‘নেপোকিড’, শাহরুখ খানের ছেলে আরিয়ান খানের পরিচালনায় সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ওয়েব সিরিজ ব্যা*ডস অফ বলিউড-এর কল্যাণে শব্দটি আবারও আলোচনায়। নেটফ্লিক্সে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ওয়েব সিরিজের বিজ্ঞাপন দেখা গেছে এশিয়া কাপের ভেন্যুতেও, প্রচারণাতে এসেছিলেন অভিনেতা ববি দেওল। কাকতালীয়ভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলেও আছে এমন এক ‘নেপোকিড’, সহকারী কোচের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণেই একাদশে জায়গা হারানোর বদলে তাকে দেওয়া হয়েছে অধিনায়কের দায়িত্ব। ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক জাকের আলী অনিকের ভার বয়েছে বাংলাদেশ, সেই সঙ্গে শেখ মেহেদি হাসানকে চারে ব্যাটিংয়ে পাঠানোর উদ্ভট যুক্তি। পাকিস্তানের বিপক্ষে কুৎসিত ক্রিকেট খেলে হেরে এশিয়া কাপ থেকে বিদায়ের পরও বাংলাদেশ দল দুবাইয়ের হোটেল ছাড়েনি। আপাতত এখানেই থাকবেন, ২৯ তারিখ থেকে শারজায় শুরু হবে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রস্তুতি। কুৎসিত ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনীর পরও মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের সুনজরে থাকা জাকের আলী হয়তো টিকে যাবেন আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজেও।
জাকের আলী এবং সালাহউদ্দিনের সুসম্পর্কের শুরু বিকেএসপি থেকে। ২০১০ সালে সপ্তম শ্রেণিতে বিকেএসপিতে ভর্তি হয়েছিলেন জাকের। একই বছর বিসিবির চাকরি ছাড়েন সালাউদ্দিন। বিকেএসপিতে খন্ডকালীন কোচ ছিলেন সালাউদ্দিন। জাকেরকে বিপিএলের দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস দলে নেওয়ার পেছনে তার ভূমিকাই ছিল বড়। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪, দুই মৌসুম কুমিল্লার হয়ে খেলেন জাকের। তাকে জাতীয় দলে না নেওয়া প্রসঙ্গে তখন কুমিল্লার কোচ সালাউদ্দিন বলেছিলেন, ‘জাকেরের কথাটা সব সময় আপনারা ভুলে যান, আপনারা কেউ কিন্তু আসলে কখনোই জিজ্ঞাসা করেন না। ছেলেটার হয়তো চেহারা একটু কালো, এই কারণে আমার মনে হয়, বোর্ডও তাকে দেখে না ঠিকমতো। আপনারা ৬ নম্বর, ৭ নম্বরে প্লেয়ার খোঁজেন। এই ছেলেটা লাস্ট কয়েকটা ম্যাচ থেকে খুবই ভালো খেলছে। তার স্ট্রাইক রেট যদি দেখেন আর সে প্রতিটা দিনই আমাদের ক্রুশাল মোমেন্টে রানটা করে দিচ্ছে এবং সে অনেক সেনসিবল।’ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে জাকেরের দলে না থাকা নিয়ে সালাউদ্দিন বলেছিলেন, ‘আমি গতকাল বাংলাদেশ দল দেখলাম। আপনি ৫ জন ওপেনার রেখেছেন, মিডল অর্ডারে ২ জন ব্যাটসম্যান মনে হয়। একটা সুবিধা আছে হয়তো, সব সময় বাংলাদেশ ওপেনিং-ই করবে, ১৬-১৭ ওভার পর্যন্ত ওপেন করবে, এটা একটা সুবিধা হতে পারে। তবে ঠিক জায়গায় ঠিক খেলোয়াড় নেওয়াটা খুব জরুরি।’
সহকারী কোচের চেয়ারে বসে নিজের কথাই যেন ফিরিয়ে দিলেন সালাহউদ্দিন। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশের কোনো মিডল অর্ডার ছিল না। চারে ব্যাট করতে আসেন শেখ মেহেদি হাসান, সেটাও ম্যাচের ষষ্ঠ ওভারে। ক্যারিয়ারে অতীতে একবারই চারে নেমেছিলেন মেহেদি, ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিরপুরে। তার গড় হচ্ছে ১১ আর স্ট্রাইক-রেট ১০০। এমন একজনকে চারে পাঠানোর এই উদ্ভট সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় কোচ ফিল সিমন্স বলেছেন, ‘আপনি এটাকে ৪ নম্বর হিসেবে দেখছেন। আমি দেখেছি, এমন একজনকে পাঠানো হচ্ছে, যিনি তখন পেসারদের সামলাতে পারতেন। তখনো পাওয়ার-প্লে চলছিল, তাই সে ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষে বেশি খেলতে পারত। যদি তাকে নিচে পাঠাতাম, তাহলে শুধু স্পিনারদেরই মুখোমুখি হতো। আমার কাছে তখনো জাকের আর শামীম ছিল, যারা স্পিনারদের আরও ভালো খেলে। এই ছিল পেছনের চিন্তাভাবনা।’ শেখ মেহেদি পেসারদের ভালো খেলেন, এই যুক্তি শুনলে সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায় ‘ঘোড়াও হাসবে’।
ফেরা যাক জাকের প্রসঙ্গে। এশিয়া কাপের আগে জুলিয়ান উডের পাওয়ার হিটিং অনুশীলন ক্যাম্পে তাকে দেখা গেছে হাতুড়ি হাতে অনুশীলন করতে। তাকে দেখে নাকি মুগ্ধ হয়েছেন ইংলিশ এই কোচ, করেছেন প্রশংসাও। তবে ছাত্রের রিপোর্ট কার্ড দেখলে উড হয়তো ফিরিয়ে নেবেন নিজের কথা। এশিয়া কাপে ৬ ম্যাচে ৬৬ বল খেলেছেন জাকের, মারতে পারেননি একটি ছক্কাও। বরং শেষ ওভারে দিয়েছেন একের পর এক ডট বল। সব বলে একই কায়দায় শট খেলতে গিয়ে হয়েছেন আউট। কখনো দোষ দিয়েছেন বাতাসের, কখনো ক্যাচ ছেড়েছেন উইকেটের পেছনে। তার ব্যাটিং দেখে শোয়েব মালিক বলেছেন, ‘মাঠের একপ্রান্তে খেলে জাকের যদি মনে করে রান আসতে থাকবে, সেটা আসলে হবে না। অফস্টাম্পের বাইরে তাকে বোলিং করা শুরু করে। আমরা দেখেছি, শেষের চার ওভারে সেট ব্যাটার হিসেবে আপনি খেলছেন, কিন্তু বল ব্যাটে লাগাতে পারলেন না। মানে হচ্ছে কোনো সমস্যা হচ্ছে। ওটা ঠিক করতে হবে। আপনার কাছে পুরো মাঠ আছে, যেখানে বল আসে সেখানে খেলেন। জাকের আলীকে ওরা ফিনিশার বলে। কিন্তু তাকেও চিন্তা করতে হবে ক্রস অ্যাঙ্গেলেই মিড উইকেটের দিকে রান আসবে না।’ শুধু এশিয়া কাপেই নয়, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ৪ ম্যাচে একাদশে সুযোগ পেয়ে জাকের ৪৬ বল খেলে করেছেন ৩৫ রান, স্ট্রাইক-রেট ৭৬। চার মেরেছেন মাত্র ৩টি, কোনো ছক্কা নেই। এই পরিসংখ্যান যদি সালাউদ্দিন এবং সিমন্সের অজানা থাকে, তাহলে সে সব জানিয়ে দেওয়ার জন্য দলে পারফরম্যান্স অ্যানালিস্টও আছেন। সেসব জেনেও জাকেরকে ফিনিশারের ভূমিকায় খেলিয়ে দেওয়া, নিয়মিত একাদশে সুযোগ দেওয়া এবং অধিনায়ক বানিয়ে দেওয়াটা স্বজনপ্রীতি ছাড়া আর কিছু নয়।
লিটনের নেতৃত্বে অভিষেকের সিরিজে সহ-অধিনায়ক ছিলেন শেখ মেহেদি হাসান। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ দল আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সহ-অধিনায়ক ঘোষণা না করলেও দলের ভেতর থেকেই নাকি তাকে লিটনের বিকল্প হিসেবে জানিয়ে রাখা হয়েছিল, ‘আমাকে দেশে থেকেই বলা ছিল যদি দরকার হয় তুমি দায়িত্বে থাকবে। এটা আমাকে অনেক আগে থেকেই বলা ছিল, হয়তো মিডিয়াতে বলা হয়নি, কিন্তু আমি জানতাম আগে থেকেই।’ তথাকথিত ফিনিশারের পরিসংখ্যানের তথ্য-উপাত্ত এবং ব্যাটিংয়ের ধরন তাকে একাদশেই যেখানে নিয়মিত সুযোগ এনে দেয় না, সেখানে তাকে সম্ভাব্য অধিনায়ক হিসেবে দেশ ছাড়ার আগেই আভাস দিয়ে রাখাটা আরও বড় স্বজনপ্রীতির লক্ষণ। সেই সঙ্গে কাপুরুষের মতো ব্যাটিং, পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজেকেও তো ওপরে নিয়ে আসতে পারতেন জাকের, উইকেটে সময় কাটিয়ে ইনিংসটা থিতু করতে পারতেন। কিন্তু সেই পথে হাঁটেননি, ফিনিশার হিসেবে নামার আগে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনাই হয়ে গেছে প্রায় ফিনিশ।
আফগানিস্তান সিরিজের জন্য দল ঘোষণার জন্য আজ হয়তো বসবেন নির্বাচকরা। এমন জঘন্য এশিয়া কাপ পারফরম্যান্সের পর জাকের যদি জাতীয় দলে থেকে যান, তাহলে সেটা হবে স্বজনপ্রীতির আরও বড় প্রমাণ।