অশিক্ষার পুনর্জাগরণ

মানুষের অগ্রগতির মূলে থাকে শিক্ষা। এটাই  মননে আলো জ¦ালে। তাকে সৎ, সচেতন ও দায়িত্ববান করে তোলে। কিন্তু এখন সেই আলোর দীপ মøান হয়ে যাচ্ছে। ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে শর্টকাট পদ্ধতির আঘাতে। ফলাফলের ঝলকানিতে ঢেকে যাচ্ছে প্রকৃত জ্ঞান। কোচিং, সাজেশন আর মুখস্থ জালে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাচ্ছে। আজ আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা ডিগ্রি পেয়েও দক্ষ নয়, তথ্য জানে কিন্তু চিন্তা করতে শেখে না। সময় এসেছে, শিক্ষাকে নতুন চোখে দেখার। জীবনের ভিত্তি হিসেবে শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আজকের বাস্তবতায় শিক্ষার ভিত ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরীক্ষার ফলের চকচকে মোড়কের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত জ্ঞান। কোচিং, সাজেশন, মুখস্থ আর শর্টকাটের প্রলোভনে শিক্ষার অট্টালিকায় ইস্পাতের বদলে বাঁশ ঢুকে পড়ছে অদৃশ্যভাবে। এর ফলশ্রুতিতে জন্ম নিচ্ছে ডিগ্রিধারী অথচ অদক্ষ এক প্রজন্ম। শিক্ষা, যা হওয়া উচিত আত্মার মুক্তি ও জীবনের আলো সেটি পরিণত হচ্ছে বোঝা, ভীতি ও অন্ধকারের প্রতীকে। তাই সময় এসেছে নতুনভাবে ভাবার, নতুন দৃষ্টিতে শিক্ষাকে দেখার।  শিক্ষার ভিত যদি ভঙ্গুর হয়, তবে তার ওপর কোনো স্তম্ভ টিকে না। অথচ আজকাল শিক্ষার্থীর জগতে এই দুর্বল ভিত্তি নির্মাণই সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিভাবকরা ব্যস্ত জীবনের নানা অজুহাতে সন্তানের শিক্ষা নিয়ে সহজ পথ খোঁজেন। পরীক্ষার মৌসুম এলেই শোনা যায় একই আবেদন ‘স্যার, এ বছর সাজেশন দিয়ে কোনোভাবে পাশ করিয়ে দিন। আগামী বছর থেকে সিরিয়াস হব।’ কিন্তু আগামী বছর কখনো আসে না। শিশুর অমল মস্তিষ্কে যে স্থায়ী জ্ঞান গড়ে তোলা দরকার, তা থেকে বঞ্চিত হয় সে। রডের জায়গায় বাঁশ ঢুকে যায়। প্রথমদিকে বিষয়টি গুরুতর মনে হয় না। সপ্তম শ্রেণিতে সে কষ্টেসৃষ্টে টিকে যায়। অভিভাবক খুশি, শিক্ষকও স্বস্তি পান। অথচ অজান্তেই সন্তানের শিক্ষার ভবনে প্রবেশ করে অদৃশ্য দোষ। নবম শ্রেণিতে পৌঁছে সেই দুর্বল ভিতের অভিশাপ প্রকট হয়ে ওঠে। নতুন পাঠ্যবস্তুর মহিরুহ তার ওপর এসে দাঁড়ালে, শিশুটি কেবল নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বুঝতে পারে না। আয়ত্ত করতে পারে না। শিক্ষকের পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যায়। আসলে ব্যর্থতা শিক্ষকের নয়, পূর্বের প্রতারণার।

একজন প-িত বলেছিলেন, ‘শিক্ষার শত্রু হলো শর্টকাট।’ সত্যিই, শর্টকাট কখনো স্থায়ী সমাধান নয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে যেমন ভেজাল ওষুধ রোগ সারায় না, তেমনি শিক্ষায় ভেজাল কৌশল মেধাকে বিকশিত করে না। এ.পি.জে. আবদুল কালাম একবার বলেছিলেন, ‘রোল হিসেবে আমি ভালো ছাত্র ছিলাম না। কিন্তু প্রতিটি বিষয়ের মর্ম আমি জানার চেষ্টা করেছি।’ এখানেই নিহিত প্রকৃত শিক্ষার দর্শন। আজকের শিক্ষাজগৎকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এক অদৃশ্য মহামারী সমাজকে গ্রাস করছে। কোচিং সেন্টারগুলো ব্যবসার আস্তানায় রূপ নিয়েছে। প্রশ্নফাঁস, সাজেশন, গাইড বই সবকিছু যেন এক অদ্ভুত বাজার অর্থনীতির প্রতীক। অভিভাবকরা অঢেল অর্থ ব্যয় করেও সন্তানের প্রকৃত উন্নতি দেখতে পান না। ফলাফলের খাতায় নম্বর থাকলেও জ্ঞানের খাতায় শূন্যতার ঘনঘটা। জাতিসংঘের শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বলেছে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়, বরং জ্ঞানকে জীবনের অনুষঙ্গ করা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষার গণ্ডীতে বন্দি হয়ে পড়েছে। অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তিন পক্ষই যেন সংখ্যার মায়াজালে আবদ্ধ।

বাংলাদেশের একজন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বহুবার বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কে কৌতূহল জাগানোই শিক্ষার আসল কাজ।’ অথচ বাস্তবতা হলো, কৌতূহলকে হত্যা করা। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে কি আসবে নাকি আসবে না এই অঙ্কেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা। জ্ঞানের সমুদ্র তার কাছে রিক্ত মরুভূমির মতো হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আমরা ‘ডিগ্রিধারী নিরক্ষর’ প্রজন্ম গড়ে তুলব। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সতর্ক করেছিলেন ‘শিক্ষা যদি জীবনের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা অর্থহীন।’ আমরা এখন সেই অর্থহীনতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিশ্ব এগোচ্ছে আলোকগতিতে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা সিঙ্গাপুরে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই হাতে-কলমে বিজ্ঞান শেখে। তারা প্রশ্ন করে, তারা খুঁজে বেড়ায় উত্তর। অথচ আমাদের শিশুরা শিখছে শুধু কীভাবে পরীক্ষায় পাস করতে হয়। ফলে বৈশি^ক প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষার এই অবক্ষয়ের দায় কার? অভিভাবক কি দায়ী? নাকি শিক্ষক? নাকি পুরো সমাজ? আসলে দায় সবার। অভিভাবকরা সন্তানের জন্য সহজ পথ চান। শিক্ষকরা অনেক সময় পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা হারিয়ে ফেলেন। সমাজও এই ব্যবসায়ীকরণকে প্রশ্রয় দেয়। ফলত ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। মার্কিন দার্শনিক জন ডিউই বলেছেন ‘শিক্ষা কোনো প্রস্তুতি নয়, শিক্ষা নিজেই জীবন।’ অথচ আমরা শিক্ষা থেকে জীবনকে নির্বাসিত করেছি। আমরা ভেবেছি পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে জীবন নির্ধারিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো জীবন নির্ধারিত হয় জ্ঞান, দক্ষতা আর নৈতিকতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। যুক্তি ছিল, ছোটদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সেই চাপ বহুগুণে বেড়ে যায়। শিক্ষার্থীরা মনে করে পরীক্ষাই জীবনের সবকিছু। এভাবে তাদের সৃষ্টিশীলতা ক্ষয়ে যায়। মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী টিউশন বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। অথচ ফিনল্যান্ডে কোনো কোচিং সেন্টারের অস্তিত্ব নেই। সেখানকার শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বন্ধু হয়ে ওঠেন। তারা জ্ঞানার্জনের যাত্রায় পথপ্রদর্শক। ফলে ফিনল্যান্ডের শিক্ষা বিশে^ আদর্শ। আমরা পার্থক্যের এই পাঠ নিতে পারিনি। আজ আমাদের প্রয়োজন সচেতন অভিভাবক। অভিভাবককে বুঝতে হবে সন্তানের জন্য কোনো শর্টকাট পথ নেই। যেমন একটি গাছকে বড় হতে সময় লাগে, তেমনি একটি শিশুর মস্তিষ্ককেও পূর্ণতা পেতে সময় লাগে। জোর করে মুখস্থ করিয়ে নয়, বরং কৌতূহল জাগিয়ে তাকে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদেরও ভাবতে হবে তারা শুধু পরীক্ষার ফলাফল উৎপাদনের কারিগর নন। তারা জাতি গঠনের কারিগর। স্যার আইজ্যাক নিউটন বা আলবার্ট আইনস্টাইন কখনো সাজেশনের ওপর ভর করে জ্ঞান অর্জন করেননি। তারা প্রকৃতিকে প্রশ্ন করেছেন, উত্তর খুঁজেছেন।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা জাগিয়ে তোলা জরুরি। এ ছাড়া রাষ্ট্রকেও দায়িত্ব নিতে হবে। বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে জিডিপির মাত্র ২.১ শতাংশ ব্যয় করে। অথচ ইউনেস্কো ন্যূনতম ৬ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ করেছে। বিশ্বখ্যাত শিক্ষাবিদ পাউলো ফ্রেইরে লিখেছিলেন ‘শিক্ষা যদি মুক্তির হাতিয়ার না হয়, তবে তা নিপীড়নের অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।’ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজ মুক্তির পরিবর্তে নিপীড়নের রূপ নিচ্ছে। শিশুদের মনে চাপ, ভীতি, হতাশা এসব জন্ম দিচ্ছে। অথচ শিক্ষা হওয়া উচিত আনন্দ, উৎসাহ ও মুক্তির প্রতীক। অতএব, আমাদের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শিক্ষাকে আমরা অট্টালিকা হিসেবে ভাবি। প্রতিটি স্তরে জ্ঞানের ইট, নৈতিকতার সিমেন্ট, কৌতূহলের রড সব মিলে নির্মিত হতে হবে শিক্ষার প্রাসাদ। অভিভাবক, শিক্ষক, সমাজ সবার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া এটি সম্ভব নয়। আমরা যদি শিশুদের সত্যিকার অর্থে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তবে শর্টকাট পরিহার করতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। প্রতিটি শ্রেণির প্রতিটি পাঠ শিশুকে আয়ত্ত করতে সাহায্য করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার ভবন হবে অটুট, অক্ষয়, অবিনশ্বর। শিক্ষার আলোয় গড়ে উঠবে জ্ঞানের নগরী। সেই নগরী হবে মানুষের মুক্তির ঠিকানা। আর সেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের সন্তানরা গর্বভরে বলতে পারবে তারা শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি, বরং জীবনে উত্তীর্ণ হয়েছে।

এটি এমন এক নির্মাণযজ্ঞ, যেখানে রডের স্থানে রোপিত হয় সত্যান্বেষণ, ইটের ভাঁজে ভাঁজে লুকায় সৃজনশীলতা আর সিমেন্টের দৃঢ়তায় গেঁথে যায় মানবিকতার বুনন। সেই শিক্ষা ভবন শুধু সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না, বরং হয়ে ওঠে অনন্ত প্রজন্মের প্রেরণার ধ্রুবতারা। শিক্ষা তখন আর সনদপ্রাপ্তির সিঁড়ি নয়; হয়ে ওঠে আত্মার দীপশিখা, মস্তিষ্কের মুক্ত গগন, জীবনের পূর্ণতার মহিমান্বিত শপথ। যে সমাজ শিক্ষার ভিত ইস্পাতের ন্যায় অটল রাখে, সে সমাজই বিশ্বসভায় দাঁড়ায় মর্যাদার শিখরে। অতএব, আমাদের আজকের অঙ্গীকার হোক শিক্ষার প্রতিটি শাখা-প্রশাখায় আমরা রোপণ করব জ্ঞানের চারা, সেচ দেব নৈতিকতার জলে আর পল্লবিত করব কৌতূহলের আলোয়। তবেই গড়ে উঠবে সেই কাক্সিক্ষত নগরী যেখানে মানুষ শুধু ডিগ্রিধারী নয়, প্রকৃত অর্থে আলোকিত মানবসত্তা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বদলাতে হলে প্রথমে মনোভাব বদলাতে হবে। শিক্ষক, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারক সবাইকে বুঝতে হবে শিক্ষা কোনো প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিকাশের যাত্রা। শিক্ষার্থীর মনে শেখার আনন্দ জাগাতে হবে। শ্রেণিকক্ষে আলোচনা, যুক্তি ও সৃজনশীল চিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে। শিক্ষককে হতে হবে অনুপ্রেরণার মানুষ, যিনি ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীকে শেখার পথে এগিয়ে নেবেন। অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো, সন্তানকে মুখস্থের ভার না চাপিয়ে কৌতূহল জাগাতে সাহায্য করা। রাষ্ট্রকে শিক্ষানীতিতে বাস্তবমুখী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করতে হবে। পরীক্ষার ধরন বদলাতে হবে, যেন শিশুরা বুঝে শেখে, মুখস্থ নয়। স্কুলে পাঠদানের পাশাপাশি চরিত্র গঠন, শিষ্টাচার ও দায়িত্ববোধ শেখানোর ওপর জোর দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করে শেখাকে আনন্দময় করা সম্ভব। প্রতিটি বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম থাকতে হবে, যেখানে শিক্ষকরা আকর্ষণীয় উপায়ে পাঠদান করবেন। গ্রামীণ বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, যাতে শহর-গ্রামের বৈষম্য কমে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘ভালো মানুষ তৈরি করা’। জ্ঞানী, দক্ষ, নৈতিক ও মানবিক মানুষই একটি উন্নত জাতির ভিত্তি। শিক্ষা যদি এই গুণগুলো অর্জনে পথ দেখায়, তবে কোনো সংকটই আমাদের থামাতে পারবে না।

লেখক: গবেষক, সংগঠক ও শিক্ষক

 khandaker.apon@gmail.com