চর বিজয়ে সবুজায়নের নামে বিপন্ন জীববৈচিত্র্য

সমুদ্রের বিশাল বুকে যেন এক নিঃসঙ্গ স্বপ্নের নাম চর বিজয়। কুয়াকাটা থেকে দক্ষিণে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা এ ক্ষুদ্র দ্বীপটি আজ এক নীরব যন্ত্রণার প্রতীক। এক সময়ের পরিত্যক্ত বালুচর এখন হয়ে উঠেছে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর, লাল কাঁকড়ার চলাচলে প্রাণবন্ত এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের এক অপরিমেয় ভাণ্ডার।

তবে আজ চর বিজয় আর নিসর্গের শান্ত ছায়াতলে ঘুমায় না। সেখানে এখন হাঁটছে হাজারো পা, বাজছে মাইক, উড়ছে প্ল্যাস্টিক ব্যাগ, পেরিয়ে যাচ্ছে স্টিল বোট। নামধারী সবুজায়নের নামে শোভা পাচ্ছে তাল-খেজুরের চারার সারি যেখানে একটিও টিকে থাকার পরিবেশ নেই।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামী কুয়াকাটা পৌর শাখা প্রায় আড়াই হাজার তাল, খেজুর, নারিকেল ও বটগাছের চারা রোপণ করেছে চরজুড়ে। তারা বলছেন, পর্যটন বিকাশে সবুজায়ন জরুরি। কিন্তু পরিবেশবিদদের চোখে এটা প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক নির্বোধ হস্তক্ষেপ।

চর বিজয় কোনো পার্ক নয় যে যেখানে খুশি গাছ লাগাবেন। এটি একটি জটিল প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ, যেখানে শুধু ম্যানগ্রোভই টিকতে পারে বলেছেন মহিপুর বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত সুফল প্রকল্পে এক লাখ চারা রোপণের মধ্যে মাত্র ২৫ হাজার এখনো টিকে আছে। বাকিগুলো হারিয়ে গেছে জোয়ারের ঢেউ আর লবণাক্ত বাতাসের দাপটে।

এখানে কোনো এক রাতের অতিথি নয় শীত এলেই হাজির হয় হাজার হাজার অতিথি পাখি। কাঁকড়ার দল লাল রং ছড়িয়ে দেয় বালুর চরে, অগভীর জলে ডিম পাড়ে সামুদ্রিক মাছ। এই দ্বীপ যেন জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্ব নাট্যমঞ্চ।কিন্তু পর্যটনের উন্মাদনায় আজ সেই মঞ্চেই চলছে ট্র্যাজেডির অভিনয়।

শীতকালে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকদের ভিড়ে আতঙ্কে পালায় পাখি। পা পড়ে কাঁকড়ার বাসায়, বর্জ্যে দূষিত হয় বালু ও জল। স্থানীয় জেলেরা বলছেন, খুলনা থেকে আসা স্টিল বোটের দল নেট জাল টেনে ধরে নিচ্ছে পোনা মাছ ভবিষ্যতের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে আজ হত্যা করছে এক লোভী হাত।

এটা শুধু একটি চর নয়, বরং উপকূলের জীববৈচিত্র্য রক্ষার এক অপরিহার্য বর্ম,বলেন পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমান। তার ভাষায়, সবুজায়নের নামে যা হচ্ছে তা এক ধরণের পরিবেশ-রাজনীতি যেখানে প্রকৃতি কথা বলতে পারে না, আর যারা কথা বলে, তারা শোনে না। প্রয়োজন ছিল একটুখানি সংযম, একফোঁটা বিজ্ঞানচেতনা আর প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা। তার বদলে এসেছে সস্তা স্লোগান, দলীয় কর্মসূচি আর চোখ ধাঁধানো ক্যামেরার ঝলকানি।

চর বিজয় আজ দোল খাচ্ছে দ্বিধার দোলনায় একদিকে সম্ভাবনা, আরেকদিকে বিপর্যয়। আর প্রকৃতি সে নিশ্চুপ। হয়তো আগামী মৌসুমে আর কোনো পাখি ফিরবে না, হয়তো লাল কাঁকড়ারা পালাবে চিরতরে।তবু চর বিজয়ের বালুতে প্রতিদিন সূর্য ওঠে, নামে। কেউ কি শুনতে পাচ্ছে, সেই সূর্যের আলোয় লেখা প্রকৃতির কান্না।