দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। এ সত্য প্রতিটি মানুষ জানে, কিন্তু খুব কমই তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করে। আমরা প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠি, কাজ করি, হাসি, কাঁদি, খাই, ঘুমাই এবং জীবনের এই চক্রের মধ্যেই হারিয়ে যাই। অথচ পুরো সময়টাই আসলে একটি পরীক্ষা। আল্লাহতায়ালা মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন যেন সে প্রমাণ করতে পারে, কে ভালো কাজ করে, কে আল্লাহভীতি অবলম্বনে জীবনযাপন করে, আর কে অবাধ্যতার পথ বেছে নেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কে উত্তম কাজ করে।’ (সুরা মুলক, আয়াত ২) এই আয়াতই দুনিয়ার প্রকৃত পরিচয়কে পরিষ্কার করে দেয় যে, এ পৃথিবী এক বিশাল পরীক্ষাগার, আর মানুষ পরীক্ষার্থী। দুনিয়ার জীবন যতই সুন্দর, সমৃদ্ধ বা আরামদায়ক হোক, এর মেয়াদ সীমিত। কেউ আশি বছর, কেউ কম-বেশি বাঁচে। কিন্তু একদিন না একদিন শেষ ডাক আসবেই। তখন কেউ এক মুহূর্ত সময়ও বাড়াতে পারবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে, আর তোমাদের কিয়ামতের দিনই পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে।’ (সুরা আলে ইমরান ১৮৫)।
দুনিয়ার জীবনে মানুষকে দেওয়া হয়েছে স্বাধীন ইচ্ছা। সে চাইলে সৎ হতে পারে, চাইলে অন্যায় পথে হাঁটতে পারে। কিন্তু এই স্বাধীনতাই আসলে পরীক্ষার অংশ। যেমন কোনো পরীক্ষায় শিক্ষার্থীকে স্বাধীনভাবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, কিন্তু ফলাফল নির্ভর করে তার উত্তরের ওপর, তেমনি মানুষ দুনিয়ার এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে কি না, তা নির্ভর করছে তার কাজের ওপর। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়া হলো মুমিনের কারাগার ও কাফেরের জান্নাত।’ (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ মুমিনের জন্য দুনিয়া এমন এক জায়গা, যেখানে সে নিজের খেয়াল-খুশি দমন করে, আল্লাহর বিধান মেনে চলে, ইবাদত করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে। আর কাফেরের জন্য এই দুনিয়াই সবকিছু। তার সুখ, আনন্দ, কামনা-বাসনা এখানেই সীমাবদ্ধ। পরকালে তার আর কোনো সুখ নেই। মানুষ দুনিয়ায় যা কিছু করে, তার প্রতিটি কাজের হিসাব লেখা হচ্ছে। মানুষ ভাবতে পারে, তার ছোটখাটো কাজ কেউ দেখছে না। কিন্তু কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে, আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সে তাও দেখতে পাবে।’ (সুরা যিলযাল ৭-৮)। এর মানে, কোনো কাজই বৃথা নয়। একদিন সবকিছুর জবাবদিহি করতে হবে।
হাশরের ময়দানে সবাই নিজেদের আমলনামা হাতে পাবে। কেউ ডান হাতে পাবে, যারা জান্নাতের বাসিন্দা হবে। আবার কেউ বাম হাতে পাবে, যাদের জন্য অপেক্ষা করবে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি। সেই দিনের ভয়াবহতা এতটাই প্রবল হবে যে, পিতা নিজের সন্তানকে ভুলে যাবে, ভাই ভাইকে চিনবে না। প্রত্যেকেই নিজের আমলের পরিণতি নিয়ে আতঙ্কে থাকবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সেই দিনে মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাই থেকে, তার মা ও পিতা থেকে, তার স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে। প্রত্যেকেরই সেদিন নিজের জন্য যথেষ্ট ব্যস্ততা থাকবে।’ (সুরা আবাসা ৩৪-৩৭)। দুনিয়া চমৎকারভাবে সাজানো। এর রূপ-লাবণ্য, ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও সুখ-ভোগ মানুষকে মুগ্ধ করে রাখে। কিন্তু এগুলো সবই ক্ষণস্থায়ী। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘দুনিয়ার জীবন কেবল খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদের। আর আখেরাতই হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত।’ (সুরা আনকাবুত ৬৪) মানুষ এই বাস্তবতা ভুলে গিয়ে দুনিয়াকেই সব মনে করে। অথচ এই পৃথিবীর আনন্দ সামান্য, এর কষ্টও সামান্য। কিন্তু আখেরাতের সুখ বা দুঃখ চিরস্থায়ী। একজন মুমিন দুনিয়াকে কখনো স্থায়ী নিবাস হিসেবে দেখে না। সে জানে, এটি এক অস্থায়ী আশ্রয়, যেখানে সে অতিথি মাত্র। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ায় এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন মুসাফির।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিস মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, আমরা এখানে চিরস্থায়ী নই, বরং আমাদের গন্তব্য পরকাল। একজন সত্যিকারের মুমিন তাই দুনিয়ার কাজ করে, কিন্তু আখেরাতের কথা ভুলে যায় না। সে জানে, ভালো কাজের প্রতিদান শুধু এই দুনিয়ায় নয়, বরং পরকালে আরও বড়ভাবে পাওয়া যাবে। তার চোখে দুনিয়া হলো পরীক্ষার হলরুম, যেখানে ভালো কাজই হলো উত্তীর্ণ হওয়ার উত্তরপত্র।
আখেরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া মানে হলো আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, সৎকাজ করা। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ, দান-খয়রাত, এসব শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এগুলো মানুষকে শুদ্ধ করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তি জোগায় এবং আল্লাহর নৈকট্য এনে দেয়। মানুষ যদি দুনিয়ার জীবনে অন্যকে কষ্ট দেয়, মিথ্যা বলে, অন্যায় করে, জুলুম করে, তাহলে সেই অন্যায়গুলো একদিন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ায় যাকে তুমি অপমান করেছ, তার কাছ থেকে আখেরাতে ন্যায়বিচার নেওয়া হবে, এমনকি গরুর শিং-ওয়ালা গরু থেকে শিং ছাড়া গরুর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।’ (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ আল্লাহর আদালতে কিছুই অগোচর নয়। যে ব্যক্তি দুনিয়াকে পরীক্ষার স্থান হিসেবে মেনে নেয়, সে জানে, এখানে সুখ-দুঃখ দুটোই পরীক্ষার অংশ। সুখে আল্লাহকে স্মরণ করে কৃতজ্ঞ থাকা, আর দুঃখে ধৈর্যধারণ করা, এটাই সফলতার চাবিকাঠি। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘মুমিনের সব অবস্থাই আশ্চর্যজনক, তার প্রতিটি অবস্থা তার জন্য কল্যাণকর। যদি সে সুখে থাকে, কৃতজ্ঞ হয়, তা তার জন্য ভালো। যদি কষ্টে থাকে, ধৈর্যধারণ করে, তাও তার জন্য ভালো।’ (সহিহ মুসলিম)। দুনিয়ায় প্রতিদিন আমরা পরীক্ষা দিচ্ছি। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি কাজ, এমনকি প্রতিটি চিন্তাও এই পরীক্ষার অংশ। একদিন ফলাফল ঘোষণা হবে, যেদিন কেউ কারও উপকারে আসবে না, ধন-সম্পদ কোনো কাজে লাগবে না, শুধু ইমান ও নেক আমলই হবে মুক্তির মাধ্যম। তাই এখনই আমাদের উচিত নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়া। ইবাদতে মন দেওয়া, গুনাহ থেকে দূরে থাকা, অন্যের হক আদায় করা, সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকা। আল্লাহতায়ালা যেন আমাদের সবাইকে দুনিয়ার এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
muftimahbub503@gmail.com