ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা

সম্ভাবনা ও প্রস্তুতির প্রশ্ন

পাঁচ দিনব্যাপী ৭৭তম ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা গত ১৮ অক্টোবর শেষ হয়েছে। বিশে^র বৃহত্তম এই বইমেলা কেবল বই বিক্রির জায়গা নয় এটি জ্ঞান, সংস্কৃতি ও চিন্তার এক আন্তর্জাতিক মিলনমেলা। বই, জার্নাল, ডিজিটাল পাবলিকেশন, মুদ্রণ প্রযুক্তি, লেখক, সাহিত্যিক এজেন্ট, অনুবাদক, সম্পাদক বই সম্পর্কিত এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যা এই মেলার আওতার বাইরে থাকে। বিশে^র পাঁচ হাজারেরও বেশি স্টলে বিভিন্ন দেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় আর সেভাবেই ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা পরিণত হয় এক বর্ণাঢ্য বৈশ্বিক উৎসবে।

গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার এই মূল্যবোধগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর শত শত সেমিনার ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ বছরও অনেকে আশা করেছিলেন যে, ফিলিস্তিনের চলমান সংকট নিয়ে মেলায় অন্তত কিছু আলোচনা হবে বা নৈতিক অবস্থান নেওয়া হবে। কিন্তু প্যারিসভিত্তিক Independent Publishers Alliance বিষয়টি আলোচনায় না আনায় এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার বহু প্রকাশক মেলায় অংশগ্রহণ থেকে সরে দাঁড়ান। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেলা কর্র্তৃপক্ষ ইউক্রেন ইস্যুতে সক্রিয় থাকলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের নীরবতা আন্তর্জাতিক প্রকাশনা অঙ্গনে যথেষ্ট বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় অংশগ্রহণ নতুন নয়। তবে প্রশ্ন হলো আমাদের অংশগ্রহণের লক্ষ্য কী? বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি তুলে ধরা? বই বিক্রি? নাকি আন্তর্জাতিক কপিরাইট বাণিজ্যে প্রবেশ? লক্ষ্য নির্ধারণ ছাড়া এই মেলায় কোনো বাস্তব সাফল্য আনা সম্ভব নয়।

২০১৫ সালে খুব ছোট আকারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুরু হয়। অন্যপ্রকাশ-এর মাজহারুল ইসলাম, সিরাজুল কবির চৌধুরী এবং পাঞ্জেরীর কামরুল হাসান শায়ক নিজস্ব উদ্যোগে বইপত্র নিয়ে মেলায় আসেন। সরকার সে বছর শুধু স্টল ভাড়ার ব্যয় বহন করে। ছোট্ট হলেও বাংলাদেশের স্টল ছিল আকর্ষণীয় যা বহু বিদেশি দর্শনার্থীর দৃষ্টি কাড়ে। প্রদর্শিত হয় বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ, গবেষণাধর্মী ও সংস্কৃতি বিষয়ক বই। ২০১৬ এবং ২০১৮ এই তিন বছর বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে সফল। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সহযোগিতায় বড় পরিসরে স্টল নেওয়া হয়। ২০১৬ এবং ২০১৭ মেলায় দুটি করে সেমিনার আয়োজন করা হয়। কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য বিষয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন। বাংলাদেশের আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের প্রকাশক, ট্রেড ভিজিটর ও সাহিত্যপ্রেমীরা। সেমিনারগুলো মেলার অফিসিয়াল ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত হয়, যা ছিল একটি বড় অর্জন।

২০১৭ থেকে বহুবার জার্মান সরকারের আমন্ত্রণে মিতিয়া ওসমান (ময়ূরপঙ্খি প্রকাশনা) মেলায় অংশ নেন। তার বই ইতোমধ্যে ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অনূদিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের মেলায় ফিনল্যান্ডের একটি প্রকাশনা সংস্থা তার একটি বই ফিনিশ ভাষায় অনুবাদ করে প্রদর্শন করেছে, যা বাংলাদেশের প্রকাশনা অঙ্গনের জন্য নিঃসন্দেহে এক উজ্জ্বল সাফল্য। কিন্তু ২০১৯ সালের পর শুরু হয় স্থবিরতা। করোনার প্রভাবে মেলার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হারায় আগের উদ্যম ও পরিকল্পনা। সরকারি ডেলিগেশনে লেখক-প্রকাশকদের অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। স্টল থাকলেও আন্তর্জাতিক কপিরাইট বাণিজ্যের লক্ষ্য ও প্রস্তুতি ছিল না বললেই চলে। কখনও মেলা শুরুর দুইদিন পর স্টলে বই ডিসপ্লে হয়।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা বই বিক্রির মেলা নয়, এটি কপিরাইট বিনিময় ও প্রকাশনা কূটনীতির মেলা। এখানে কাজ করেন লিটারারি এজেন্টরা, যারা বছরজুড়ে বিদেশি প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ নতুন বই বাজারে নিয়ে আসেন। আমাদের এই পরিকাঠামো এখনো দুর্বল।

বাংলাদেশ চাইলে ভারতের চেন্নাই আন্তর্জাতিক বইমেলা মডেল অনুসরণ করতে পারে। তামিলনাড়ু সরকার স্থানীয় ভাষার বই বিদেশি ভাষায় অনুবাদে অনুদান দেয় এবং ফলে তামিল সাহিত্য বিশ^বাজারে সুস্পষ্ট উপস্থিতি তৈরি করেছে। আমরা চাইলে বাংলা সাহিত্য নিয়েও একই ধরনের রূপান্তরমূলক পরিকল্পনা নিতে পারি।

প্রতি বছর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সেমিনার আয়োজন করে বটে, কিন্তু যেখানে প্রয়োজন জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও অনুবাদকদের, তাদের অংশগ্রহণ প্রায় থাকে না। অথচ মেলায় প্রথম তিন দিনেই চার হাজারের বেশি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় এবং সেগুলো অফিসিয়াল ক্যালেন্ডারে থাকে, যেখানে উপস্থিত থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সমাধান কী?

          অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য আগে ঠিক করতে হবে।

          ৩-৪ মাস আগেই বিষয়, বক্তা, অতিথি নির্ধারণ করতে হবে।

          সরকারি অংশগ্রহণের সঙ্গে প্রকাশকদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।

          বিদেশি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে সরাসরি মিটিং ও কপিরাইট আলোচনার পরিকল্পনা থাকতে হবে।

          বাংলা বই ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় অনুবাদে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা কেবল প্রদর্শনের জায়গা নয়, এটি সাংস্কৃতিক উপস্থিতি জানানোর এবং সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ।

যদি আমরা এখানেও কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকি, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাহিত্য শিল্প নিজের সম্ভাবনা প্রকাশের বড় সুযোগ হারাবে।

প্রয়োজন দৃশ্যমান লক্ষ্য, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং পেশাদার প্রস্তুতি। 