বোমা ফাটানোর মতো একটা কাজ করে বসেছেন তারিক কাজী। ফিনল্যান্ডপ্রবাসী এই সেন্টারব্যাক শুক্রবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে জানিয়ে দিয়েছেন বসুন্ধরা কিংসের সঙ্গে ৬ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা। বেতন বকেয়ার কারণে ক্লাবটির সঙ্গে চুক্তি ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে চিঠিতে দাবি করেছেন জাতীয় দলের এ ডিফেন্ডার।
বকেয়া বেতন নিয়ে ক্লাবের সঙ্গে চাপান উতোরটা চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ফুটবল ক্লাবগুলো ভীষণভাবে আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বসুন্ধরা কিংসও এর ব্যতিক্রম নয়। এর আগে একাধিক বিদেশি ফুটবলার ও কোচ বকেয়া বেতন না পেয়ে ফিফার কাছে নালিশ করেছিলেন। ফিফাও বসুন্ধরা কিংসকে ট্রান্সফার ব্যান্ড দিয়েছে মাস দুই আগে। এ সংকটের মধ্যেও চলতি মৌসুমে সেরা দল গড়ে বসুন্ধরা চাচ্ছে ঘরোয়া শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পেতে। বর্তমানে বসুন্ধরা কিংস এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের গ্রুপ পর্বের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে তারিক কাজীর এ সিদ্ধান্ত দলটিকে ভালোই সমস্যা ফেলবে।
১৪ অক্টোবর এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের ম্যাচে তারিকের ভুলে স্বাগতিক হংকংয়ের বিপক্ষে শুরুতে পিছিয়ে পড়েছিল। নিখুঁত ডিফেন্ডিংয়ের কারণে ক্লাব ও জাতীয় দলে প্রতিষ্ঠা পাওয়া তারিক সেদিন শিশুতোষ ভুলে হংকংকে পেনাল্টি উপহার দেন। এছাড়া গেল কয়েকদিন ধরেই তারিককে আগের মতো আত্মবিশ্বাসী রূপে দেখা যাচ্ছে না। এসব কিছুর পেছনে যে বেতন নিয়ে সংকটা অনেকাংশে দায়ী তা পরিষ্কার হয়েছে তারিকের পোস্টে। শুক্রবার সন্ধায় বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় নিজের ঘোষণা ফেসবুক পেইজে পোস্ট করেন তারিক। সেখানে লেখেন, ‘আজ আমি বকেয়া বেতন পরিশোধ না হওয়ার কারণে আইনগতভাবে আমার চুক্তি বাতিল করেছি বসুন্ধরা কিংসের সঙ্গে। একজন ফুটবলারের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নীরবতা বহন করা প্রচ- বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি অনিয়মিত ও বিলম্বিত বেতন পরিশোধের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। অনিশ্চয়তার এমন এক সময়, যা আমাকে শুধু একজন পেশাদার হিসেবেই নয়, একজন মানুষ হিসেবেও পরীক্ষা নিয়েছে। এটি শুধু আর্থিক কষ্ট ছিল না; এটি ছিল এক মানসিক চাপ, যা প্রকৃত পেশাদাররা নিঃশব্দে বহন করে। তবুও প্রতিদিন আমি একই ভালোবাসা নিয়ে জেগে উঠেছি, মাঠে সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি, আর অন্তরে লড়েছি এক নীরব যুদ্ধ; ভালোবাসা ও অবিচারের মধ্যে।’
ঘোষণাপত্রে কিংসের বর্তমান ও সাবেক কোচ ও সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তারিক, ‘গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই আমার সতীর্থদের। এছাড়া অস্কার ব্রুজন, ভ্যালেরিউ তিতা এবং মারিও গোমেজসহ পুরো টেকনিক্যাল স্টাফকে, যারা নিরলস পরিশ্রম করেছেন, এবং সেই সমর্থকদের, যাদের কণ্ঠ আমাকে শক্তি দিয়েছে যখন সবকিছু অনিশ্চিত মনে হয়েছে। আমি বাংলাদেশ জাতীয় দলকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই। যখনই আমি লাল-সবুজ জার্সি পরে মাঠে নেমেছি, সেটি আমার কাছে ছিল পরিত্র এক অনুভূতি। সেই মুহূর্তগুলোতে আমি সব কষ্ট ভুলে গিয়েছি কারণ বাংলাদেশের হয়ে খেলা আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, ফুটবল এখনো কতটা পবিত্র।’
কিংসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের সিদ্ধান্তটা ঠা-া মাথায় ভেবেচিন্তে নেওয়া দাবি উল্লেখ করে তারিক লেখেন, ‘এ বিদায় কোনো রাগ থেকে নয়। বরং সত্য, মর্যাদা ও কৃতজ্ঞতা থেকে। আমি গর্বিত গত ৬ বছর বসুন্ধরা কিংসের জার্সিতে প্রতিটি ঘামের ফোঁটার জন্য, প্রতিটি লড়াইয়ের জন্য, প্রতিটি ট্যাকলের জন্য। আমি বসুন্ধরা কিংস ছেড়ে যাচ্ছি গর্ব নিয়ে, কোনো কষ্ট নিয়ে নয়। পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমার হৃদয় ভরপুর থাকবে সেই বিশেষ মুহূর্তগুলোতে, যা আমি সারা জীবন মনে রাখব। আমার গল্প এখানেই শেষ নয়। এটি কেবল নতুন অধ্যায়ের শুরু।
ফিফায় নালিশ না করে হংকংয়ের বিপক্ষে হোম ম্যাচের আগে ক্লাবকে বেতন পরিশোধের জন্য আইনজীবির মাধ্যমে মেইলে নোটিস পাঠিয়েছিলেন তারিক। একই মেইল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়াল ছাড়াও এক সহ-সভাপতি এবং জাতীয় দলের স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরার কাছে পাঠান। এতে ভীষণ চটেছেন বসুন্ধরা কিংসের কর্তারা।