৬ লাশ পোড়ানোর মামলা

১৬ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ আজ

আশুলিয়ার লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার চৌদ্দতম দিনের মতো সাক্ষ্যগ্রহণ আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে। এই মামলায় জুলাই-আগস্ট মাসের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ মোট সাতজনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) সাইফুল ইসলামসহ মোট ১৬ জন এই মামলার আসামি।

আজ (২১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বাকি দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আজ দুজন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হবে।

গতকাল সোমবার সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) এনায়েত এবং শহীদ বায়োজিদ বোস্তামীর ভাই কারিমুল সাক্ষ্য দিয়েছেন। এরপর তাদের জেরা করেন পলাতক আট আসামির জন্য নিযুক্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) এবং অন্য আসামিদের আইনজীবীরা। এ পর্যন্ত মামলাটিতে মোট আঠারো জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার ও সাইমুম রেজা তালুকদার।

গত ১৬ অক্টোবর ষোড়শ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক শাখার আলোকচিত্র বিশেষজ্ঞ ওমর ফারুক খান। এর আগের দিন অর্থাৎ ১৫ অক্টোবর মামলাটির একাদশ দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা পর্ব শেষ হয়। ৯ অক্টোবর দশম দিনের শুনানিতে শহীদ ওমর ফারুকের বাবা চান মিয়া সাক্ষ্য দেন। চতুর্দশ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি গত বছরের ৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনাটির বর্ণনা তুলে ধরেন।

৮ অক্টোবর নবম দিনের মতো সাক্ষ্য দেন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মনিরুল ইসলাম, যিনি জব্দ তালিকার সাক্ষী হিসেবে তাঁর জবানবন্দি দেন। এর আগে ৭ অক্টোবর ওই দিনের পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সাক্ষ্য দেন কনস্টেবল রাশেদুল ইসলাম। ২৮ সেপ্টেম্বর সপ্তম দিনের শুনানিতে নবম সাক্ষী একাত্তর টিভির স্থানীয় সাংবাদিক জাহিদুল ইসলাম অনিকের জেরা সমাপ্ত হয়।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর মামলার প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সেই বক্তব্যে তিনি গত বছরের ৫ আগস্ট আশুলিয়ার সেই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেন। গত ২১ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় ষোলো জন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরুর নির্দেশ দেন। সেই সময় আদালতে উপস্থিত আট জন আসামির মধ্যে সাতজনই নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করেন। তবে দোষ স্বীকার করে সহকারী উপ-পরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হক রাজসাক্ষী হতে চেয়েছিলেন এবং তিনি মামলার ব্যাপারে যা জানেন সব তথ্য আদালতের কাছে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। এরপর ট্রাইব্যুনাল তাঁর দোষ স্বীকারের অংশটুকু নথিভুক্ত করেন। পরে লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি রাজসাক্ষী হয়েছেন।

এই মামলায় গ্রেফতার হওয়া আটজন আসামি হলেন: ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, আবজাল এবং কনস্টেবল মুকুল। তবে সাবেক এমপি সাইফুলসহ আরও আটজন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন।

গত ২ জুলাই প্রসিকিউশন মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে অন্যান্য তথ্যসূত্র হিসেবে মোট ৩১৩ পৃষ্ঠা, ৬২ জন সাক্ষীর তালিকা, ১৬৮ পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণাদি এবং দুটি পেনড্রাইভ সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় অভিযুক্ত ষোলো জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গ্রহণ করে।

গত বছরের ৫ আগস্ট সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে ছয়জন তরুণের প্রাণহানি ঘটে। এরপর পুলিশ ভ্যানে তুলে তাদের লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই নৃশংস ঘটনার সময় নিহতদের মধ্যে একজন জীবিত ছিলেন। কিন্তু তাঁকে বাঁচানো হয়নি—পেট্রোল ঢেলে জীবন্ত অবস্থায় তাঁকে পুড়িয়ে মারা হয়। এই জঘন্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি দায়ের করা হয়।