পিডিবির বোঝা বে অব বেঙ্গল পাওয়ার

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে সাত বছর আগে বে অব বেঙ্গল পাওয়ার কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে। এজন্য অধিগ্রহণ করা হয় ৪০০ একর জমি। জনবল নিয়োগ ও অফিস স্থাপন এবং প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইও করা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটিতে এখন তেমন কাজ নেই। প্রশ্ন উঠেছে, কোম্পানিটি কি সচল? সাত বছর ধরে যে অবস্থা চলছে, তার দায় কার?

কক্সবাজারের মহেশখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে ২০১৮ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না হুয়াডিয়ান হংকং কোম্পানি লিমিটেডের (সিএইচডিএইচকে) সমান অংশীদারত্বে কোম্পানিটি গঠন করা হয়। প্রাথমিকভাবে এতে ১৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ছিল ২০২২ সালের মধ্যে। কেন্দ্র নির্মাণে মহেশখালীতে পিডিবির নিজস্ব ৫৬০০ একর জায়গার মধ্যে ৪০০ একর বরাদ্দ দেওয়া হয় বে অব বেঙ্গল পাওয়ারকে। সম্ভাব্যতা যাচাই এবং অন্যান্য কাজের নামে বেশ কিছু অর্থও ব্যয় হয়েছে ইতিমধ্যে। বছরে প্রায় আড়াই লাখ টাকার অফিস ভাড়া, বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক খরচ হয়েছে। এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ খরচ হয়েছে, তার সঠিক হিসাব জানা সম্ভব হয়নি। কাজ না হলেও থেমে নেই প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত ব্যয়।

পিডিবি সূত্র জানায়, নতুন করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ থেকে সরে আসার নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে শেষ পর্যন্ত ১৩২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি নির্মাণের উদ্যোগ বাতিল করা হয়। কয়লার বদলে গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ¦ালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২০২১ সালে। ২০২৩ সালে এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শেষ হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এলএনজিভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি ১৬০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ও ৫০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের।

একটি সিদ্ধান্ত বাতিল করে আরেকটি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতেই কেটে গেছে পাঁচ বছর। এরপর ২০২৪ সালে ১৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে অংশ নেয় চীনের তিনটি প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুতির পর এ কার্যক্রম আবার থমকে যায়।

বে অব বেঙ্গল পাওয়ারের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বে অব বেঙ্গলের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’ যদিও ওয়েবসাইটে চেয়ারম্যান হিসেবে তার নাম রয়েছে এবং একাধিক সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে, তিনিই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান।

এ বিষয়ে পিডিবির চেয়ারম্যান ও বে অব বেঙ্গল পাওয়ার কোম্পানির একজন পরিচালক প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম গত বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দ্রুত বিষয়টির সুরাহা করতে চাই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চীনা নাগরিক) দীর্ঘদিন চীনে অবস্থান করছেন। কোম্পানির বিষয়ে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি আসছেন না। আশা করি, শিগগির তিনি বাংলাদেশে আসবেন। তখন এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।’ বে অব বেঙ্গল পাওয়ার কোম্পানির পরিচালনা পর্যদে আটজন সদস্যের মধ্যে চারজন বাংলাদেশের, বাকিরা সিএইচডিএইচকের কর্মকর্তা। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে আছেন সিএইচডিএইচকের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাটারিয়াল) ঝু জিনসুন।

পিডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক একজন প্রতিহিংসাপরায়ণ লোক। তিনি অফিস করেন না বললেই চলে। বেশিরভাগ সময় চীনে থাকেন। মিটিং ডাকার কথা বললেও তিনি কারও কথার গুরুত্ব দেন না। কোম্পানির এমন দুর্গতির তার দায় সবচেয়ে বেশি।

বে অব বেঙ্গল পাওয়ার কোম্পানি পরিচালনার জন্য রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে চারটি কক্ষ ভাড়া নেওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ ভবনের অন্য অফিসগুলোর মতো কাজের ব্যস্ততা নেই। কারণ, কাজই তো নেই। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঝু জিনসুন এবং চীনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অন্য কর্মকর্তারাও অফিস করেন না দিনের পর দিন।

পিডিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বে অব বেঙ্গল পাওয়ার কোম্পানির দায়িত্ব বিভিন্ন সময়ে পালন করে থাকেন। প্রতিষ্ঠানটিতে উপপরিচালক হিসেবে দেড় বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী এএ জিহাদ বিন মাহমুদ। তার সঙ্গে আছেন একজন সহকারী পরিচালক এবং একজন অফিস সহকারী। তারা প্রতিদিন সকালে অফিসে আসেন আর বিকেলে বাসায় যান। কোম্পানির কার্যক্রম তেমন না থাকায় পিডিবি ও মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত টুকটাক কিছু দাপ্তরিক কাজ তারা করেন।

প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক এএ জিহাদ বিন মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে ১৬০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে। আমরা চাই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হোক। চীনের রাষ্ট্রীয় যে প্রতিষ্ঠান এই কোম্পানিতে পিডিবির অংশীদার তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশে^র তৃতীয় বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান। বিশে^র ২০টি দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলে প্রতিষ্ঠানটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৯১ গিগাওয়াট। এর প্রায় ৪৮ শতাংশই পরিচ্ছন্ন জ¦ালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ। তাদের সঙ্গে কাজ করতে পারলে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, দেশের অনেক সুবিধা হবে।’

এ বিষয়ে ক্যাবের জ¦ালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিডিবির নিজস্ব সক্ষমতা রয়েছে। তারা কেন যৌথ অংশীদারত্বে কোম্পানি গঠন করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে? আগের সরকারের আমলে এসব ভূত পিডিবির ঘাড়ে চাপিয়ে তাদের দুর্বল করা হয়েছে। এগুলো বাতিল হওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘ভোক্তাদের টাকায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। তহবিলের টাকায় পিডিবি নিজেই তো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারে। পিডিবির উচিত নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগানো। পিডিবিকে সারা বিশে^ বিদ্যুৎ খাতের আদর্শ ও স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চাই; যেখানে এ দেশের মানুষ চাকরি করে গর্ববোধ করবে।’