কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতির যাত্রায় বাংলাদেশ যখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনই একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে তামাক চাষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। সরকার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করছে, অথচ সরকারি নীতির বৈপরীত্যেই নানা সুবিধার আড়ালে তামাক চাষ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮০ হাজার হেক্টরেরও বেশি উর্বর জমি কৃষি উৎপাদনের বাইরে চলে যাচ্ছে। একদিকে অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে, অন্যদিকে উর্বর জমির বড় অংশ দখল হয়ে যাচ্ছে তামাক চাষে। বিষয়টি শুধু কৃষির জন্যই নয় বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি। ২০১৮ সালে সরকার তামাক পাতার ওপর রপ্তানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনে, যা সরাসরি তামাক চাষে উৎসাহ জোগায়। সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদ ও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ অনুযায়ী জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা থাকলেও বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণের কথা থাকলেও করছাড়ের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে তামাক চাষকে আরও উৎসাহিত করা হচ্ছে। রপ্তানি শুল্ক মওকুফের পর মাত্র এক অর্থবছরেই তামাকপাতা রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী মাত্র ৭ বছরে তামাকপাতা রপ্তানি তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ রাজস্ব আয়ে এর কোনো প্রতিফলন নেই। উল্লিখিত সময়ে তামাক পাতার গড় বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টনের অধিক। রপ্তানি শুল্ক বহাল থাকলে, এই সময়ে সরকারের প্রায় ১২০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হতো।
তামাক পাতা রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং তামাক চাষে সরকারি সহযোগিতার ফলে দেশ জুড়ে বাড়ছে তামাক চাষ। গত এক দশকে তামাক চাষের জমির পরিমাণ হ্রাসের একটা ধারাবাহিক চিত্র দেখা গেলেও হঠাৎ করেই এই জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করেছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী সুশান্ত সিনহার রিপোর্টে উঠে এসেছে, মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫০ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ বেড়েছে। এই বৃদ্ধির পেছনে সরকারের বিভিন্ন নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ সরকার কর্র্তৃক কমিটি গঠন করে তামাক পাতার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া, তামাকপাতা রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান এবং কোম্পানির নীতিনির্ধারণী পদে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি। এছাড়া দেশের চাষিরা ধান, গম ও ভুট্টা সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে না পারলেও বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানি নির্ধারিত মূল্যেই তামাক পাতা ক্রয় করে। যা তামাক চাষিদের লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করে এবং পরোক্ষভাবে তামাক চাষে উৎসাহিত করে। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছে দেশের চাষিরা। অন্যদিকে তামাক চাষের কারণে দেশের সম্ভাবনাময় কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প। অথচ মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে এ খাতের জন্য সব থেকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল তুলা আমদানিতে চীনকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ হতে চলেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতির ফলে বিশ্ববাজারে তুলার দাম প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অধিক মূল্যে তুলা আমদানির ফলে, এই বোঝা পড়ছে পণ্য উৎপাদনে। যা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেবে। বাংলাদেশ বর্তমানে শাকসবজি ও ধান উৎপাদনে বিশে^ ৩য় এবং আলু উৎপাদনে ৭ম স্থান অর্জন করেছে। প্রতিনিয়ত চাল ও গম আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা প্রমাণ করে কৃষিজমির সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না। অপ্রাপ্তির মধ্যেও আশাজাগানিয়া বেশ কিছু বিষয় আছে, যা কৃষকদের তামাকের বিকল্প ফসল হিসেবে চাষের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করবে। ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের ওপর তামাক চাষের ক্ষতিকর প্রভাব ও বিকল্প চাষের সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, তামাক চাষে নিট মুনাফা ১৩.৯ শতাংশের বিপরীতে ধান ও শস্যজাতীয় ফসল চাষে লাভের হার ২৮.০১ শতাংশ, যা দ্বিগুণেরও অধিক। এই লভ্যাংশের সঙ্গে স্বাস্থ্য ক্ষতির বিষয়টি যুক্ত করলে লাভের হার যে আরও বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই।
বিদেশি ফল আমদানির পরিমাণ ১০ হাজার টন কমেছে। পার্বত্য অঞ্চলে গরম মসলা, আলু বোখারাসহ নানা বহু মূল্যবান মসলা চাষের বিশাল সম্ভাবনার বিষয়টি মাথায় রেখে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘উচ্চমূল্যের মসলা চাষ’ নামক একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই কার্যক্রমটি চলমান রাখা সম্ভব হলে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার মসলা আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় এলাকাতেও পড়েছে তামাক কোম্পানির কুনজর। ফলে বাড়ছে তামাকের চাষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিপুল সম্ভাবনাময় মসলা চাষ। বিগত অর্থবছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজস্ব নীতির বিশ্লেষণে তামাক পাতার করমুক্ত রপ্তানি, সিগারেট পেপার আমদানিতে বিশেষ করছাড় এবং তামাক কোম্পানিগুলোকে ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা প্রদানের ফলে, জাতীয় রাজস্বের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই নীতিগুলো শুধু সরকারের আর্থিক স্বাস্থ্যকে দুর্বল করে না বরং তামাক নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রচেষ্টার সম্পূর্ণ বিপরীত। এমতাবস্থায় তামাক কোম্পানিগুলোকে কর রেয়াত/করছাড় বা এ ধরনের সুযোগ প্রদান থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি তামাক পাতা রপ্তানিতে কর অব্যাহতি প্রত্যাহার করে পুনরায় ২৫ শতাংশ কর আরোপ করা এবং অতিদ্রুত তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ নীতির খসড়া চূড়ান্তকরণের বিকল্প নেই।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
baidyamethun@gmail.com