আরও একটি সমস্যায় পড়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরেই তারা কঙ্গোসহ বিভিন্ন দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিরলসভাবে কাজ করছে। কিন্তু জাতিসংঘের ব্যয় কমানোর খাঁড়ার ঘা পড়েছে পুলিশের ওপর। শান্তিরক্ষা মিশন থেকে পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করতে চিঠি পাঠানো হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে। আগামী সপ্তাহেই ১৮০ জন পুলিশ সদস্যের দেশে ফেরত আসার কথা। পরে আরও সদস্যের দেশে ফেরত আসার শঙ্কা রয়েছে। এক চিঠিতেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবলদের মধ্যে। এ নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা কয়েক দফা জরুরি বৈঠক করেছেন। জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে সরকারকে চিঠি দেওয়া হবে বলে পুলিশসূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, পুলিশের পাশাপাশি অন্য বাহিনীর সদস্যদেরও প্রত্যাহার করার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় সদস্যদের বিষয়ে অন্য বাহিনীতেও জাতিসংঘ চিঠি পাঠাতে পারে। আগাম কূটনৈতিক তৎপরতা না চালালে বাংলাদেশকে মাশুল গুনতে হবে বলে মনে করছেন অনেকেই। জাতিসংঘ কঙ্গোতে বাংলাদেশের পুলিশ মিশনকে ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করে ফেলেছে। পুলিশের অভিযোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা না থাকায় মাত্র ৫০ দিন আগে কঙ্গোতে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১৮০ সদস্যকে দেশে ফেরত আসতে হচ্ছে। অথচ অন্য দেশের কন্টিনজেন্ট থেকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ সদস্য কমানো হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের একশ শতাংশ সদস্যকেই প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এতে পুলিশে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পাশাপাশি ক্ষোভও দেখা দিয়েছে।
কঙ্গোর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের ফরমড পুলিশ ইউনিট (এফপিইউ) চলতি বছরের ২৬ আগস্ট দেশ ছেড়েছিল। ১৮০ জনের মধ্যে ৭০ জনই নারী সদস্য। এটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে একমাত্র নারী কন্টিনজেন্ট ছিল। আগামী বছরের আগস্টে দায়িত্ব শেষ করে দেশে আসার কথা তাদের। কিন্তু তার আগেই দেশে আসতে হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর এই টিমের প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
৫ হাজার ৬৯৬ জন সদস্য বর্তমানে কর্মরত : পুলিশসূত্র জানায়, চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দশটি দেশে শান্তিরক্ষী হিসেবে পুলিশের চারশ ৪৪ নারীসহ ৫ হাজার ৬৯৬ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৫-২০২৬ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের পেছনে বাজেট ধরেছে ৫৪০ কোটি ডলার। তারমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়ার কথা ছিল ১শ ৩০ কোটি ডলার। ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, তারা ৬৮ কোটি ২০ লাখ ডলার দেবে। তারপরই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী কাটছাঁট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের যাত্রা শুরু হয় নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে। পুলিশের এফপিইউ ২০০৫ সাল থেকে এবং নারী কন্টিনজেন্ট ২০১১ সাল থেকে কঙ্গোতে দায়িত্ব পালন করছে।
২১৪৪৪ জন সদস্যের দায়িত্ব পালন : ২৩টি জাতিসংঘ মিশনে ২১ হাজার ৪৪৪ জন সদস্য শান্তিরক্ষা মিশনে দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২৪ জন পুলিশ সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। জাতিসংঘ ৯টি শান্তিরক্ষী মিশনে আগামী কয়েক মাসে শান্তিরক্ষীর সংখ্যা প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২৫ শতাংশ শান্তিরক্ষী সৈন্য ও পুলিশকে তাদের সরঞ্জামসহ প্রত্যাহার করা হবে। মিশনে কাজ করা অনেক বেসামরিক কর্মীও বাদ পড়ার আওতায় রয়েছেন। ১৩ থেকে ১৪ হাজার সৈন্য ও পুলিশ এবং বেসামরিক ছাঁটাইয়ের আওতায় পড়ছে। শুরুতেই ছাঁটাইয়ের তালিকায় পড়ে গেছে বাংলাদেশ। কঙ্গোতে ফরমড পুলিশ ইউনিটে মোট সদস্য আছেন ১ হাজার ৫০ জন। কমানো হয়েছে ১৮০ জন, যার পুরোটাই বাংলাদেশের।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সার্বিক বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। কূটনৈতিকভাবে আমরা এগুনোর চেষ্টা করছি। সরকারও চেষ্টা করছে।’
টিম লিডারের আবেগপ্রবণ স্ট্যাটাস : কঙ্গোতে অবস্থান করা কনটিনজেন্টের নেতৃত্বে রয়েছেন পুলিশ সুপার জান্নাত আফরোজ। তিনি তার ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে চুপ থেকে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়ার শিক্ষা আমি আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছি। ... আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। বাংলাদেশ পুলিশের জাতিসংঘ মিশনের লাস্ট রোটেশন আমরা। খুব অল্প সময়েই শেষ হয়ে গেল এই রোটেশন। আমরা ১৮০ জনই ছিলাম রোটেশন শেষ করার স্বপ্ন নিয়ে। প্রস্তুতিও ছিল। বাট, সবার ওপরে আল্লাহর ইচ্ছা... আজ সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ টাইম রাত ১১টায় (১৪ অক্টোবর) আমাদের অপারেশনাল অ্যাক্টিভিটি শেষ। ... এটি আমার টোটাল কনটিনজেন্টের জন্য বেশ কষ্টের। ছয় মাস ট্রেনিং করে দেড় মাসের মাথায় ব্যাক করাটা কষ্টের আসলেই। তবে ওদের সঙ্গে আমি রেগুলার রোল কলে যাচ্ছি। ওরা প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠেছে। আমি তো টিম লিডার। আমাকে নিজের কষ্ট চাপা দিয়েই বাকিদের ওয়েলফেয়ার নিয়ে ভাবতে হবে। ... একসঙ্গে এসেছিলাম, একসঙ্গেই চলে যাব। আমার ধারণা, দেশে গিয়ে নিজের বাচ্চা বা জামাই বা মা-বাবার মুখ দেখলে এদের মন ভালো হয়ে যাবে।’
পুলিশের বৈঠকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা : পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত এক উপ-মহাপরিদর্শক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের প্রতিটি সদস্যের স্বপ্ন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়া। হঠাৎ করেই পুলিশ সদস্যদের দেশে ফেরত আসা নিয়ে আমাদের মাঝে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে জরুরি বৈঠক হয়েছে গত দুইদিন ধরে। সবাই বিষয়টি নিয়ে হতবাক। আমরা এ নিয়ে প্রস্তুতই ছিলাম না। বৈঠকে বলা হয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে সরকারের শীর্ষমহলকে চিঠি দিয়ে আমাদের উদ্বেগের বিষয়টি জানানো হবে। সরকার কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলা করলে পুলিশ সদস্যদের হয়তো ফেরত আসতে হবে না।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ আছে মহাসমস্যায়।’
প্যারেড পুলিশের ওপর আস্থা দূতের : সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দপ্তরে ঊর্ধ্বতনদের বৈঠকে জানানো হয়েছে, কঙ্গোতে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, সেনেগাল ও মিসরের পুলিশ কন্টিনজেন্ট আছে। ওইসব দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আন্তঃসম্পর্কের কারণে তাদের কন্টিনজেন্টকে প্রত্যাবাসনের সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। বাংলাদেশের দুর্বল কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে পুলিশকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিশনে পুলিশের নারী সদস্যরা অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছিলেন। ২৫ শতাংশ হারে কমালে আমাদের বড়জোর ৩০ জনের মতো কমত। কিন্তু পুরো টিমকেই তারা চলে আসার চিঠি দিয়ে বসেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বৈঠকে আলোচনা করেছি। জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের জন্য ‘গুরুতর আঘাত’ হিসেবে দেখছেন সবাই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কঙ্গোতে জাতিসংঘ মিশনের পুলিশ কমিশনার আমাদের ইউনিট কমান্ডারকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন। এখনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাইনি। তবে সিদ্ধান্তটি বেশ হতাশাজনক।’