পৃথিবীর দিকে তাকালে, বিভিন্ন দেশে শুধু রক্তক্ষরণ দেখা যায়। যুদ্ধ, সংঘাত আর ক্ষমতার উন্মত্ত লড়াইয়ে জর্জরিত আমাদের পৃথিবী। ইউক্রেন-রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া সর্বত্র শুধু ধ্বংসের প্রতিধ্বনি। বর্তমান আলোচনা শুধু সংঘাতগুলোর সামরিক কৌশলের ওপর নয়, বরং যুদ্ধগুলোর মূলে থাকা গভীরতর মানবিক সংকটের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। আমরা দেখতে পাই, প্রতিটি যুদ্ধের মূলে ‘ক্ষমতার লড়াই’ ও ‘আধিপত্যের দলীয় রাজনীতি’। সেখানে প্রকৃত অর্থে কোনো সভ্য মানুষ নেতৃত্ব দিচ্ছে না। এটি এমন এক সত্তা যা দেখতে মানুষের মতো, অথচ মানুষ নয়। এই নেতৃত্ব হলো ক্ষমতার গাণিতিক সমীকরণ, যেখানে মানুষের মূল্য শুধু এক নগণ্য জীবিত সত্তার। এটি মনুষ্যত্বের চূড়ান্ত অবক্ষয়। এমন সত্তার মূল লক্ষ্য হলো দখল, নিয়ন্ত্রণ এবং স্বার্থসিদ্ধি। কোনোভাবেই মানবতার কল্যাণ নয়। এমন মানব-সদৃশ নেতৃত্বের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য হলো চরম আত্মকেন্দ্রিকতা ও সহমর্মিতার অভাব। যখন কোনো শাসকগোষ্ঠী বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ধারণ করে এবং সেই সিদ্ধান্তে কোটি মানুষের জীবন অনিশ্চিত হয়, তখন বুঝতে হবে সেখানে মানবিক বিচারবুদ্ধির পরিবর্তে শুধু শীতল, যান্ত্রিক রাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে। যুদ্ধকালীন পরিসংখ্যানগুলো এই নির্মমতা বহন করে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনের (UNHCR) তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে ১১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই বিশাল মানবিক বিপর্যয়, ক্ষমতা-লোভী, মনুষ্যরূপী অ-মানবিক যান্ত্রিকতার ফল। ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত শুধু দুটি রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, এটি ক্ষমতার ভারসাম্যের এক চরম পরীক্ষা। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম অনুযায়ী, এই যুদ্ধে হাজার হাজার সৈন্য নিহত ও লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনের অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে কোনো কল্যাণকামী দর্শন নেই, আছে শুধু আধিপত্য বিস্তারের এক নিছক গোয়ার্তুমি। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, যা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো মানবিক সংকটগুলোর একটি। সেখানেও শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে, প্রতিবারই প্রাধান্য পেয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ ও ঐতিহাসিক দাবির কঠোরতা। গাজায় সংঘাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা অভাবনীয়।
জাতিসংঘের অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স (OCHA)-এর তথ্যমতে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশু ও নারী নিহত হয়েছেন। এই মৃত্যুমিছিল শুধু ক্ষমতার রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যদিও বর্তমানে যুদ্ধবিরতি হয়েছে। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল, যেমন কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (DRC) বা সুদানে চলমান যুদ্ধগুলোর দিকে তাকালে ক্ষমতার লড়াইয়ের আরও ভয়ংকর রূপ দেখা যায়। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে দশকব্যাপী খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণের জন্য সংঘাত চলছে। এই সংঘাতগুলো লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে ও কোটি কোটি মানুষকে উদ্বাস্তু করেছে। সুদানে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দ্বন্দ্বে রাজধানী খার্তুম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এ যুদ্ধগুলো কোনো আদর্শের জন্য নয়; শুধুই সম্পদ লুণ্ঠন ও গোষ্ঠীগত আধিপত্যের জন্য। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক আধিপত্য এবং সীমান্তকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি প্রায়ই সংঘাতের জন্ম দেয়।
প্রায়ই ভারত-পাকিস্তান বা চীন-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা চলে। এটি সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের খেলা। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর তথ্যমতে, এ অঞ্চলের দেশগুলো সামরিক খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, যা প্রমাণ করে যে, তাদের কাছে জাতীয়তাবাদী অহমিকা, মানবিক উন্নয়নের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই উদাহরণগুলো দেখাচ্ছে যেখানে যুদ্ধ চলে, সেখানে কোনো স্বাভাবিক মানুষ নেতৃত্ব দিতে পারে না। মানুষের পরিচয় ভালোবাসা ও সহমর্মিতায়। কিন্তু বর্তমানের নেতৃত্বদানকারীরা কল্যাণ বা ভালোবাসার ধার ধারে না। তারা শুধু নিজেদের ক্ষমতার অক্ষকে মজবুত করতে আগ্রহী। তারা যুদ্ধকে দেখেন সমস্যার সমাধান হিসেবে, যেখানে একজন প্রকৃত মানুষ যুদ্ধকে দেখেন মানব জাতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে। এই নেতৃত্বের কোনো আবেগ নেই, আছে শুধু হিসাব-নিকাশ। গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধকালীন মিথ্যা তথ্যের প্রচার ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক শোষণও ক্ষমতার রাজনীতির একটি নির্মম দিক। কঙ্গোতে মূল্যবান খনিজের জন্য যে সংঘাত চলছে, তাতে স্থানীয়রা দরিদ্র হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) তথ্যমতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শিশুশ্রম ও অবৈধ সম্পদ পাচারের হার বহুগুণ বেশি। এই সম্পদ-লুণ্ঠনকারী অর্থনীতি কেবল অ-মানুষরাই পরিচালনা করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রায়ই ক্ষমতার রাজনীতিতে তীব্র দ্বন্দ্ব দেখা যায়। ভেটো ক্ষমতাধর স্থায়ী সদস্যরা, নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখতে অসংখ্য শান্তি প্রস্তাব আটকে দেয়। এমন প্রবণতা প্রমাণ করে, বিশ্ব শান্তির মঞ্চটিও যখন মানবতার পরিবর্তে ক্ষমতার স্বার্থে পরিচালিত হয়, সেখানে তখন মানবিক নেতৃত্ব অনুপস্থিত থাকে। জাতিগত নিধন হচ্ছে, ক্ষমতার রাজনীতির চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। বসনিয়া, রুয়ান্ডা বা মিয়ানমারে সংঘটিত ঘটনাগুলো স্মরণ করলে বোঝা যায়, কীভাবে ক্ষমতা-লোভী গোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট জাতিকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার চেষ্টা করে। রুয়ান্ডার গণহত্যার নথিপত্র প্রমাণ করে, রাজনৈতিক নেতারা সাধারণ মানুষকে একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। তারা পরিণত হয়েছিল বিদ্বেষ ও ধ্বংসের যন্ত্রে। তবে আশার আলো সম্পূর্ণ নিভে যায়নি।
সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ ও নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা অনেক অমানবিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে ব্যয় হয় দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি (ঝওচজও)। এই অর্থের সামান্য অংশও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা বা চরম দারিদ্র্য দূরীকরণে ব্যবহার করা যেত। ইউনিসেফের তথ্যমতে, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় সামরিক ব্যয় কয়েক হাজার গুণ বেশি। এই পরিসংখ্যানটিই প্রমাণ, নেতৃত্বের আসল লক্ষ্য ক্ষমতা ও আধিপত্যের খেলা। যেকোনো দেশে যুদ্ধকালীন অবস্থা, পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। ইউক্রেনের সংঘাত ভূমি দূষণ ও জলবায়ু ঝুঁকি বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিস্ফোরণের ফলে বায়ুদূষণ চরম আকার ধারণ করে। পরিবেশ রক্ষার মতো বৈশ্বিক বিষয়ও যখন ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বলি হয়, তখন বোঝা যায় যে, এই নেতারা শুধু বর্তমান স্বার্থ নিয়ে চিন্তিত। গণতন্ত্রের দুর্বলতা যুদ্ধকে উৎসাহিত করে। যেখানে গণতন্ত্র দুর্বল, জবাবদিহিতা অনুপস্থিত, সেখানেই ক্ষমতালোভী নেতৃত্ব বিকশিত হয়। ফ্রিডম হাউজ ও ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুসারে, যেসব দেশে গণতান্ত্রিক সূচকে অবনতি হয়েছে, সেখানেই সংঘাতের ঝুঁকি বেড়েছে। যুদ্ধ শুধু সশস্ত্র সংঘাত নয়, এটি মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO ) তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত-কবলিত এলাকায় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে। ক্ষমতার রাজনীতিতে নৈতিকতার আপস প্রধান সমস্যা। শক্তিশালী দেশগুলো অস্ত্র বিক্রি বা সামরিক সহায়তার মাধ্যমে সংঘাত জিইয়ে রাখে।
অস্ত্র ব্যবসায় শত শত বিলিয়ন ডলার লেনদেন হয়। যখন মুনাফার লোভ মানবিক জীবনের চেয়ে বড়, তখন নেতৃত্ব অমানুষের হাতেই থাকে। গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের (GPI)রিপোর্টগুলো দেখায়, গত এক দশকে বিশ্বের সামগ্রিক শান্তির স্তর নিম্নগামী হয়েছে। এই প্রবণতা সেই অমানুষের নেতৃত্বের ফসল, যারা স্বল্পমেয়াদি সামরিক বিজয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়। ক্ষমতার রাজনীতিতে ঐতিহাসিক ভুল স্বীকারের মানসিকতা একেবারেই অনুপস্থিত। বর্তমানের অমানবিক নেতৃত্ব ভুল স্বীকারকে দুর্বলতা মনে করে, যা সংঘাতের চক্রকে সচল রাখে। শান্তি প্রক্রিয়াগুলোর ব্যর্থতার অন্যতম কারণ, সেগুলোয় শুধু ক্ষমতাসীনদের অংশগ্রহণ থাকে সাধারণ মানুষের নয়। গবেষণায় দেখা গেছে. যে শান্তি চুক্তিগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি থাকে, সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ বেশি। মানবিক অর্থনীতির উত্থান হলো শান্তির নতুন পথ, যেখানে মুনাফার চেয়ে মানুষ ও পরিবেশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ক্ষুধা ও দারিদ্র্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা ক্ষমতা-রাজনীতির জঘন্য দিক। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। শক্তির ভারসাম্য রক্ষার নামে ক্ষমতা-রাজনীতি আসলে অস্থিরতা তৈরি করে। এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কোনো স্থিতিশীলতা আনে না, বরং বিশ্বকে আরও অনিরাপদ করে তোলে। সংঘাতের প্রভাবে জাতিগত পরিচয় ও সংস্কৃতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে বহু প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থান ধ্বংস হয়। এই সাংস্কৃতিক নির্মূল (Cultural Erasure) হলো ক্ষমতা-রাজনীতির কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সংঘাতকবলিত অঞ্চলের সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বনেতৃত্বকে অবশ্যই মৌলিক মানবীয় অঙ্গীকার ফিরিয়ে আনতে হবে। সুতরাং যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই এ আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য প্রয়োজন, বিশ্বব্যাপী একটি নৈতিক বিপ্লব (Moral Revolution)। মানুষ হওয়ার অর্থ, কল্যাণকে রাজনীতিমুক্ত করা এবং মানুষকে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, জবাবদিহিতা এবং সামরিক শক্তির চেয়ে মানবিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়া। একমাত্র মানুষের প্রেম, মানুষের কল্যাণ পৃথিবী থেকে যুদ্ধের উন্মত্ততাকে চিরদিনের জন্য মুছে দিতে পারে।
লেখক : সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড
Wantora00111@gmail.com