পলাতক ৫৩ বন্দি দুশ্চিন্তার কারণ

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:১২ এএম

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র শাকিল মাদবরকে (১৫) ২০২০ সালের ২৫ জুন অপহরণের পর হত্যা করে একই এলাকার সাকিব বাবু (২৩)। ওই ঘটনাপ্রসূত মামলার রায়ে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয় আদালত। এরপর থেকে কাশিমপুর কারাগারে বন্দি ছিল সাকিব।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ৬ আগস্ট কারাগার থেকে পালিয়ে যায় সাকিব। কারা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনাবাড়ী থানায় মামলা করে। সম্প্রতি অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) রাজধানীর তেজগাঁও থেকে সাকিবকে গ্রেপ্তার করেছে এবং কারা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক ঘটনাবলিতে সাকিবের মতো দেশের পাঁচ কারাগার থেকে দুই হাজার ২৪৭ বন্দি পালিয়েছে। পলাতক এক হাজার ৫৫০ বন্দিকে বিভিন্ন সময়ে কারাগারে ফিরিয়ে আনা (কেউ আত্মসমর্থন করেছে, কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে) সম্ভব হয়েছে। ফিরিয়ে আনাদের এক হাজার ৩০০ জনের জামিন হয়েছে। এখনো ৬৯৭ বন্দি পলাতক রয়েছে।

ওই সময়ে নরসিংদী কারাগার থেকে খোয়া যাওয়া চাইনিজ রাইফেল, শটগানসহ ৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ওই সময় ৯৯ জন বিশেষ বন্দি (জঙ্গি, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত, সাজাপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্য) পালিয়ে গেছে। তাদের ৪৬ জনকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। এখনো পলাতক ৫৩ বন্দির ছয়জন জঙ্গি, চারজন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্য এবং ৪৩ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত।

তাদের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে কারা অধিদপ্তর। দুর্ধর্ষ এ বন্দিরা বাইরে থেকে নানা ধরনের অপরাধ করতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ হতে পারে, এমন শঙ্কা করছে কারা অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কারা অধিদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে ৫৩ জন ঝুঁঁকিপূর্ণ। তাদের ছয়জন জঙ্গি, বাকিরা মৃত্যুদ-প্রাপ্ত। এ ছাড়া কারাগার থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। ফলে নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে। তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটাতে পারবে না তারা। কারণ পলাতক বন্দিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত আছে।’

কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের আগে ও পরে দেশের পাঁচ কারাগারে চরম বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহের পরিস্থিতিতে দুই হাজার ২৪৭ বন্দি পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার সময় বন্দিরা এবং বাইরে থেকে হামলাকারীরা কারাগারের অফিসের অনলাইন সিস্টেম ব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলে। পুড়িয়ে দেয় নথিপত্রও। ফলে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের নাম, ঠিকানা, কোন মামলায় সাজা হয়েছিল, সেসব তথ্য গায়েব হয়ে যায়। তবে পালিয়ে যাওয়া বন্দির সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছে সংশ্লিষ্ট কারাগার। ওই ঘটনায় মোট ছয়টি মামলা করেছিল সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষ। বন্দি পালানোর ঘটনায় একটি করে মোট পাঁচটি, আর নরসিংদী কারাগার থেকে আগ্নেয়াস্ত্র লুটের ঘটনায় আরও একটি মামলা করা হয়। ঘটনার পর প্রশাসন ঘোষণা করে, যারা আত্মসমর্পণ করবে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে না। এতে অনেকে আত্মসমর্পণ করেছে। অনেককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই হাজার হাজার লোক ফটক ভেঙে নরসিংদী জেলা কারাগারে ঢুকে পড়ে। তারা সেল ভেঙে কয়েদিদের পালাতে সাহায্য করে। কারারক্ষীদের কাছ থেকে চাবি নিয়ে সেলের তালাও খোলা হয়। হামলা ও অগ্নিসংসোগে কারাগার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এখনো অফিস কক্ষ, কনডেমড সেল, রান্নাঘর, খোলা চত্বরে তা-বের চিহ্ন রয়ে গেছে। দরজা-জানালা, দেওয়ালে দেওয়ালে পোড়া চিহ্ন।

নরসিংদী কারাগার থেকে ৯ জঙ্গিসহ ৮২৬ বন্দি পালিয়ে যায়। চাইনিজ রাইফেল, শটগানসহ ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট করা হয়। বন্দিরা পালিয়ে যাওয়ার সময় অফিসের অনলাইন সিস্টেম ব্যবস্থা ধ্বংস করে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় নথিপত্র। লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৪৩টি উদ্ধার করা হয়েছে। আরও কিছু আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। সেগুলো আলামত হিসেবে আদালতে রয়েছে।

কারাগারটির সুপারিন্টেন্ডেন্ট মো. তারেক কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১৬৭ বন্দি পলাতক। অফিসের অনলাইন সিস্টেম ব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলায় পলাতকদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই।’

নরসিংদী জেলার পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ্-আল ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জঙ্গিসহ পলাতক বেশ কিছু বন্দিকে আমরা গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করেছি। বাকিদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। সোর্স ও প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পালানোর ঘটনার পর নরসিংদী কারাগারের বন্দিদের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে।’

৫ আগস্ট দুপুরের দিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সন্ধ্যায় দুর্বৃত্তরা প্রধান ফটক ভেঙে নরসিংদী কারাগারে ঢুকে পড়ে। তারা কারাগারের গুদাম ভবনে আগুন লাগিয়ে দেয়। বন্দিদের ফাইলপত্র নষ্ট করে। হুড়োহুড়ি করে পালাতে গিয়ে ছয় বন্দি মারা যায়। ওই কারাগার থেকে ২০২ বন্দি পালিয়ে যায়। পলাতকদের অধিকাংশ জঙ্গিবাদ-সংশ্লিষ্টতায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে ছিল। ৭০ বন্দিকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।

কারাগারটির জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নরসিংদী কারাগারে হামলার পর জঙ্গি, ফাঁসির আসামিদের হাইসিকিউরিটি কারাগারে নিয়ে রাখা হয়েছে। ৫ আগস্ট তারাই বিদ্রোহ সৃষ্টি করে এবং অর্ধেকের বেশি বন্দি পালিয়ে যায়। এখনো ১৩৭ বন্দি পলাতক রয়েছে।’

৫ আগস্ট বিকেলে দুর্বৃত্তরা শেরপুর জেলা কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে। ওই সুযোগে ৫১৮ বন্দি পালিয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা ওই কারাগার থেকে ৯টি আগ্নেয়াস্ত্র (৫ চাইনিজ রাইফেল ও ৪টি শটগান) লুট করে।

কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার মুহাম্মদ আবদুস সেলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১৭২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এখনো পলাতক ৩৪৬ বন্দি। লুট হওয়া ৯টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং এক হাজার ১৭৫টি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার সময় এক কারারক্ষী বন্দিদের তথ্যসংবলিত একটি ব্যাকআপ কম্পিউটার কৌশলে ফিরিয়ে আনেন। ফলে যারা পালিয়েছে, তাদের নাম-ঠিকানা রয়ে গেছে। সে তথ্য র‌্যাব-পুলিশকে দেওয়া হয়েছে।’

৫ আগস্ট সন্ধ্যায় কয়েকশ দুর্বৃত্ত সাতক্ষীরা কারাগারের সীমানাপ্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা প্রধান ফটকের তালা ভেঙে কারাগারে ঢুকে ৫৯৬ বন্দিকে বের করে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫২৯ বন্দি আত্মসমর্পণ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী পালিয়ে যাওয়া ২৩ বন্দিকে গ্রেপ্তার করেছে। দুই নারীসহ ৪৪ বন্দি এখনো পলাতক।

গণ-অভ্যুত্থানের দুদিন পর ৭ আগস্ট দুপুরে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের ভেতর বন্দিরা বিদ্রোহ করে। একপর্যায়ে কারারক্ষীদের ওপর হামলা চালিয়ে ৯৮ বন্দি পালিয়ে যায়। ওই কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আবদুর রহিম জানান, ‘ইতিমধ্যে ৭২ বন্দি আত্মসমর্পণ করেছে। ৯ বন্দিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ১৭ বন্দি পলাতক রয়েছে।’

কারা অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার ধারণা পলাতক বন্দিদের অধিকাংশই দেশের বাইরে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। আর যারা দেশেই আছে, তারা অপরাধ সংঘটিত করতে পারে।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু পলাতক বন্দিকে গ্রেপ্তার করে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছি। বাকি পলাতকদের অবস্থান শনাক্ত করণ ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আমাদের গোয়েন্দারাও কাজ করছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত