আদানিকে বাঁচাতে ৩৯০ কোটি ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা মোদির

ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধনী ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ গৌতম আদানির বিরুদ্ধে গত বছর মার্কিন কর্তৃপক্ষ ঘুষ ও জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত করে। এরপর থেকেই চাপে রয়েছেন তিনি। চলতি বছর তার ‍ওপর ঋণের বোঝা বাড়ছিল ও দেনা পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসছিল।

আর তাতেই তিনি মার্কিন ও ইউরোপীয় কয়েকটি বড় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা সহযোগিতায় অনিচ্ছুক ছিল। তাকে বাঁচাতে তখন ভারত সরকার নিজস্ব একটি সহায়তা পরিকল্পনা তৈরি করছিল।

ভারতের কয়লা খনি, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং গ্রিন এনার্জির বিস্তৃত এক সাম্রাজ্যের মালিক তিনি। তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলার বলে ধারণা করা হয়।

ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা সরকারি নথি থেকে জানা যায়, ভারতের কর্মকর্তারা মে মাসে একটি প্রস্তাব তৈরি ও অনুমোদন করেন যাতে রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা সংস্থা (এলআইসি) থেকে প্রায় ৩৯০ কোটি ডলার আদানি গ্রুপের ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করা হবে। তবে এটি মূলত গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত জনগণের জীবন বীমার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান।

এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয় মে মাসেই যখন আদানির বন্দর-সহযোগী প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বিদ্যমান ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করতে হয়েছিল। ৩০ মে আদানি গ্রুপ ঘোষণা করে যে পুরো বন্ডটি একক বিনিয়োগকারী অর্থাৎ এলআইসি কিনে নিয়েছে। বিষয়টি সমালোচকদের চোখে সরকারি অর্থের অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হয়।

নথি ও সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, এটি ছিল সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি অংশ, যার লক্ষ্য ছিল করদাতাদের অর্থ একটি প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারে আদানির প্রভাব কতটা গভীর এবং কীভাবে দিল্লির কর্মকর্তারা তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেন।

এই অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদনটি এলআইসি ও ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা নথি, তাদের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার এবং আদানি গ্রুপের আর্থিক বিষয়ে অবহিত তিন ভারতীয় ব্যাংকারের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তারা সকলেই নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।

আদানি গ্রুপ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা সরকার কোনো পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলাম এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করছি। এলআইসি বিভিন্ন কর্পোরেট গ্রুপে বিনিয়োগ করে আদানির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ইঙ্গিত বিভ্রান্তিকর।’

তারা আরও জানায়, ‘রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং আমাদের প্রবৃদ্ধি মোদির জাতীয় নেতৃত্বের আগেই শুরু হয়েছে।’

তবে এলআইসি অর্থ মন্ত্রণালয় বা মোদির কার্যালয় কেউই মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। পরে এলআইসি অনলাইনে এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের বিনিয়োগ বাইরের কোনো প্রভাবাধীন নয়, এ অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

সংস্থাটির দাবি, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বোর্ড অনুমোদিত নীতিমালা ও যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের পর নেওয়া হয়।

নথি অনুযায়ী, এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়, এলআইসি এবং সরকারের প্রধান থিংক ট্যাঙ্ক ‘নীতি আয়োগের’ যৌথ উদ্যোগে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছিল।

অর্থমন্ত্রণালয়ের নথিতে বলা হয়েছে, পরিকল্পনার কৌশলগত উদ্দেশ্যগুলোর একটি ছিল আদানি গ্রুপের প্রতি আস্থা প্রদর্শন এবং অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা। তখন আদানি গ্রুপের মোট ঋণ গত এক বছরে ২০ শতাংশ বেড়েছিল।

এর কয়েক মাস আগে মার্কিন বিচার বিভাগ আদানির বিরুদ্ধে ‘মাল্টি বিলিয়ন ডলারের প্রতারণামূলক স্কিমের’ অভিযোগ এনেছিল, যার মাধ্যমে তিনি মার্কিন বিনিয়োগকারীদের ভুয়া তথ্য দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। একই দিনে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তাকে সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের অভিযোগে মামলা করে।

আদানি গ্রুপ জানায়, ‘এই মামলাগুলো আমাদের কোম্পানির সঙ্গে নয়, ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত।’

অর্থমন্ত্রণালয়ের নথিতে আদানিকে বলা হয়েছে ‘দূরদর্শী উদ্যোক্তা’ যিনি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখেও অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছেন।