হারানো জারিগান ধরে রাখার চেষ্টা বীররামপুর চরপাড়া যুব সংঘের 

আধুনিকতায় ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য জারিগান। তবে এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে ময়মনসিংহের ত্রিশালে রামপুর ইউনিয়নের বীররামপুর চরপাড়া যুব সংঘ একটি জারিগান দল গঠন করেছে। এই সময় এসেও দলটি বিশেষ বিশেষ দিনে জারিগানের আসর বসিয়ে গ্রামবাসীর জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করে থাকে। 

সংশ্লিষ্টরা জানায়, এখনও আমন ধান ঘরে তোলার পর ত্রিশাল উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের বীররামপুর গ্রামের পাড়া-মহল্লায় জারি গানের আসর জমে উঠে। জারি গানের আসরে কখনও ঐতিহাসিক কল্পকাহিনি, কখনও সমাজে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার বিবরণ অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। হারমোনিয়াম, তবলা আর ঢোলের তালে তালে মুক্তমঞ্চে চলে জারি গান। এক সময় গ্রামদেশে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল এসব গানের আসর। বর্তমানে গ্রামেগঞ্জে অল্পকিছু চর্চা চালু আছে।

স্থানীয়রা জানায়, আগে শীতে সময় প্রায় প্রতিরাতেই উপজেলার বীর রামপুর চরপাড়া গ্রামে জারি গানের আসরের আয়োজন করা হতো। সে আসরের মাঝখানে দোহারি, বাদক দল, তাদের চারপাশে গোলাকার ফাঁকা জায়গায় হেঁটে, নেচে, গেয়ে, অভিনয়ের দর্শক মাতাতেন শিল্পীরা। ফাঁকা জায়গায় নেচে নেচে গান করতেন বয়াতি। আর দলটির চর্তুদিক থেকে দর্শক তা উপভোগ করতেন। 

স্থানীয় সংবাদকর্মী ও বীর রামপুর চরপাড়া জারিগান দলের সভাপতি নুরুল আমিন বলেন, আগে শীতের রাতে চাদর গায়ে জড়িয়ে রাত জেগে জারি গান, কিচ্ছা, নাটক খুব দেখতাম। এখন এগুলো সচরাচর দেখা যায় না। শীত এলে বিভিন্ন এলাকায় জারি গানের আসর বসতো। এগুলো দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা হারিয়ে যাওয়া এ ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি। তবে আর্থিক সংকটের কারণে এ ঐতিহ্য কত দিন ধরে রাখতে পারব তা জানি না।

বীররামপুর চরপাড়া যুব সংঘ জারিগানের দলের সদস্যরা। ছবি: দেশ রূপান্তর

স্থানীয় যুবক মিনহাজ বলেন, আমরা বড়দের কাছে সবসময় শুনে এসেছি। দেখা হয়নি কখনো। এবার আমাদের এলাকায় জারিগানের আয়োজন করা হয়েছিল। দেখে অনেক ভালো লেগেছে।

সাপ্তাহিক‘ত্রিশাল বার্তা’পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক শামীম আজাদ আনোয়ার বলেন, স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, স্মার্ট ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগের বদলতে দুনিয়া এখন হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমরা এগিয়েছি। কিন্তু প্রযুক্তি হাজার বছরের গ্রামীণ ঐতিহ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এই শিল্পকে ক্ষতি করেছে। বাঙালি সংস্কৃতি চালু রাখতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বীররামপুর চরপাড়া যুব সংঘ জারিগান দলের জারির শিল্পী বুলবুল আহমেদ.বলেন, একটা সময় ছিল যখন শীতের মাসে সিরিয়াল দেওয়া সম্ভব হতো না।। প্রতিদিন আসর বসতো। কিন্তু এখন আর আগের মতো আসর বসে না। আমরা এখন অবসর সময় কাটাই। আমাদের একটা জারি গানের আসরে অনেক খরচ হয়। তাছাড়া অনেক শিল্পী এখন জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন পেশায় চলে গেছে।

জারিগানের গায়ক মোস্তফা কামাল বলেন, আমি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে গত ৩০ বছরে অনেক জারির আসর করেছি। কিন্তু এখন আসর কমে গেছে। মানুষ এখন ইন্টারনেটের ফলে এইগুলার আয়োজন কম করে। এখনকার ছেলেপেলেরা জারি গানের আসর সম্পর্কে জানে না। আমরা কোনো সহযোগিতা পাই না।

জারিগানের আসরের আয়োজক ও বীর রামপুর চরপাড়া জারিগান দলের উপদেষ্টা আনিসুর রহমান হিরো বলেন, গ্রামীণ বিনোদন নতুন প্রজন্মকে সামাজিক সচেতনতার বার্তা দেয়। তাই স্থানীয়দের নিয়ে হারিয়ে যাওয়া জারির আসর পুনরায় ফিরিয়ে আনতে প্রতিবছর এ আয়োজন করা হয়।