লিগ খেলে বড় মঞ্চের প্রস্তুতি তীরন্দাজদের

টঙ্গীর শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামের নতুন নাম হয়েছে আরচারি ট্রেনিং সেন্টার। এই মাঠটা বহু বছর ধরেই আরচারির দখলে। গত বছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে নাম বদলের পাশাপাশি খলনলচে বদলের কাজ চলছে সেখানে। যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নির্মাণ সামগ্রী। এর মধ্যেই বছর জুড়ে চলে আরচারদের আবাসিক ক্যাম্প। রবিবার সেখানে হলো চার ধাপের বাংলাদেশ লিগের চতুর্থ ধাপ অর্থাৎ ফাইনাল। রিকার্ভ ও কম্পাউন্ড দলীয় দুই বিভাগে অংশ নিয়ে আরচাররা নিজেদের ঝালিয়ে নিয়েছেন ঘরের মাঠে ৮ নভেম্বর শুরু হতে যাওয়া ২৪তম এশিয়ান আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য। এশিয়ার প্রায় ২৯ দেশের চার শতাধিক আরচার (তীরন্দাজ) অংশ নেবেন এই টুর্নামেন্ট।

দু’বছর আগে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে হয়েছিল এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ২৩তম আসর। সেখানে প্রাপ্তির খাতা ছিল ফাঁকা। এর আগে ঢাকাতে হওয়া ২২তম আসরে বাংলাদেশ একটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জ জিতেছিল। মর্যাদার আসর আবার ফিরেছে নিজ আঙিনায়। তাই পদকের স্বপ্ন জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ ও আরচারদের চোখে।

বছর জুড়ে মোট চার ধাপে আট দলের রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে খেলা হয়। অর্থাৎ প্রতিটি দল প্রতি ধাপে সাতটি করে ম্যাচ খেলতে পারে। আগের তিন ধাপে রিকার্ভ বিভাগে পয়েন্টের ভিত্তিতে সমান অবস্থানে ছিল বিমান বাহিনী ও বিকেএসপি। রবিবার ফাইনালে দুদলই তাদের প্রথম ছয়টি করে ম্যাচ জেতে। শেষে দুদলের মুখোমুখি লড়াইয়ে নির্ধারিত হয় ভাগ্য। যেখানে বিমান বাহিনীর রামকৃষ্ণ সাহা, রাকিব মিয়া ও মিশাদ প্রধান ৬-০ সেট পয়েন্টে বিকেএসপি সাগর ইসলাম, আব্দুর রহমান আলিফ ও হিমেল সারোয়ারকে হারিয়ে সেরা হয়। রিকার্ভে তৃতীয় হয়েছে বাংলাদেশ আনসার। কম্পাউন্ড বিভাগে অবশ্য শুরুর ধাপ থেকেই এগিয়ে ছিল বিমান বাহিনী। শেষের দিকে বিকেএসপি জোর লড়াই করলেও আগের ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। সেরা হওয়া বিমান বাহিনী দলের হয়ে খেলেছেন হিমু বাছাড়, বন্যা আক্তার ও তরিকুল ইসলাম তাওহিদ। রানার্স-আপ হওয়া বিকেএসপি দলে খেলেছেন আল শাহরিয়ার জয়, আশিকুল ইসলাম ও কুলসুম আক্তার মনি। কম্পাউন্ডে তৃতীয় তীরন্দাজ সংসদ।

ফাইনাল শেষে এশিয়ান আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ১৬ সদস্যের বাংলাদেশ দল ঘোষণা করা হয়। মোট ১০ পদকের জন্য এশিয়া এমনকি বিশ্বের বড় বড় আরচারদের সঙ্গে জোর লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ নিতে হবে বাংলাদেশি আরচারদের। মার্টিন ফ্রেডরিখ মনে করেন ঘরের মাঠে হারানো গৌরব ফেরানোর সামর্থ্য তার শিষ্যদের আছে, ‘ঘরের মাটিতে ভালো পারফর্ম করতে চাই আমরা। শেষবার যখন (২০২১ সালে) এখানে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ হয়েছিল, আমরা তিনটি পদক পেয়েছিলাম। দুই বছর পর ব্যাংককে গিয়ে কিছুই পাইনি। তাই শেষবার এখানে যা হয়েছিল সেটারই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাই। পদকের মঞ্চে যাওয়াটাই আমাদের লক্ষ্য।’

ক্যারিয়ারের মধ্য গগনে খেলা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী নিবাস গড়েছেন তারকা আরচার দম্পতি রোমান সানা ও দিয়া সিদ্দিকী। রিকার্ভের অন্যতম সেরা হাকিম আহমেদ রুবেলও একই পথ ধরেছেন। এছাড়া রিকার্ভ আরচার নাসরিন আক্তার পেশাগত কারণে আছেন আরচারি থেকে দূরে। সব মিলিয়ে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে আরচারি অঙ্গনে। ফ্রেডরিখ অবশ্য যারা নেই তাদের ভাবনায় ঠাঁই দিতে রাজি নন, ‘যা নেই সেটা নিয়ে কথা বলতে চাই না। যারা আছে তাদের নিয়েই কাজ করতে হবে। খেলোয়াড় ও দলের ওপর আমার আস্থা আছে। পেছনে তাকিয়ে মন খারাপ করতে চাই না। দল শক্তিশালী, বিশ্বাস করে তারা বড় পদক্ষেপ নিতে পারবে।’

রিকার্ভ পুরুষ দলের সদস্য রামকৃষ্ণ সাহা রবিবার বিমান বাহিনীকে চ্যাম্পিয়ন করতে রেখেছিলেন বড় ভূমিকা। অভিজ্ঞ এই আরচার বলেন, ‘আমাদের পুরুষ রিকার্ভ দলের সবসময়ই একটা সম্ভাবনা থাকে। এই লিগটা আমাদের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতির বড় সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে টেম্পারমেন্ট কন্ট্রোল, আমাদের পারফরম্যান্স যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। ‘রিকার্ভ দলে তার সঙ্গী সাগর ইসলামের ফর্ম কিছুটা পড়তির দিকে। তারপরও ঘরের মাঠে নিজেকে ফিরে পেতে চান সর্বশেষ টোকিও অলিম্পিকে বাছাই উতরে সরাসরি খেলা সাগর। ট্রায়ালে ভালো না করায় সর্বশেষ আরচারি বিশ্বকাপ দলে ছিলেন না তারা। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ভালো করে নিজের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে চান তিনি, ‘একটা প্লেয়ারের সবসময় আপ্স অ্যান্ড ডাউন থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আমি এটাকে নেতিবাচকভাবে নিচ্ছি না। আশা আছে এই আসর দিয়ে নিজেকে ফিরে পাব।’

অন্যদিকে কম্পাউন্ড বিভাগে ভালো কিছুর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন হিমু বাছাড় ও বন্যা আক্তার।