টি-টোয়েন্টির যুগে ১০০০ উইকেট শিকারি এক বোলার

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৫৭ পিএম

রাওয়ালপিন্ডিতে বল ঘুরিয়ে পাকিস্তানের শেষ ব্যাটার বাহাতি নোমান আলির ব্যাটের বাইরের কানা ছুঁইয়ে দিলেন সাইমন হারমার। বলটা উইকেটকিপারের হাতে ধরা পড়ল। এমন ডেলিভারি হারমারের জন্য নতুন কিছু নয়—বাঁহাতি ব্যাটারের অফ স্টাম্পের বাইরে ফুল লেন্থে স্পিন করে বাইরে বেরিয়ে যাওয়া বল। কিন্তু এই উইকেটটা আলাদা। কারণ, এটি যে হারমারের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১০০০তম শিকার। এবং হয়তো ক্রিকেট ইতিহাসে এই মাইলফলক ছোয়ায় হারমারই শেষ বোলার। 

এক বিরল অর্জনের ইতিহাস

১,০০০ উইকেট শিকার ক্রিকেটের এক অনন্য সাফল্য। একসময় এটি তেমন অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ২১৭ জন ক্রিকেটার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এই সংখ্যা ছুয়েছেন। তুলনায় ১০০টি সেঞ্চুরি করেছেন মাত্র ২৫ জন।
২০০৮ সালে মার্ক রামপ্রকাশ যখন তার সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করেন তখন ধারণা করা হয়েছিল, তিনিই হবেন শেষ ব্যক্তি। এরপর থেকে কেউ ৯০ সেঞ্চুরিতেও পৌঁছাতে পারেননি। ভারতের চেতেশ্বর পুজারা ছিলেন বর্তমান প্রজন্মের সর্বোচ্চ—৬৬ সেঞ্চুরি করা ব্যাটার, তিনিও অবসর নিয়েছেন। ।
কিন্তু এখন ১,০০০ উইকেটের কৃতিত্বও তেমনই বিরল হয়ে উঠেছে। হারমারের আগে সর্বশেষ এই মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন জেমস অ্যান্ডারসন, ২০২১ সালে। তার আগের ১৮ বছরে মাত্র তিনজন বোলারই এই অর্জন করেছেন।

একসময় সাধারণ, এখন প্রায় অসম্ভব

সবচেয়ে বেশি বোলার ১,০০০ উইকেটের ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৬০-এর দশকে—মোট ২৫ জন। ১৯৫০ ও ১৯৭০-এর দশকেও ২০ জনের বেশি বোলার এই অর্জন করেছিলেন। কিন্তু এরপর সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। ২০১০-এর দশকে মাত্র তিনজন—দানিশ কানেরিয়া, রঙ্গনা হেরাথ, ও দিনুকা হেত্তিয়ারাচ্চি ১,০০০ উইকেট নেন, যা ১৮৬০ সালের সবচেয়ে কম।
একুশ শতকে এখন পর্যন্ত অ্যান্ডারসন আর হারমার এই মাইলফলকে পৌঁছেছেন। তৃতীয় হতে পারেন শ্রীলঙ্কার মালিন্দা পুষ্পকুমারা যার উইকেট সংখ্যা ৯৮০। এর পরের অবস্থানে আছেন নাথান লায়ন (৮৪৭) এবং পাকিস্তানের মোহাম্মদ আব্বাস (৭৫০+)। কিন্তু বয়স ও সময় দুটোই তাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

ক্রিকেটের পরিবর্তন, হারানো সুযোগ

১৯৬০ সালে ইংল্যান্ডের কাউন্টি দলগুলো মৌসুমে ৩২টি ম্যাচ খেলত। তখন বোলারদের উইকেটসংখ্যা দ্রুত বাড়ত। বিদেশি খেলোয়াড়দের কাউন্টিতে খেলার সুযোগ ১৯৬৮ সাল থেকে শুরু হয়, যা গ্যারি সোবার্স, বিষেণ বেদি, ল্যান্স গিবসদের মতো তারকাদের ১,০০০ উইকেটের ক্লাবে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল।
কিন্তু এরপরই সব পাল্টে যায়। ওয়ানডে ক্রিকেটের আগমন (১৯৬৩) এবং পরে টি২০ ক্রিকেট (২০০৩)—দুটি ফরম্যাটই প্রথম শ্রেণির ম্যাচের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়। এখন কাউন্টি মৌসুমে দলগুলো মাত্র ১৪টি ম্যাচ খেলে প্রতি মৌসুমে।
একসময় ফ্রেড ট্রুম্যান মৌসুমে এক হাজার ওভার বল করতেন চারবার! এখন কোনো বোলারকে এতটা কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয় না। কেন্দ্রীয় চুক্তি, ইনজুরি ম্যানেজমেন্ট, এবং ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচি—সব মিলিয়ে এমন পরিশ্রম অসম্ভব।

সাইমন হারমান ১২ টেস্টে নিয়েছেন ৫১ উইকেট, বাকি ৯৪৮ উইকেটই তার ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকায় ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে

টি২০ যুগে হারিয়ে যাওয়া বোলার

২০০৮ সালে আইপিএলের সূচনার পর থেকে টি২০ ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ব্যস্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিশ্বের সেরা বোলাররা খুব কমই ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেন। যারা তিন ফরম্যাটে নিয়মিত, তাদের পক্ষে ১,০০০ উইকেটের চিন্তাই অবাস্তব।সাইমন হারমার হয়তো বিশ্বের সেরা বোলার নন, কিন্তু তার পথচলা একেবারেই অনন্য। তিনি প্রায় পুরো ক্যারিয়ার গড়েছেন ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মৌসুমে ঘুরে ঘুরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে তেমন ডাক না পাওয়ায় তার সময় নষ্ট হয়নি টি২০ খেলায়। বরং দুই গোলার্ধের মৌসুম মিলিয়ে খেলতে খেলতে তিনি পৌঁছে গেছেন ঐতিহাসিক মাইলফলকে।

হয়ত সাইমন হারমারই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১০০০ উইকেট শিকারী শেষ বোলার

আশ্চর্যের বিষয়—হারমার দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে এখন পর্যন্ত খেলেছেন মাত্র ১২টি টেস্ট। একদিকে কেশব মহারাজের আধিপত্য, অন্যদিকে কলপ্যাক নীতিতে ইংল্যান্ডে খেলার সময় জাতীয় দলে নিষিদ্ধ থাকা—সব মিলিয়ে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছোটই থেকেছে।

তবু, এই অফস্পিনার হয়তো ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন এক কারণে ১,০০০ উইকেট নেওয়া হয়তো শেষবারের মতো দেখল ক্রিকেট দুনিয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত