ফার্মেসির অবাধ্যতার নেপথ্যে কারা?  

সরকারের কঠোর ভূমিকা রয়েছে ওষুধের দোকান এবং কর্মচারীর যোগ্যতার বিষয়ে। বিভিন্ন দেশে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোরভাবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। কারণ বিষয়টি মানুষের জীবন এবং সুস্থতার সঙ্গে জড়িত। আর আমাদের দেশের রাজধানীসহ দেশ জুড়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। প্রতিটি সেক্টরে এত অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা কোন সরকারের পক্ষে দমন করা পুরোপুরি সম্ভব, আমরা জানি না। যেখানে অধিকাংশ মানুষই অন্য রকম, সেখানে দলীয় সরকার কোন নিয়মে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে, তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের কথা ভিন্ন। আমরা বিশ্বাস করি, তারা কোনো দল বা গোষ্ঠীর কাছে দায়বদ্ধ নন। ফলে দেশের অনিয়মগুলো ঠিকমতো বিশ্লেষণ করে অপরাধীকে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করা উচিত। কয়েকটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলেই পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। আমাদের দেশে, সরকারি হিসাবে প্রায় সোয়া দুই লাখ ফার্মেসি রয়েছে। তবে বেসরকারি হিসাবে ফার্মেসির সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। বেশিরভাগ ফার্মেসি নজরদারির বাইরে। এগুলোতে বিক্রি হয় অনুমোদনহীন ওষুধ। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশে রয়েছে কঠোর ফার্মেসি আইন। তারা ওষুধ প্রশাসন, বিতরণ ও ব্যবহারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করছে। সরকার সাধারণত ফার্মেসি কাউন্সিল বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যা লাইসেন্স প্রদান, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিমালা তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধের উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ, বিক্রয় এবং ফার্মাসিস্টদের পেশাগত মান নিয়ন্ত্রণ করা, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের ওষুধের দোকানে বিভিন্ন ধরনের মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ বিক্রি, লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা, অনুমোদনহীন সরকারি ওষুধ ও স্যাম্পল বিক্রি হচ্ছে দেদার। এজন্য আইন লঙ্ঘনের দায়ে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল এবং অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর আইন রয়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে যা হচ্ছে, তা লোকদেখানো। একপক্ষ বলছে জনবল সংকট। অন্যপক্ষ বলছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক ব্যক্তি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। না হলে ফার্মেসিগুলো অবাধ ওষুধ বিক্রির সুযোগ পেত না। আর মফস্বলের ওষুধের দোকানগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। এসব তদারকির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। মফস্বলের দোকানগুলোতে ওষুধ প্রশাসনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, শুধু ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে অনেকে ফার্মেসি দিয়ে বসে পড়েছেন ওষুধ বিক্রির জন্য। এসব ফার্মেসি চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, নিষিদ্ধ বড়ি ও নিম্নমানের নানা ধরনের ওষুধ বিক্রি করছে অবাধে। এ ছাড়া নেই কোনো প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট। ফলে রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে রোগীরা। এতে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছেন অনেক রোগী ও তাদের পরিবার-পরিজন।

প্রায়ই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কোটি কোটি টাকার অনিবন্ধিত ওষুধ জব্দ করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এর ফলে আন-রেজিস্টার্ড, ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের ওষুধ ধরা পড়ে।  এতে কি তাদের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে? ১০ থেকে ১৫ বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া ওষুধের দোকান চালু রয়েছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। দেশের অনেক উপজেলায় ওষুধ বিক্রি হয় মুদি দোকানের মতো। এমনকি কিছু কিছু ফার্মেসিতে দেখা যায়, চাল, ডাল, আটা-ময়দাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। ওষুধ প্রশাসন কর্তৃক ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা নীতিমালার কোনো তোয়াক্কা করছেন না বিক্রেতারা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী, ফার্মাসিস্টদের ৫৫ শতাংশ কমিউনিটি ফার্মেসি, ৩০ শতাংশ হসপিটাল ফার্মেসি, ৫ শতাংশ ম্যানুফ্যাকচারিং, ৫ শতাংশ সরকারি সংস্থা ও ৫ শতাংশ একাডেমিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে কমিউনিটি কিংবা হসপিটাল ফার্মেসিতে কোনো গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নেই। কারণ, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা ফার্মেসিতে কাজ করতে আগ্রহী হন না। অনিয়ম বন্ধ করতে সরকার আদৌ কতটুকু আন্তরিক, সেটি আমরা পরিস্থিতি বিবেচনা করে টের পাই। তবে মানুষের জীবন বাঁচাতে সরকারকে কঠোর হতেই হবে। কারণ সুস্থ মানুষ না থাকলে, সরকার বা রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি কী প্রমাণ করে! ফার্মেসিগুলোর অবাধ্যতার নেপথ্যে কারা?