সঞ্চিত টাকা না পেয়ে দিশেহারা সমিতির তিন সহস্রাধিক গ্রাহক

সঞ্চিত টাকা না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার হাজিডাঙ্গা আদর্শ গ্রাম উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের তিন সহস্রাধিক গ্রাহক। দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে তারা সমিতির সভাপতি রঞ্জন মণ্ডল ও সাধারণ সম্পাদক তার স্ত্রী সন্ধ্যা মণ্ডলসহ তাদের পরিবারের কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না। ঐ সমিতিতে গ্রাহকদের কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা সঞ্চিত ছিল। 

গ্রাহকদের অভিযোগ, ডুমুরিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) মোল্লা মোশাররফ হোসেন মফিজসহ ৫ জন ব্যক্তি সমিতির সভাপতি রঞ্জন মণ্ডল ও সাধারণ সম্পাদক তার স্ত্রী সন্ধ্যা মণ্ডলের কাছ থেকে জোর করে ঐ টাকার বিনিয়োগকৃত ও তাদের নিজ সম্পত্তি কবলা দলিল ও পাওয়ার অফ অ্যাটর্নির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়ে রাতের আধারে তাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছে। 

এদিকে, সমিতির সদস্যরা তাদের সঞ্চিত টাকা ফিরে পাওয়ার দাবিতে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রঞ্জন মণ্ডল ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নের হাজিডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। এক সময় ডুমুরিয়া বাজারে তৃষ্ণা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার পরিচালনা করতেন। ব্যবসায় বেশ পরিচিতি থাকলেও মিষ্টি বিক্রির আড়ালে ২০০৫ সালের দিকে তিনি সমিতি খুলে সুদের ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠলে সমবায় অফিসের নিবন্ধন পান তিনি। সমিতির নাম দেন হাজিডাঙ্গা আদর্শ গ্রাম উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড। সমিতির সভাপতি ছিলেন রঞ্জন মণ্ডল এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তার স্ত্রী সন্ধ্যা মণ্ডল।

স্থানীয় লোকজন জানান, নিবন্ধন পাওয়ার পর গ্রাহক বাড়াতে গ্রামে গ্রামে নারীকর্মী নিয়োগ দেন রঞ্জন মণ্ডল। যাদের কাজ ছিল মানুষকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে সমিতির সদস্য করা। অন্যদিকে সমিতিতে ব্যাংকিং পদ্ধতিতে লেনদেন, ডিপিএস, দৈনিক সঞ্চয়, বিশেষ সঞ্চয়, মাসিক সঞ্চয় ও মেয়াদি সঞ্চয়সহ (ডাবল স্কিম) নানা ধরনের স্কিম চালু করেন তিনি। এ ছাড়া ১০ বছর আগে ডুমুরিয়া হাসপাতাল মোড়ে ৮ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করেন তিনি। ঐ ভবনেই চলত সমিতির কার্যক্রম। পরে সমিতির নামে ১০টি যাত্রীবাহী বাস কেনেন। এসব খবর চাউর হলে দ্রুত গ্রাহক বৃদ্ধি পেতে থাকে। সমিতিতে জমা হতে থাকে কোটি কোটি টাকা। সমিতিতে গ্রাহকের কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা জমা হয়। 

সমিতির একজন গ্রাহক আরাজি ডুমুরিয়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। অনেক কষ্টে তিল তিল করে ৭ বছর ধরে ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা সমিতির কাছে জমা রেখেছি। আমার স্ক্রিমের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এখন আমার সুদে-আসলে পাওয়ার কথা ৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। বর্তমানে সমিতির সভাপতির দেখা নেই। শুনেছি, তিনি জায়গা-জমি গোবিন্দ মণ্ডল, অসীম মণ্ডল, হাজীডাঙ্গা গ্রামের রিপনের নামে দিয়ে গেছে। মেছাঘোনা গ্রামের খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে আরো ১ একর ২৫ শতক জমি নাকি বিএনপি নেতা মফিজ ভাই (মোল্লা মোশাররফ হোসেন মফিজ) ১ একর ১৫ শতক জমি নিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছে, মফিজ ভাই ঐ জমি নিয়েছেন গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করবেন বলে। তবে তার কাছে গেলে তিনি কোনো ধরনের উপকার করেননি। শুনেছি, জমি লিখে নেওয়ার পর রঞ্জন মণ্ডলকে রাতের আধারে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখনো তিনি নিখোঁজ। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গ্রাহকদের লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, হাজিডাঙ্গা আদর্শ গ্রাম উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডে ৩ হাজারের অধিক সদস্য বিভিন্ন মেয়াদে টাকা জমা রেখেছে। অধিকাংশ সদস্যের বইয়ে স্কিমের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অনেকের কিছু মাস বাকিও আছে। স্কিম শেষ হওয়া গ্রাহকরা পাওনা টাকা চাইতে গেলে সমিতি কর্তৃপক্ষ বিভিন্নভাবে সময়ক্ষেপণ করে। এরপর সদস্যরা গত ১৩ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে সমিতি কার্যালয়ে গিয়ে তাদের পাওনা টাকা চায়। তখন সমিতির সভাপতি রঞ্জন মণ্ডল জমি বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা টাকা পরিশোধ করবে বলে জানান। কিন্তু পরের দিন প্রভাবশালী কিছু লোক একটি কালো গ্লাসের মাইক্রোবাসে করে সাব-রেজিস্টার অফিসে রঞ্জন মণ্ডলকে নিয়ে যায়। এরপর হেলমেট পরিহিত অবস্থায় গাড়ি থেকে নামিয়ে তাকে সাব রেজিস্ট্রারের সামনে নেওয়া হয়। পরে বিএনপি নেতা মো. মোশাররফ হোসেন, শান্তনু রায়, সাইফুর রহমান খান, গোবিন্দ মণ্ডল এবং অসীম মণ্ডল তার কাছ থেকে জমি লিখে নেয়। এরমধ্যে মেছাঘোনা মৌজা থেকে মোল্লা মফিজ ১ একর ১৫ শতক, আরাজি সাজিয়াড়া মৌজা থেকে শান্তনু রায় ৯ শতক, সাইফুর রহমান খান আরাজি সাজিয়াড়া মৌজা থেকে ০৩২৮ শতক, গোবিন্দ মণ্ডল চিংড়া মৌজা থেকে ০.৬৮৭০ শতক এবং অসীম মণ্ডল হাজীডাঙ্গা মৌজা থেকে ০.১৭৭৫ শতক জমি কবলা ও পণ্যমূল্যবিহীন অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি বনিয়াদে ৫টি দলিল করে লিখে নেন। 

অভিযোগে তারা আরো বলেন, ঐদিন সংবাদ পেয়ে তারা রঞ্জন মণ্ডলের বাড়ি গেলে তিনি জানান, আমি জমি লিখে দিলেও কেউ আমাকে এক টাকাও দেয়নি। ওরা আমাকে আগামীকাল (১৫ আগস্ট) সকালে টাকা দিবে, আপনারা সকালে আসেন টাকা দিয়ে দিব। যথাসময় আমরা সমিতি কার্যালয় উপস্থিত হলে জানতে পারি, রঞ্জন মণ্ডল ঐদিন ভোর রাতে টাকা না দিয়ে ভারতে চলে গেছেন।

তারা বলেন, সমিতির পরিচালক রঞ্জন মণ্ডলের এখনো ৮তলা ভবনসহ বিভিন্ন লোকের কাছে লোন বাবদ প্রায় ৩/৪ কোটি টাকা পাওনা আছে। যার চেক স্ট্যাম্প প্রমাণসহ অফিসে জমা রয়েছে। উক্ত চেক ও স্ট্যাম্প দুষ্কৃতিকারীরা গায়েব করে দিতে পারবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। 

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডুমুরিয়ার একজন সাবেক জনপ্রতিনিধি বলেন, গ্রাহকরা টাকা পরিশোধের জন্য রঞ্জন মণ্ডলকে চাপ দিলে তিনি তাদের জানান, জমি বিক্রি করেছি, সকালে টাকা দিলেই তোমাদের টাকা পরিশোধ করে দিব। কিন্তু পরের দিন সকাল থেকে তাকে আর পাওয়া যায়নি। এখন লোকের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে, যারা জমি দলিল করে নিয়েছেন তারা রঞ্জন মণ্ডলের টাকা পরিশোধ করেননি। তারা তাকে রাতের অন্ধকারে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছে। তার প্রমাণও রয়েছে।

রঞ্জন মণ্ডলের জমি লিখে নেওয়ার ব্যাপারে মোল্লা মোশাররফ হোসেন মফিজের মোবাইল ফোনে একাধিকবার রিং দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এ ব্যাপারে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বলেন, শুনেছি রঞ্জিত মণ্ডল কম দামে জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। বর্তমানে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জমি লিখে নিয়েছে বলেও শুনেছি।