দেশি মাছ এখন চায়না ও দুয়ারী জালের ফাঁদে

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় নদী ও খাল বিল থেকে মাছের আহরণ কমে যাওয়ায় জীবন জীবিকা নিয়ে জেলেরা হতাশ। এছাড়া শিকারিদের অবৈধ চায়না জাল ও দুয়ারি জাল দিয়ে মাছ ধরায় মা মাছ নদী ও খাল বিল থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অতিলোভী মাছ শিকারিরা বিষ টোপ দিয়ে মাছ শিকার করায় মাছের বংশ দিনদিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং সেই সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। প্রশাসন নির্বাক। ফলে মাছের বংশ বিস্তার ধীরে ধীরে শূন্যের কোঠায় নেমে যাচ্ছে। 

এদিকে মৎস্য বিভাগ জানান, এ উপজেলায় যমুনা, করতোয়া, বড়াল, গোহালা ও হুড়াসাগরসহ ছোট বড় ৭টি নদ-নদী রয়েছে। মৎস্য বিভাগ বলছে উপজেলা সদরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদীর প্রবাহ বাড়াতে সম্প্রতি ড্রেজিং করা হলেও নির্বিচারে অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দোয়ারি জাল দিয়ে মাছ ধরায়  মাছের বংশ বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ নদীটি থেকে দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে।  

মৎস্য বিভাগ জানান, নদী পাড়ের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে অবৈধ জাল রয়েছে। 

শাহজাদপুর উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে আরো জানা গেছে, এ উপজেলায় নদী রয়েছে ৭টি, ১৬টি বিল রয়েছ, ১০টি সরকারি খাল রয়েছে। অনেক গুলো ডোবা রয়েছে। এসব খালে, নদী ও বিলে প্রতিবছর সব মিলে দেশি প্রজাতির মাছের উৎপাদন হয় ৯৫৫৪ মে. টন। তবে স্থানীয় জেলেরা বলছেন সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার কোন মিল নেই। স্থানীয় হাট বাজারে দেশি মাছের আকাল চলছে। স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের অভিমত নদী ও খাল-বিলে জাল ফেলে তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। 

জেলেরা জানান, দিনভর জাল ফেলে যে মাছ জালে ধরা পড়ছে সে মাছ বিক্রি করে মহাজনদের সুদের টাকা পরিশোধ করতেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে ।  

শাহজাদপুর উপজেলার যমুনা নদী পাড়ের রুপবাটি ইউনিয়নের জেলে পাড়ার বুদ্ধি হালদার আক্ষেপ করে জানান, নদীতে আর তেমন মাছ পাওয়া যায় না । নদীতে এখন মাছের বড় আকাল। তিনি জানান, এক সময় এখানকার নদী ও খাল বিলে জাল ফেললেই প্রচুর দেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন সে গুলো কেবলই অতীত।  

তিনি আরো জানান, বাচা, পাপদা, ঘাইড়া, শেলং, লইটকা, বাতাসি (তিনকাটা), আঁইড়, বাঁশ পাতাড়ি, বাইম, কাল বাউস, দেশি ছোট পুঁটি, কাখিলা ,  ডেলা চোখা, ইলিশ, খশল্লা, পাঙ্গাশ, গৌচি, ভেদা (নোদই) সহ নানা প্রজাতির মাছ নদী, খালে, ডোবায় ও বিলে পাওয়া যেত। আগে প্রতিবছর বর্ষার পানি আশ্বিন কার্ত্তিক মাসে কমার সঙ্গে সঙ্গে নদী আর খাল বিল থেকে জেলেদের জালে যে পরিমাণ মাছ ধরা পড়তো এখন বেশিরভাগ মাছ জালে ধরা পড়ছে না। 
বুদ্ধ হালদার নামে একজন জানান, মাছের বংশ বিস্তারের জন্য মৎস্য বিভাগ অধিক মনযোগী না হওয়ায়, তাই সারা বছরের দায়িত্ব পালন ও প্রকৃত জেলেরা বিভিন্ন জলমহাল থেকে নানাভাবে বিতারিত হওয়ায় নির্বিচারে নদী, খাল, বিল থেকে মাছ ধরায় দেশি মাছ বংশ বিস্তারে এখন হুমকির মধ্যে পড়েছে। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের আরো অভিযোগ নদী পাড়ের প্রতিটি ঘরে ঘরে অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দোয়ারি জালের বিস্তার রোধ না করলে নদী ও জলাশয় থেকে দেশি প্রজাতির মাছ খুব শিগগির বিলুপ্ত হয়ে যাবে। উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে জানানো হয় এ উপজেলায় করতোয়া নদীতে চারটি অভায়াশ্রম রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানান গেছে বাস্তবে মাত্র দুইটি অভায়াশ্রম রয়েছে। এর একটি অভয়াশ্রম প্রাণনাথপুরে। এটি শুস্ক মৌসুমে পানি শূন্য হয়ে পরে। 

এদিকে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন জানান, শাহজাদপুরে দীর্ঘ নদীপথ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে একাধিক খাল ও বিল। এই বিশাল জলাভ’মিতে নজরদারি বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন। এজন্য নজরদারির জন্য ড্রোন ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তিনি জানান এই উপজেলায় প্রায় ৭ হাজারের উপরে মৎস্যজীবী রয়েছেন। আধুনিক নৌযান ও নৌ পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো দরকার। তিনি বলেন নদী পথে অভিযান পরিচালনার জন্য একাধিক স্পীটবোডের দরকার। সেখানে একটি নৌকাও তাদের নেই। তবু সকল অসুবিধার মধ্যে দিয়েও দেশি মাছ রক্ষায় মৎস্য বিভাগ কাজ করছেন । এই কর্মকর্তা জানান মাছের বংশ বাড়াতে মা মাছ রক্ষা ও প্রজননের জন্য নদীর গভীরতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি নদীতে একাধিক অভয়াশ্রম গড়ে তোলা প্রয়োজন।