অন্যান্য দিনের মতো পলাশ দোকানে যায়। কিছুক্ষণ পর মালতী টিভিতে দেখে, পলাশের দোকান যে ভবনে, তাতে আগুন লেগেছে। পলাশকে পাওয়া যায় না। নিমেষে তা বদলে দেয় তার জীবনের মোড়। সত্য ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত সিনেমা ‘প্রিয় মালতী’ এরই মধ্যে প্রদর্শিত হয়েছে কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়ায়। এ ছাড়া ২৩তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ প্যানোরামা সেকশনে সেরা সিনেমার পুরস্কার পেয়েছে। সিনেমাটি প্রযোজনা করেছে ফ্রেম পার সেকেন্ড ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি। 

লীসা গাজী পরিচালিত সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ‘বাড়ির নাম শাহানা’ চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় দীপার চরিত্রে অভিনয় করেছেন আনান সিদ্দিকা। নব্বইয়ের দশকের প্রেক্ষাপটে এক নারীর বাঁচার লড়াই নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। ২০২৩ সালে জিও মামি মুম্বাই চলচ্চিত্র উৎসবে ‘জেন্ডার সেনসিটিভিটি অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে বাড়ির নাম শাহানা। লন্ডন, শিকাগো, মেলবোর্ন, রোমের চলচ্চিত্র উৎসবেও সিনেমাটি পুরস্কার জিতেছে। বাংলাদেশে ছবিটি পরিবেশন করছে গুপী বাঘা প্রোডাকশনস লিমিটেড। বাংলাদেশের পাশাপাশি আগামী অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, মেলবোর্ন ও অ্যাডিলেডেও সিনেমাটি মুক্তি পাবে। সিনেমাটিতে আরও আছেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, লুৎফর রহমান জর্জ, ইরেশ যাকের, কাজী রুমা, কামরুন্নাহার মুন্নী প্রমুখ। চিত্রগ্রহণ করেছেন যোহায়ের মুসাভভির। সংগীত পরিচালনায় রয়েছেন সোহিনী আলম। 

আরেক সিনেমা ‘ময়না’-তেও উঠে এসেছে একটি নারীর গল্প। মঞ্জুরুল ইসলাম মেঘ পরিচালিত ‘ময়না’-তে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তরুণ অভিনেত্রী রাজ রিপার। আরও কয়েকটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোমেনা চৌধুরী, সুব্রত, সুচনা, নাদের চৌধুরীসহ অনেকে। ইউরোপের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব গলফ অব নেপলস ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে মনোনয়ন পায় ছবিটি। বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রান্তিক পর্যায়ের মধ্যবিত্ত পরিবারের উচ্চাভিলাষী একটি মেয়ের বেড়ে ওঠা এবং সাংসারিক জীবনের কঠিন বাস্তবতায়, শহরের সংগ্রামী দিনগুলো ফুটে উঠেছে ময়না চলচ্চিত্রে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরেই বাংলাদেশের সিনেমা হলে মুক্তি পাবে ময়না।