পা ফস্কালেই ফের বন্ধ হয়ে যেতে পারে বিশ্বকাপের দরজা

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকেও বাংলাদেশে ক্রিকেট ছিল অন্য আর দশটা খেলার মতোই, ফুটবলের ফ্লাডলাইটের মতো জনপ্রিয়তার কাছে টিমটিমে হারিকেন। সব বদলে দিল একটা শব্দ, বিশ্বকাপ। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের মাধ্যমে প্রথম বার বিশ্বকাপের বন্ধ দরজা খোলে ক্রিকেট, সেই দরজা দিয়ে একে একে এসেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সূচি, সম্প্রচার স্বত্বের টাকা আর করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা। তাতে স্ফীত হয়েছে বিসিবির কোষাগার। তবে প্রায় ৩ দশক পর একটু পা ফস্কালেই ফের বন্ধ হয়ে যেতে পারে বিশ্বকাপের দরজা। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলা হয়নি প্রথম দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের। অঙ্ক না মিললে বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে থাকতে হতে পারে বাংলাদেশকেও, শুধু তাই নয় আইসিসি পরবর্তী চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও বরণ করে নিতে হতে পারে একই ভাগ্য। সেই সঙ্গে পর পর দুই ওয়ানডে সিরিজে হার মানতে হবে আফগানদের কাছে।

একটা সময় ওয়ানডে সংস্করণ নিয়ে গৌরব ছিল বাংলাদেশের। দেশের মাটিতে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে পরপর হারানোর গৌরব। বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেমিফাইনাল খেলা আর এশিয়া কাপে ফাইনাল খেলার গৌরব। তবে সেই সব সুদিন হারিয়েছে কালের গর্ভে। বাংলাদেশ এখন ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের ১০ নম্বরে। অন্তত ৯ নম্বরে উঠে আসতে হলে জিততে হবে আগামী ৫ ম্যাচের সবগুলো। যার প্রথমটি আজ, আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে।

আইসিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ হবে ১৪ দলের। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে বাদে আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ ৮ দল খেলবে সরাসরি। র‌্যাংকিংয়ের পরের দুটো দলকে খেলতে হবে বাছাইপর্বে, যেখানে ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগ-২ এবং কোয়ালিফায়ার প্লে-অফ থেকে আসবে চার দুগুনে মোট ৮ দল, সব মিলিয়ে ১০ দলের আসর— যেখান থেকে ৪ দল খেলবে বিশ্বকাপে। এই মুহূর্তে র‌্যাংকিংয়ের টেবিলে বাংলাদেশ যেখানে, সেখান থেকে একটু পা ফসকালেই চলে যেতে হবে বাছাইপর্বের জুয়ার টেবিলে।

ঠিক এই মুহূর্তে আফগানিস্তান আছে পয়েন্ট টেবিলের সাতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ নবম ও বাংলাদেশ দশম। দক্ষিণ আফ্রিকা আছে ষষ্ঠ স্থানে, তাই স্বাগতিক প্রোটিয়াদের বাদ দিলে র‌্যাংকিংয়ে ৯ এর ভেতর আসতে পারলেই মিলবে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট। বাংলাদেশকে তাই ওপরে উঠতে হলে পয়েন্টের জোরে কাউকে ঠেলে নামাতে হবে। সেই জোরটা আসবে জয় থেকে। আফগানিস্তানের সঙ্গে সিরিজের বাকি দুই ম্যাচ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের আসন্ন বাংলাদেশ সফরের ৩ ওয়ানডে ম্যাচের সবগুলো, অর্থাৎ টানা ৫ ম্যাচ জিতলে বাংলাদেশ উঠে আসবে নিরাপদ নবমে। রেটিং পয়েন্ট হবে ৮৪। এ নিয়ে পেসার তানজিম হাসান সাকিব বলেন, ‘ওয়ানডে আমাদের সবার ফেভারিট সংস্করণ। এই জায়গায় ১০ নম্বরে থাকা গ্রহণযোগ্য নয়, আরও ওপরে থাকা উচিত। বাছাইপর্ব খেলাটা আমাদের মানায় না। (বিশ্বকাপে) কীভাবে সরাসরি খেলতে পারি, ওটা আমাদের মাথায় থাকা উচিত।’

এই বছর এখন পর্যন্ত ৬টা ওয়ানডে খেলে ৫টাই হেরেছে বাংলাদেশ। আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ২ ম্যাচে হার, ১ ম্যাচ পরিত্যক্ত। শ্রীলঙ্কার কাছে ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হার। এরপর আফগানিস্তানের কাছেও সবশেষ ওয়ানডে ম্যাচে হার। যদি ফলের ব্যাপ্তিটা আরেকটু বাড়ানো যায়, তাহলে দেখা যাবে ২০২৪ সাল থেকে শুরু করে এখন অবধি বাংলাদেশ ১৫টা ওয়ানডে ম্যাচ খেলে মাত্র ৪টা ম্যাচ জিতেছে, ৩টা শ্রীলঙ্কা ও একটি আফগানিস্তানের বিপক্ষে। ভগ্নদশার ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছেও ক্যারিবিয়ানে ৩-০তে ধবল ধোলাই হয়েছে বাংলাদেশ। এই ফল বিপর্যয়েরই প্রভাব পড়েছে র‌্যাংকিং টেবিলে। যার খেসারত দিতে হতে পারে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অবনমিত হয়ে। ১৯৯৯’র পর ২০০৩ সাল থেকে টেস্ট মর্যাদার দল হিসেবে সরাসরিই বিশ্বকাপে খেলে আসছে বাংলাদেশ, ২০১৯ সালের বিশ্বকাপের জন্য প্রণীত ওয়ানডে সুপার লিগে তৃতীয় হয়ে যোগ্য দল হিসেবেই বিশ্বকাপে খেলেছিল বাংলাদেশ। তবে বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের কাছে হার-সহ ৯ ম্যাচে মাত্র ২ জয় ও ৭ হার এবং চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও জয়হীন থাকাটা বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায়।

আজ হারলে আফগানদের বিপক্ষে টানা তৃতীয়বারের মতো ওয়ানডে সিরিজ হারবে বাংলাদেশ। ওয়ানডে হোক কিংবা টি-টোয়েন্টি, বাংলাদেশের বড় সমস্যা ব্যাটিং। সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ব্যাটাররা প্রস্তর যুগের ব্যাটিং করেছেন। তাওহীদ হৃদয় এবং মেহেদী হাসান মিরাজ দুটো হাফসেঞ্চুরি করেছেন বটে, তবে স্ট্রাইক রেট ছিল ষাটের ঘরে। আজকাল টেস্টেও এই স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করাটা অনেক কোচের কাছে অপরাধের শামিল। শ্রীলঙ্কা সিরিজের ৩ ম্যাচের কোনোটিতেই, আগে কিংবা পরে ব্যাট করে পুরো ৫০ ওভার ব্যাটিং করতে পারেনি বাংলাদেশ। তার আগে দুটো ম্যাচ এই বছর খেলেছে বাংলাদেশ, আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে, তাতে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ অলআউট হয়েছে ইনিংস শেষের ২ বল আগে আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৯ উইকেট যাওয়ার পর মান বেঁচেছে কোনো রকমে।

পারফরম্যান্স এবং শর্ত, দুটোই বাংলাদেশের বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার স্বপ্নে তুলেছে বাস্তবতার দেয়াল। তবুও মানুষ তো বাঁচে আশায়। সামনে ৫টা ম্যাচ, সবগুলো জিতলে বাড়বে সম্ভাবনা। না হলে আইসিসি ট্রফির আদলে বিশ্বকাপের বাছাই খেলতে হতে পারে ২৭ বছর পর!