বিভীষিকায় সড়কমৃত্যু রাজনীতিতে গুরুত্বহীন

বাংলাদেশে প্রতিটি ভোর যেন এক অনিশ্চিত শ্বাস নিয়ে শুরু হয়। রাস্তায় হাঁটতে গেলে মনে হয় নিশ্চিন্তে জীবিত বা সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারব না। এ ধরনের আতঙ্ক নিয়ে পথ চলতে হয়। কেউ অফিসে যাচ্ছে, কেউ স্কুলে, কেউ হাসপাতালে, কেউ গাড়ি চালাচ্ছেন। তাদের মধ্যেই কেউ জীবন হারাচ্ছেন দুর্ঘটনায়। অথচ রাজনীতির কোলাহল, ক্ষমতার দৌড়ঝাঁপ, দলের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের চাপে এই মৃত্যু আর্তনাদ সংবাদপত্রের শেষ পাতায় অথবা পরিসংখ্যানের ঠা-া সংখ্যায় হারিয়ে যায়। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ২১ অক্টোবর মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির নেতারা সেমিনার করেছেন। জানা গেছে, বাংলাদেশে গত ১২ বছরে ৬৭,৮৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১,১৬,৭২৬ জন নিহত এবং ১,৬৫,০২১ জন আহত হয়েছেন। প্রতিদিন নিভে যাচ্ছে ২৬টি পরিবার, ভেঙে যাচ্ছে স্বপ্ন, থেমে যাচ্ছে শৈশবের হাসি এবং ধ্বংস হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই বিপর্যয়কে বাস্তবভাবে মোকাবিলা করার পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। দেশে এখন অধিকাংশ ‘সংবাদ’ মানেই রাজনীতিনির্ভর। কে ক্ষমতায়, কে পদ হারাল, কোন জেলায় দলীয় বিবাদ এসব নিয়েই চলে টেলিভিশন টকশো, সংবাদপত্রের লিড নিউজ, অনলাইন পোর্টাল ব্যানার। কিন্তু একই দিন যখন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বা কোনো ছাত্র রাস্তায় নিহত হয়, তখন সেটি প্রকাশিত হয় সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে। এ সমাজ এখন রাজনীতির এমন এক ঘূর্ণিপাকে আবদ্ধ, যেখানে মানুষের মৃত্যু কোনো সংবাদ নয়, বরং সংখ্যা মাত্র। রাষ্ট্র-মিডিয়া যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে এ মৃত্যুর সঙ্গে। কারণ এমন মৃত্যুতে ‘ভোট’ নেই, ‘রেটিং’ নেই, ‘ক্লিক’ নেই তাই কি? যে কারণে সড়কে ঝরে পড়া রক্ত আমাদের আলোড়িত করে না, বরং সংবাদপাঠের অংশ হিসেবে আমরা মেনে নিই।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি সরকারের ভুল নীতিমালাকে দায়ী করেছে এ বিপর্যয়ের জন্য। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা বরাবরই ছিল অবহেলার শিকার। যানবাহনের ফিটনেস যাচাইয়ের ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর, লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া অনিয়মে ভরপুর এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফিটনেসবিহীন বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান রাস্তায় চলছে প্রকাশ্যে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া হাজারো চালক দিন-রাত পরিবহন চালাচ্ছে। যেখানে পুলিশের চোখের সামনে ওভারটেক, উল্টো লেনে গাড়ি চালানো হয় সেখানে শাস্তি কার্যকর হয় না। কারণ সড়ক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাব এত গভীর যে, কোনো চালক বা মালিককে আটক মানেই রাজনৈতিক সংঘাতে জড়ানো। এমন ভুলনীতির ধারাবাহিকতায় সড়ক এখন হয়ে উঠেছে মৃত্যুপুরী, আর রাষ্ট্র কেবল পরিসংখ্যানের হিসাব রাখে। মৃতের কোনো হিসাব নেই। একজন রিকশাচালক সকালবেলায় বেরিয়েছিলেন, আর  ফেরেননি। একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র পরীক্ষা দিতে গিয়ে বাসের ধাক্কায় নিহত। একজন গার্মেন্টসকর্মী প্রতিদিনের মতো কারখানায় যাচ্ছিলেন, কিন্তু পৌঁছাতে পারেননি। পরিবারের কান্না, অসমাপ্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি কিছুই এখন সংবাদ নয়, কেবল পরিসংখ্যান। এই নৈতিক নিষ্ঠুরতাই এখন আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা। সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিকও বটে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ হারিয়ে যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে একটি পরিবারের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।

একজন শ্রমজীবী পিতা মারা গেলে, সন্তান স্কুল ছেড়ে কাজে নামে। একজন মায়ের মৃত্যু মানে, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ হারিয়ে যাওয়া। প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই গঠিত হয় তদন্ত কমিটি, কিন্তু তার রিপোর্ট প্রকাশিত হয় না। প্রতিশ্রুতি আসে, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে কিছু হয় না। বাস মালিক সমিতি, ট্রাকচালক ইউনিয়ন, এমনকি পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সব সংগঠনই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া মানে রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া। এই প্রভাবের বলয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও অসহায়। রাস্তা পার হতে গিয়ে মোবাইলে ব্যস্ত থাকা, ওভারটেকের প্রবণতা, সিটবেল্ট বা হেলমেট ব্যবহার না করা এসব আমাদের অসচেতনতার প্রতিফলন। রাষ্ট্র যতই আইন করুক, মানুষ যদি নিজে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার না দেয়, তাহলে দুর্ঘটনা কমবে না। সড়ক নিরাপত্তা মানে শুধু রাস্তায় নিয়ম নয়; এটি এক সামাজিক সংস্কৃতি যা আমাদের পরিবার, শিক্ষা ও গণসচেতনতার মধ্যে গড়ে তুলতে হবে।

আসলে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কমিশন গঠন করতে হবে, যা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ করতে হবে। দুর্ঘটনা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে সময়সীমাবদ্ধ ও আনতে হবে জনসম্মুখে। পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের রাজনীতিকরণ বন্ধ করা দরকার। গণমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে, যাতে জনগণ বুঝতে পারে এটি জাতীয় সংকট। নগর পরিকল্পনা ও সড়ক নকশা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্গঠন করতে হবে। রাস্তা যেন পথচারীর জন্য নিরাপদ হয়। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা, বাধ্যতামূলক করতে হবে যেন নতুন প্রজন্ম রাস্তায় নিয়ম মেনে চলাচলকে সম্মানের বিষয় মনে করে। একদিন ইতিহাস আমাদের প্রশ্ন করবে তোমরা রাজনীতি নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলে, কিন্তু যারা রাস্তায় রক্ত দিল, তাদের কণ্ঠ কি তোমাদের কানে পৌঁছায়নি? আমাদের কিন্তু সে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তবে উত্তরটি হতে হবে মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও নীতিনিষ্ঠ। না হলে এ রাষ্ট্রের প্রতিটি রাস্তা হয়ে উঠবে একটি কবরফলক, আর প্রতিটি সকাল শুরু হবে মৃত্যুসংবাদ দিয়ে। এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু বন্ধ কবে হবে?

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

rflashamim@gmail.com