দ্বিতীয় হাঙ্গেরীয় লেখক হিসেবে সাহিত্যে চলতি বছর নোবেল জিতেছেন লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) বিকাল ৫টার দিকে নোবেল কর্তৃপক্ষ তার নাম ঘোষণা করেন। তবে হাঙ্গেরীয় লেখক হিসেবে তিনিই প্রথম সাহিত্যে নোবেলজয়ী নন। তার আগে ২০০২ সালে সাহিত্যে নোবেল জিতেছিলেন ইমরে কেরতেস।
সুইডিশ অ্যাকাডেমির মতে, আকর্ষণীয় ও দুরদর্শী রচনার জন্য লাসলোকে এ বছর সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, তার লেখনি বৈশ্বিক ভয়াবহতার মধ্যে শিল্পের শক্তিকে পুনরায় নিশ্চিত করেছে।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ছোট শহর গিউলায় জন্মগ্রহণ করেন। এই ধরনের একটি প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকাকেই কেন্দ্র করে লেখা তার প্রথম উপন্যাস ‘সাতানতাঙ্গো’, যা ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় (ইংরেজি অনুবাদ ২০১২)। উপন্যাসটি হাঙ্গেরিতে প্রকাশের পরই সাহিত্যজগতে আলোড়ন তোলে এবং লেখকের জীবনে এটি ছিল এক বিরাট সাফল্য।
তার আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাবোরু এশ হাবোরু’ (১৯৯৯; ইংরেজি অনুবাদ ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার, ২০০৬)-এ লেখক হাঙ্গেরির সীমান্ত ছাড়িয়ে দৃষ্টি বিস্তার করেছেন। এখানে এক সাধারণ আর্কাইভ কর্মচারী করিন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে সিদ্ধান্ত নেন বুদাপেস্টের প্রান্ত থেকে নিউ ইয়র্কে যাওয়ার, যেন এক মুহূর্তের জন্য হলেও তিনি ‘বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে’ দাঁড়াতে পারেন। আর্কাইভে তিনি খুঁজে পেয়েছেন এক অতিপ্রাচীন ও অপূর্ব মহাকাব্য, যেটিকে সে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে চায়।
ইমরে কেরতেস
ইমরে কেরতেস ১৯২৯ সালের ৯ নভেম্বর হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইহুদি বংশোদ্ভূত ছিলেন। ১৯৪৪ সালে তাকে আউশভিৎসে নির্বাসিত করা হয় এবং সেখান থেকে বুকেনভাল্ডে পাঠানো হয়, যেখানে ১৯৪৫ সালে তিনি মুক্তি পান। হাঙ্গেরিতে ফিরে এসে তিনি ভিলাগোশাগ নামের একটি বুদাপেস্টভিত্তিক পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। কিন্তু ১৯৫১ সালে পত্রিকাটি কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শ অনুসরণ শুরু করলে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
দুই বছর সামরিক বাহিনীতে কাজ করার পর তিনি স্বাধীন লেখক ও জার্মান ভাষার লেখকদের অনুবাদক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। তিনি যেসব লেখকের কাজ অনুবাদ করেছেন—নিৎসে, হফমানস্টাল, শনিৎসলার, ফ্রয়েড, রথ, ভিটগেনস্টাইন এবং কানেত্তি—তাদের রচনাগুলো তার নিজের লেখালেখিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
কেরতেসের প্রথম উপন্যাস শরস্তালানশাগ (ইংরেজি অনুবাদ ফেইটলেস, ১৯৯২ ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয়। আউশভিৎস ও বুকেনভাল্ডে তার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা এই উপন্যাস সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘যখনই আমি নতুন কোনো উপন্যাস নিয়ে ভাবি, আমি সবসময় আউশভিৎসকে ভাবি।’ তবে এর অর্থ এই নয় যে শরস্তালানশাগ সরলভাবে আত্মজীবনীমূলক—কেরতেস নিজেই বলেছেন যে তিনি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের কাঠামো ব্যবহার করেছেন, কিন্তু এটি আত্মজীবনী নয়।
উপন্যাসটি প্রথমে প্রকাশ করতে গিয়েও তাকে রিজেক্ট হতে হয়। অবশেষে ১৯৭৫ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে তা নীরব প্রতিক্রিয়া পায়। এই অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি পরবর্তীতে এ কুদার্চ’ (১৯৮৮; ‘ফিয়াস্কো’) লিখেছিলেন। এই উপন্যাসটি সাধারণত একটি ত্রয়ীর দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়, যা শুরু হয় ‘শরস্তালানশাগ’ দিয়ে এবং সমাপ্ত হয় ‘কাদ্দিস আ মেগ নেম স্যুলেতেত জেরমেকের্ত’ (১৯৯০; ইংরেজি অনুবাদ কাদ্দিস ফর অ্যা চাইল্ড নট বর্ন) দিয়ে যার শিরোনাম মৃত ইহুদিদের জন্য পাঠ করা প্রার্থনা ‘কাদ্দিসকে’ ইঙ্গিত করে।
১৯৮৯ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কেরতেস আরও প্রকাশ্যে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পান। তার বক্তৃতা ও প্রবন্ধগুলো পরবর্তীতে সংকলিত হয় নিম্নলিখিত গ্রন্থে—
A holocaust mint kultúra (১৯৯৩; The Holocaust as Culture),
A gondolatnyi csend, amíg kivégzőosztag újratölt (১৯৯৮; Moments of Silence While the Execution Squad Reloads)
A száműzött nyelv (২০০১; The Exiled Language)।
তার রচনাগুলো বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে জার্মান, স্প্যানিশ, ফরাসি, ইংরেজি, চেক, রুশ, সুইডিশ ও হিব্রু ভাষা।