ননস্টপ জট-গিট্টুতে ভোটের ঢোল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালে। সেখানে ক্ষমতা বদলের নমুনা বা আশা ছিল না। জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা সরকার, ঘটনার ঘনঘটায় বিতাড়িত না হলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের জন্য এমন উতলা হওয়া নসিবে জুটত না। এ অভিযাত্রায়ও বিচার, সংস্কার, ঐকমত্য, সনদ, গণভোট ইত্যাদি নিয়ে চলছে জটিলতা। কোনোটির গিট্টু না খুলে, একটির মধ্যে পাকছে আরেকটি। যুক্তি সবার কড়া। তার ওপর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা গেলে সেই পরিষদে ২৭০ দিনের মধ্যে অটোমেটিক্যালি তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার খড়গ। বিদ্যমান বা প্রচলিত ব্যবস্থায় নির্বাচন হলে, বিএনপিই বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে তা ধারণাযোগ্য। কিন্তু সেখানেও এখন হরেক বাগড়া। নানা বায়নায় দলটির বুক, মাটিতে লাগিয়ে ফেলার অবস্থা। এখন কোনো কারণে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন না হলে কী অবস্থা দাঁড়াবে এ প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।

কীসের মধ্যে, কী ভাবনা এসে যাচ্ছে ভাবা যায়? পাইপলাইনে আরও কত প্রশ্ন! এর মধ্যে প্রত্যেক দল অবস্থান ব্যাখ্যা করছে। এটিও মন্দের ভালো। মিটিং, সেমিনার, সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং, জরুরি প্রেস কনফারেন্সে যে যেভাবে পারছে, করছে। ফেসবুক পোস্টেও বেশ চলছে। অবশ্য তা মারামারি কাটাকাটির চেয়ে উত্তম। বিএনপির বার্তা থাকছে প্রতিদিন। এটি গোপন বা আড়াল-আবডালে নয়, প্রকাশ্যে। আবারও তারা জানালো, জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে। দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা ৮টি দল। জামায়াত ছাড়া বাকি ৭টি দল হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও ডেভেলপমেন্ট পার্টি। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারি ও নভেম্বরের মধ্যে গণভোট আয়োজনসহ পাঁচ দফা দাবিতে নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে আছে তারা। এর আগেও, পাঁচ দফা দাবিতে সমমনা আটটি দল অভিন্ন ও যুগপৎ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও চলমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে, গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য জানিয়েছে নতুন করে।

জানাজানি বা জানান দেওয়ার এ সিরিজে ঢুকে পড়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকস্ওু। বেশ ইন্টারেস্টিং বিষয়টি। তাদের টার্গেট পয়েন্টও বিএনপি। বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, বিএনপি মূলত জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে অস্বীকার করে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ ছাড়া গণভোটের মাধ্যমেই সংস্কারগুলোতে জনগণের ম্যান্ডেট নিশ্চিত করা উচিত। রবিবার রাতে ডাকসু সভাপতি সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ এবং এজিএস মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছে জুলাই বিপ্লব ছিল বৈষম্য, অবিচার ও ফ্যাসিবাদী শাসনকাঠামোর বিরুদ্ধে এ দেশের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার এক সম্মিলিত বিপ্লব। কেবল সরকার পরিবর্তন নয় বরং রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, স্বাধীন ও শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন, প্রশাসনিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং একটি বৈষম্যহীন-ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার আকাক্সক্ষা ছিল বিপ্লবের মূল ভিত্তি। নতুন প্রজন্ম চেয়েছিল, এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে কোনো ধরনের বৈষম্য ও রাজনৈতিক একচেটিয়া কর্র্তৃত্বের জায়গা থাকবে না। অবস্থা এখন যে জায়গায় ঠেকেছে, অপেক্ষা করতে হচ্ছে ডাকসুর পর জাকসু, রাকসু, চাকসুর দিকে। তারা কী বলে, কী বিবৃতি-কর্মসূচি দেয়, তা অগ্রাহ্য করা যায় না।

জানান দেওয়ার নতুন এ সিলসিলায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াই বা চুপ থাকবেন কেন? রবিবার ফেসবুকে নিজের আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানিয়েছেন নতুন এক অভিপ্রায়ের কথা। বলেছেন, বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ পেলে দেশের সব নাগরিককে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে এসে গণপ্রতিরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এ ধরনের ব্যবস্থা অপরিহার্য বলে মনে করেন তরুণ এই উপদেষ্টা। পোস্টে আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘আমাদের তরুণদের মৌলিক সামরিক শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়লে যাদের ক্ষতি, যারা আমাদের গোলামির  শেকল পরিয়ে রাখতে চাইবে, তারা আর সুযোগ পাবে না। সিস্টেমের ভেতরে থাকা কিছু এজেন্টের মাধ্যমে আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ প্রকল্পে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রকল্প অনুমোদনে আট থেকে নয় মাস+ সময় লেগেছে। এখন যখন বাস্তবায়নের পথে, তখন তৎপর পত্রিকাগুলো ন্যারেটিভ নির্মাণ শুরু করেছে।’

সজীব ভূঁইয়া অভিপ্রায় জানালেন, না নতুন গিট্টু যোগ করলেন? এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। সাম্প্রতিককালের ছোট কিন্তু বড় করে সামনে আনা জটিলতা ‘নোট অব ডিসেন্ট’। ‘নোট অব ডিসেন্ট’ এমনভাবে আলোচিত যেন বাংলার মানুষ তা কখনো আর দেখেনি, শোনেওনি। তাই এখানে ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর কথা একটু আনতেই হয়। ‘নোট অব ডিসেন্ট’ কি খুব বড় কিছু? এটি একটা সাধারণ আপত্তি। মনে আছে, হুদা নির্বাচন কমিশনে কমিশনার মাহবুব তালুকদারে কথা? ইসির নানা বিষয়ে প্রায়ই নোট অব ডিসেন্ট দিতেন? এরপর কী হতো? সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা খারিজ হয়ে যেত। সনদসহ নানা বিষয়ে কেবল বিএনপি নয়, আরও কিছু দলও দুয়েকটা বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। ঐকমত্য কমিশন এই নোট অব ডিসেন্টগুলো আমলে না নিয়ে তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সুপারিশসহ প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে। প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে তারা গণভোট অনুষ্ঠানের কথা বলেছে। এরপর জাতীয় নির্বাচনের পর ২৭০ দিনের মধ্যে সংসদ সনদে বর্ণিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে, অটোমেটিক্যালি সেগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এখনকার বিতর্ক গণভোট কবে হবে? বিএনপি প্রথমে গণভোটে আপত্তি করলেও, পরে রাজি হয়েছে। তবে শর্ত দিয়েছে, নির্বাচনের দিনই গণভোট হতে হবে। জামায়াতে ইসলামী নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট চায়। অর্থাৎ গণভোট নিয়ে দ্বিমত নেই। দ্বিমত হচ্ছে, সময় নিয়ে। এর আগে ক’দিন চলেছে, পিআর নিয়ে। যেন পিআরই সব। পেজগির এ ধারাপাতে ক’দিন কেটেছে শাপলা প্রতীক নিয়ে। যেন শাপলার ঘাপলার কারণে সব আটকে আছে। এ নিয়ে কত যে কথামালা! একেক সময় এমন একেকটা সামনে এনে গোটা জাতিকে একটা ভেল্কিতে ডুবিয়ে ছাড়া হচ্ছে। এখন তো শাপলার ঘাপলাও শেষ। শাপলার বদলে শাপলা কলিকেই প্রতীক হিসেবে মেনে নিয়েছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। রবিবার দুপুরে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পরই সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে প্রতীক মেনে নেওয়ার কথা জানান দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সঙ্গে শুনিয়ে দেন বাড়তি কয়েক কথা। বলেন, ‘এবার ধানের শীষের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে শাপলা কলিতে।’ এর পরপরই উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন নেতাকর্মীরা। তারা আগামী নির্বাচনে এ প্রতীককে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন। ফেসবুকে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতারা বিভিন্ন সেøাগানসহ পোস্ট দিয়েছেন। এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লেখেন, ‘গ্রাম-শহর, অলিগলি, জিতবে এবার শাপলা কলি।’ একইদিন বিকেলে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে দলীয় কর্মসূচিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহও নেতাকর্মীদের নিয়ে শাপলা কলির সেøাগান তোলেন। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছেন অনেকে। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, নিজের ফেসবুক আইডিতে লেখেন ‘দেশ-জনপদ, রাস্তা-গলি, জিতবে এবার শাপলা কলি।’

শাপলার ফয়সালা মানে সব ল্যাঠা শেষ? না, ল্যাঠা ছুটেও ছুটছে না। একটার পর আরেকটা। আর এ সবেরই উদ্দেশ্য বা মতলব বিএনপিকে ঘিরে। দলটিকে ফ্যাসাদে-যন্ত্রণায় ফেলার ব্যাপারে মোটামুটি একটা ঐকমত্য হয়েই আছে। রাজনীতির মাঠে আকারে-গুরুত্বে বড় হলেও, বিএনপিকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ঝামেলায় মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সেই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। নির্বাচন সামনে রেখে পড়েছে আরেক যন্ত্রণায়। বড়ত্ব ধরে রাখতে গিয়ে, সহ্য করতে হচ্ছে অনেক কিছু। নির্বাচনে বিএনপির বিজয় ঠেকাতে এখন থেকেই অপপ্রচার ও নোংরা রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নেওয়া শুরু হয়েছে। শিকার হতে হচ্ছে গুপ্ত-সুপ্ত তৎপরতার। তারপরও বলতে হচ্ছে, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা দলের পাশে ছিল, বিএনপি তাদের সঙ্গে থাকবে এবং কিছু আসন তাদের জন্য ছেড়ে দেবে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বলতে হয়েছে, দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে বিএনপির একাধিক যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী রয়েছে। তবুও বাস্তবতার কারণে প্রত্যেককে মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব নয়। বিএনপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেসব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আমাদের সহযোদ্ধা ছিলেন, তাদের কিছু আসনে সমর্থন দেওয়া হবে। এই বাস্তবতার কারণে কিছু আসনে বিএনপির প্রার্থীরা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। আবার এও বলেছেন,  ‘চারপাশে সুপ্ত আকাক্সক্ষায় গুপ্ত স্বৈরাচার ওত পেতে আছে’।

বাস্তব এ অবস্থা মোকাবিলার অনিবার্যতায়, শতাধিক আসনে আংশিক এমপি প্রার্থীর তালিকা ঘোষণা করতে পারে বিএনপি। এরপর অন্যান্য আসনে ধাপে ধাপে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে দলটি। সে লক্ষ্যেই সম্প্রতি সারা দেশের ৩০০ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন, বিএনপির শীর্ষ নেতারা। সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজারের মতো মনোনয়ন প্রত্যাশী উপস্থিত ছিলেন। এখন শতাধিক আসনে আংশিক এমপি প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হলেও, তাদের বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ডের মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এরপর নির্ভর করছে চূড়ান্ত মনোনয়ন। এরপরও নতুন বন্দোবস্ত, খেলাফত, জিহাদ, বিপ্লব, ইনসাফ ইত্যাকার শব্দের বয়ানে কাহিল হতে হচ্ছে দলটিকে। তারপরও গণতন্ত্রের যে গাছ লাগানো হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে, তাতে ফুল ফোটার অপেক্ষায় মানুষ। অপেক্ষায়-অপেক্ষায় যে দেশের ব্যবসা-বিনিয়োগ তলানিতে চলে যাচ্ছে, সেদিকে ভাবার ফুসরত নেই কারও কারও। দেশে ৫ আগস্ট পরবর্তী ১৪ মাসের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা করুণ। দিনে গড়ে ডজন খানেকের মতো খুনখারাবি। সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাঁ-না’র স্রোতে এসব তথ্য মূলধারার গণমাধ্যমের খবরে তলানিতে পড়ে থাকছে।

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রচলিত রাজনীতির ধারায় অভ্যস্ত নেতৃত্ব ও তাদের অনুসারীদের জন্য রাজনীতি কঠিন হয়ে পড়ছে। তা বুঝতে যার যত বেশি দেরি হবে, তার জন্য সামনের দিনগুলো কঠিন থেকে কঠিন হচ্ছে তা সাদা চোখেই মালুমযোগ্য।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

mostofa71@gmail.com