বোর্হেস একাই প্রথার খাঁচা থেকে শত শত পাখি মুক্ত করেছেন

বাঙালি কবি এবং হোর্হে লুইস বোর্হেসের অনুবাদক, রাজু আলাউদ্দিন, ‘ফের্বোর দে বুয়েনোস আইরেস’ এর শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলির দিনগুলোতে বইমেলায় অংশগ্রহণ করেন এবং বক্তৃতায় তার দেশ, বাংলাদেশে ফুটবলের আবেগের কথা তুলে ধরে বলেন কীভাবে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে জাতীয় দলের খেলা দেখার জন্য বাংলাদেশের সমর্থকরা অপেক্ষায় থাকে। এই আবেগই তাকে ‘Ficcciones’-এর লেখক সম্পর্কে পাঁচটি বই অনুবাদ করতে অনুপ্রাণিত করেছে : ‘আর্হেন্তিনা সাধারণত ফুটবলের জন্য, মেসি এবং ম্যারাডোনার জন্য পরিচিত এবং চে গুয়েবারার জন্যও বিশ্বখ্যাত, কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের ক্ষেত্রে আরও একজন সমানভাবে বিখ্যাত আর্হেন্তিনো ব্যক্তিত্ব আছেন, তিনি হলেন আমাদের বোর্হেস।’ রাজু আলাউদ্দিন একজন কবি, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক। তিনি ১৯৬৫ সালের ৬ মে শরীয়তপুরে জন্মগ্রহণ করেন, সেই সময় বাংলাদেশ ছিল একটি যুদ্ধপীড়িত ও দুর্ভিক্ষকবলিত এলাকা। তিনি Telam পত্রিকাকে জানান যে, তার দেশ এক সময় ভারতের অংশ ছিল, এবং ১৯৪৭ সালে ভাষাগত ভিত্তিতে নয় বরং ধর্মীয় ভিত্তিতে দেশটি বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং পূর্ব অংশ (বর্তমান বাংলাদেশ) পূর্ব বাংলা হিসেবে পাকিস্তানে যোগ দেয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীদের নেতা কিন্তু তাকে ক্ষমতা গ্রহণে বাধা দেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় জনগণের চরম অসন্তোষ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তারপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ এবং তা নয় মাসব্যাপী স্থায়ী হয়।

‘বোর্হেস : ফের্বোর দে বুয়েনস আইরেস’ সম্মেলনের অংশ হিসেবে আগামীকাল বইমেলায় দুটি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন আলাউদ্দিন। আর্জেন্টাইন লেখক বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে পঠিত হওয়ার ব্যাপারে তার ভূমিকা রয়েছে। তিনি বোর্হেস সম্পর্কিত পাঁচটি খণ্ড সম্পাদনা করেছেন, সেগুলো হচ্ছে ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘নির্বাচিত গল্প’, ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’, ‘নির্বাচিত সাক্ষাৎকার’ এবং বোর্হেস সম্পর্কে বিভিন্ন লেখকদের রচনা নিয়ে পঞ্চম খণ্ড ‘প্রসঙ্গ বোর্হেস’। ভাষার সঙ্গে তার সম্পর্ক কেবল একাডেমিক নয় বরং তিনি একজন মেক্সিকান নারীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং তার একটি ছেলে এবং মেয়ে রয়েছে, যারা অবশ্যই স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে।

‘দ্য আলেফ’-এর লেখকের সাহিত্যকর্মকে অনুবাদকের কাছের বলে মনে হয়, কারণ আর্জেন্টাইন ছোটগল্পকার তার গল্পগুলোতে ভারত, বঙ্গোপসাগর, বিখ্যাত বেঙ্গল টাইগারসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও অনেক কিছুর উল্লেখ করেছেন। তিনি স্মরণ করেন যে, বোর্হেস বলেছিলেন অনুবাদে মূল লেখার সঙ্গে আরও নতুন অর্থ যোগ হয়, অনুবাদ মানে হারানো নয়, বরং এই ধারণার বিপরীত। আলাউদ্দিন ব্যাখ্যা করেন যে, এটি মূল লেখাকে সমৃদ্ধ করে এবং উপসংহারে বলেন যে, অনুবাদ হলো হারানোর মাধ্যমে অর্জনের এক শিল্প। 

তার শিক্ষাজীবন এবং বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। অনুবাদক, সাংবাদিক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, কিন্তু এক দশক মেক্সিকোতে থাকার সময় ভিন্নপেশা গ্রহণ করেন। তিনি ইংরেজি এবং স্প্যানিশ উভয় ভাষাতে থেকেই ৫০টিরও বেশি বই অনুবাদ করেছেন। তার অনূদিত লেখকদের মধ্যে রয়েছেন গেয়র্গ ট্রাকল, কনস্টানটাইন কাভাফি এবং টেড হিউস। তিনি সম্প্রতি লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর একটি গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, যার দ্বিতীয় খণ্ড আসছে খুব শিগগিরই। রাজু আলাউদ্দিন, বিদেশি সাহিত্যের ওপর লেখার পাশাপাশি মূল স্প্যানিশ থেকে বাংলায় অনুবাদের জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। তার কবিতা এবং প্রবন্ধগুলো ইংরেজি, সুইডিশ, ইতালীয় এবং স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার ‘Secretamente he Dibujando el Mapa del DeseoÕ ’ (আকাক্সক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি) বইটি স্প্যানিশ ভাষায় পাওয়া যায়।

তেলাম : আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় সংস্কৃতির জন্য যে আবেগ, অন্তত ফুটবলের ক্ষেত্রে যেটা দেখা যায়, আর্জেন্টিনার সাহিত্যের প্রতিও কি তা রয়েছে?

রাজু আলাউদ্দিন : নিঃসন্দেহে, ফুটবলের জন্য আর্জেন্টিনার বৈশ্বিক খ্যাতি রয়েছে; মেসি, ম্যারাডোনার জন্য এবং চে গুয়েবারার জন্যও আর্জেন্টিনা বিশ্বখ্যাত। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের ক্ষেত্রে, আরও একজন সমানভাবে বিখ্যাত আর্জেন্টাইন ব্যক্তিত্ব আছেন, তিনি আমাদের বোর্হেস। বিশ্বসাহিত্যে তার অসাধারণ অবদানের জন্য বিশ্ব জুড়ে লেখক, সাহিত্য সমালোচক এবং পণ্ডিতরা মুগ্ধ।

তেলাম : বোর্হেসকে আপনার ভাষায় অনুবাদ করার অসুবিধাগুলো কী কী? ব্যাখ্যা করার মতো কি কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করেছেন? আপনি কি দুই ভাষার মধ্যে সংযোগের কিছু খুঁজে পান?

রাজু আলাউদ্দিন  : তার অদ্ভুত শৈলী ও বারোকবিরোধী ভাষার কারণে বোর্হেস অনুবাদ করা কঠিন। তা ছাড়া, তার কথাসাহিত্যে, তার উপহাস এবং গম্ভীর মেজাজ, অনুবাদকদের ভীষণভাবে বিড়ম্বনায় ফেলে, যা কিনা অনুবাদকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তেলাম : কোন ধরনের লেখাগুলো অনুবাদ করা সবচেয়ে কঠিন?

রাজু আলাউদ্দিন  : একটা প্রচলিত ধারণা আছে যে, কবিতার চেয়ে

কথাসাহিত্য অনুবাদ করা সহজ। কিন্তু বোর্হেসের ক্ষেত্রে, এটা সত্য নয়। তবে এই অসুবিধাগুলোর কারণে, আমরা অনুবাদ করা থেকে বিরত থাকতে পারি না। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, শিল্প মানে সেটাই যেখানে চ্যালেঞ্জ থাকে। মূল লেখার প্রতি বিশ্বস্ততা এবং অনুবাদের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে, আমি প্রথমটির ব্যাপারেই বেশি উদ্বিগ্ন। আমার মনে হয় এটি এমন এক পদ্ধতি, যাকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

এই পদ্ধতি পছন্দের পেছনে একটি রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তিও রয়েছে। একজন অনুবাদককে অবশ্যই ভিন্ন সংস্কৃতির অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো গ্রহণ করতে হবে। উপরন্তু প্রতিটি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে, যা তাদের সাহিত্যিক এবং শৈল্পিক প্রকাশের ধরনে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সব সংস্কৃতির স্বতন্ত্রতার কারণেই এক সংস্কৃতির মানুষ অন্য সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়। সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতার প্রতি শ্রদ্ধা কেবল মূল গ্রন্থে পাওয়া ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে বাদ না দিয়েই দেখানো যেতে পারে। এটা সত্য যে, আমরা মূল পাঠের প্রতি যতই বিশ্বস্ত থাকতে চাই না কেন, অনুবাদককে একটি নির্দিষ্ট কাজ অনুবাদ করার সময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বাধীনতা নিতে হয়। এই স্বাধীনতা অনুবাদককে সাংস্কৃতিক পার্থক্যগুলো মোকাবিলা করার সুযোগ দেয়।

তেলাম : অনুবাদে কতটা হারায় বা অর্জিত হয়?

রাজু আলাউদ্দিন : যখন একটি লেখা মূল ভাষা থেকে অনূদিত ভাষায় স্থানান্তরিত হয়, তখন এটি নতুন কিছু অর্জনও করে। কারণ এটি একটি ভিন্ন সংস্কৃতিকে স্পর্শ করার মাধ্যমে মূল ভাষার লেখাটি নতুন ভাষাগত পরিবেশের আতিথেয়তায় নতুন অনুভূতিতে সমৃদ্ধ হয় এবং তাই আমরা এটা বলতে পারি না যে অনুবাদ কেবলই কিছু হারায়। অনুবাদ হলো হারানোর মাধ্যমে অর্জনের এক শিল্প।

তেলাম : বোর্হেসের কাজে আপনি কীভাবে প্রবেশ করেছিলেন এবং লেখকের কোন দিকটি আপনাকে মুগ্ধ করে?

রাজু আলাউদ্দিন : আমি বোর্হেসের জগতে প্রবেশ করি তার কবিতার মাধ্যমে। তারপর আমি তার কথাসাহিত্য পড়তে শুরু করি, যা কিনা বিশ্বসাহিত্যে অতুলনীয়। তার বহুস্তরী ও মাল্টিফাংশনাল সাহিত্যকর্ম বিশ্বজুড়ে পাঠক এবং লেখকদের মধ্যে অসীম আগ্রহ তৈরি করেছে। নিজেকে তিনি এমন এক কেন্দ্রের অনন্য উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন যেখানে পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতি ও ইতিহাস একত্রিত হয়েছে। ইসলামি, খ্রিস্টান, ইহুদি এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতিকে তিনি আখ্যানে রূপান্তরিত করেন। লাতিন আমেরিকা এবং আল আন্দালুস, অতীত এবং বিস্মৃতি, স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন, মৃত্যু, সময়ের সব সম্ভাব্য শাখা, মানব ট্র্যাজেডি এবং কৌতুক তার কাল্পনিক মঞ্চে একসঙ্গে বিচরণ করে এবং এসব কিছুই করা হয়েছে সর্বোচ্চ শৈল্পিক দক্ষতার সঙ্গে।

তেলাম : এমন কোন বিশেষত্ব রয়েছে, যা বোর্হেসকে বিশ্বব্যাপী তাৎপর্যপূর্ণ লেখক করে তুলেছে?

রাজু আলাউদ্দিন  : কথাসাহিত্যের ভাষা, শৈলী, বিষয়বস্তু, উপস্থাপনা এবং নান্দনিকতায় তিনি রীতিমতো বিপ্লব এনেছিলেন। বোর্হেসের আগে কোনো লেখকই একসঙ্গে এটি করেননি। তিনি একাই শত শত পাখিকে প্রথার খাঁচা থেকে মুক্ত করেছেন। তিনি এমন এক ঐতিহ্য তৈরি করেছেন, যার অভাব ছিল আর্জেন্টিনায়। তিনি এমন সব কাল্পনিক গল্প সৃষ্টি করলেন, যা ছিল বাস্তবতার চেয়েও বেশি বাস্তব। সবকিছুতে তিনি আলেফের মতো এমন এক বিন্দুতে নিয়ে এলেন, যা অন্য লেখক কখনোই করেননি। তার গল্পগুলোকে তিনি স্বপ্ন, কল্পনা, ইতিহাস, গুপ্তহত্যা, বীর, খল, আকাক্সক্ষা, উচ্চাশা, চিরন্তন, মানুষের অতীত ও বর্তমান দিয়ে পূর্ণ করে তুলেছিলেন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে তুলনীয় এক আন্তর্জাতিক গ্রন্থাগারের তিনি আমাদের এক গ্রন্থাগারিক। তিনি আমাদের সাহিত্যিক বিশে^র অভিভাবক। মানি আর না-ই মানি, আমরা সবসময় তার মধ্যেই আছি এবং তার দ্বারা পরিবৃত হয়ে আছি।

তেলাম : বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে, বোর্হেসের কাজের কোন বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করা সবচেয়ে কঠিন?

রাজু আলাউদ্দিন : আমার মনে হয় না আমাদের সংস্কৃতিতে এটি ব্যাখ্যা করা কঠিন, কারণ আমরা আমাদের চিন্তাভাবনায়, পূর্ব ও পশ্চিমা সংস্কৃতির ঐতিহ্য উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। আমরা বিচ্ছিন্ন নই। সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা এবং দর্শনের মাধ্যমে আমরা অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত। তাই বোর্হেসিয় সব কাজ আমাদের কাছে বোধগম্য।