প্রত্যেক বছর সারা পৃথিবীতে দুই কোটিরও বেশি মানুষ নতুন করে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী অসচেতনতা এবং হৃদরোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়া। তাই এই বছর বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘ডোন্ট মিস এ বিট’ অর্থাৎ হৃদরোগের লক্ষণকে উপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন। আমরা যত দ্রুত এই লক্ষণগুলো নির্ণয় করতে পারব তত দ্রুত রোগীকে চিকিৎসা করে সুস্থ করতে পারব। তাই হৃদরোগের কোনো লক্ষণকেই অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা যাবে না।
বিশ্ব হার্ট দিবস (World Heart Day) হলো একটি আন্তর্জাতিক সচেতনতা গঠনের দিবস, যা প্রতিবছর ২৯ সেপ্টেম্বর পালিত হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে কার্ডিওভাসকুলার রোগ (হার্ট ও রক্তনালি সংক্রান্ত রোগ) ও স্ট্রোকের ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া, তাদের প্রতিরোধমূলক উপায়গুলো প্রচার করা এবং সুস্থ-হার্ট জীবনধারার দিকে উৎসাহিত করা।
এই বছর (২০২৫) বিশ্বের হার্ট দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘Don’t Miss a Beat’। যার মানে হচ্ছে লক্ষণ উপেক্ষা না করা, সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া এবং প্রতিরোধমূলক জীবনধারা মেনে চলা।
এই থিমের অর্থ ও গুরুত্ব হলো অনেকেই হার্ট সংক্রান্ত রোগের শুরুতে সতর্ক লক্ষণ উপেক্ষা করে ফেলেন, বা সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান না। থিমটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের প্রতিটি হৃদস্পন্দন (heartbeat) মূল্যবান এবং আমরা ‘বিট’ মিস করা উচিত না অর্থাৎ হৃদয়-স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতন থাকা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া এই থিমের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী, সরকার, কমিউনিটি ও ব্যক্তিনির্ভর উদ্যোগগুলোকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে যাতে স্ট্রোক ও হৃদরোগের জন্য অধিক ও ন্যায়সংগত সেবা নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় হৃদরোগের ঝুঁকি অন্যান্য যে কোনো দেশের তুলনায় অনেকগুণ বেশি। অন্যান্য দেশের হৃদরোগ বয়স্কদের রোগ হলেও আশঙ্কাজনক আকারের বাংলাদেশ হৃদরোগের প্রাদুর্ভাব অল্প বয়স্ক এবং মধ্যবয়স্ক লোকের ক্ষেত্রে অনেক বেশি। আজকের এই আলোচনায় তার কারণ প্রতিকারের উপায় এবং ট্রিটমেন্ট বা চিকিৎসা সম্পর্কে কথা বলব। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব হার্ট দিবসের ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য ‘Don’t Miss a Beat’ বাস্তবায়ন করতে গেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা দরকার।
কীভাবে হৃদরোগ নির্ণয় করা যায় :
হৃদরোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমরা করে থাকি যে পরীক্ষাগুলো মোটামুটি সহজলভ্য প্রতিটি হসপিটালে হয়ে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসিজি, ইকো কার্ডিওগ্রাফি এবং বিভিন্ন রকমের রক্তের পরীক্ষা যার মধ্য দিয়ে হৃদরোগ নির্ণয় করা যায় এবং পরিশেষে করোনারি সিটি এনজিওগ্রাম এবং করোনারি এনজিওগ্রাম যেগুলো আমরা হার্টের রক্তনালিতে কোনো ধরনের ব্লক আছে কি না সেটি দেখার জন্য করে থাকি।
কী কী লক্ষণ হলে আমরা বুঝতে পারব সেটা হার্টের সমস্যা :
হৃদরোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান থাকা অতীব জরুরি। হৃদরোগের লক্ষণগুলোকে যদি আমরা অল্প সময়ের মধ্যে নির্ণয় করতে পারি তাহলে আমাদের পক্ষে হৃদরোগের চিকিৎসা প্রদান করা অনেক সহজ হয়ে যায় এবং যদি লক্ষণগুলো নির্ণয় করতে দেরি হয় তাহলে চিকিৎসা বিলম্বিত এবং রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক অংশে কমে যায়।
নিচে প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেওয়া হলো যা প্রকাশ পেলে অতি দ্রুত হসপিটাল অথবা ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
অল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট হওয়া।
বুকে ব্যথা করা এবং সেই ব্যথা ডানদিকে অথবা বাম দিকে অথবা পেছনের দিকে যাওয়া।
বুক ধরফর করা
অল্পতেই শরীর ঘেমে যাওয়া
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ :
উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension): বাংলাদেশে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, কিন্তু অনেকেই তা জানেন না বা চিকিৎসা নিচ্ছেন না।
ডায়াবেটিস ও স্থূলতা : অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও বাড়তি ওজন হৃদরোগের বড় কারণ।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য : বাংলাদেশে তামাক সেবনকারীর সংখ্যা বিশ্বে অন্যতম বেশি। এটি হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের প্রধান ঝুঁকি।
অস্বাস্থ্যকর খাবার : অতিরিক্ত তেল, লবণ ও ভাজা খাবার খাওয়ার প্রবণতা হৃদরোগ বাড়ায়।
শারীরিক অনিয়ম : নগরায়ণের কারণে শারীরিক পরিশ্রম কমে গেছে, ফলে ঝুঁকি বেড়েছে।
দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া : অনেক সময় মানুষ বুকব্যথা বা সতর্ক সংকেত উপেক্ষা করে দেরি করে হাসপাতালে আসেন।
করণীয় (বাংলাদেশে যেভাবে সচেতনতা ও প্রতিরোধ বাড়ানো যেতে পারে)
সচেতনতা বৃদ্ধি : স্কুল, কলেজ, অফিস ও কমিউনিটি পর্যায়ে হৃদরোগ প্রতিরোধ নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি।
স্ক্রিনিং ও নিয়মিত পরীক্ষা : সহজলভ্য ব্লাড প্রেসার ও সুগার চেকআপ সেন্টার তৈরি করা।
তামাক নিয়ন্ত্রণ : তামাকের ওপর বাড়তি কর, পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধকরণ বাস্তবায়ন।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন : কম লবণ, কম তেল, বেশি শাকসবজি ও ফল খাওয়ার প্রচার।
শারীরিক পরিশ্রমে উৎসাহ : হাঁটা, সাইকেল চালানো বা প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট শারীরিক কার্যক্রমে উৎসাহ দেওয়া।
প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা : গ্রাম পর্যায়েও দ্রুত হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের রোগী শনাক্ত করে হাসপাতালে রেফার করার ব্যবস্থা।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা : টেলিমেডিসিন বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে হার্ট স্বাস্থ্য মনিটরিং।