শান্তির সুবাতাসের বদলে চারদিকে শোনা যাচ্ছে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, ছিনতাই, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও গণপিটুনির খবর। মানুষের মনে তাই স্বাভাবিক প্রশ্ন কী হচ্ছে এসব? কেন হচ্ছে? রাষ্ট্র করছে কী? পুলিশ কি অসহায় হয়ে পড়েছে? আরও বড় প্রশ্ন বিপদে পড়লে মানুষ যাবে কোথায়? সম্প্রতি পাবনায় ১০ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তের বাড়িতে উত্তেজিত জনতার হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহীতে যানজটকে কেন্দ্র করে এক রিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমকে একটি আইফোনের লোভে হত্যার ঘটনায় তার মায়ের হৃদয়বিদারক ক্ষোভ ও হতাশা দেশবাসীকে নাড়া দিয়েছে। খুলনায় কথিত ‘ভাত চুরি’র অভিযোগে পিটিয়ে মারা হয়েছে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে নিখুঁজের দুই দিন পর ঝোপে লাশ মিলেছে শিশু মিমের। এর আগে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে যৌন নিপীড়ন ও হত্যার পর তার বাবার মন্তব্য ‘আমি বিচার চাই না’, রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি গভীর হতাশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। প্রায় নিত্য সংবাদমাধ্যমে আইনশৃঙ্খলার অবনতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসছে।
এ ধরনের ঘটনা শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান নয়; এগুলো মানুষের নিরাপত্তাবোধ ও রাষ্ট্রের ওপর আস্থার সংকটেরও প্রতিচ্ছবি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫,৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৩,৬৭৯ জন উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে এবং ২,০৩৮ জন তখনো অনুদ্ঘাটিত ছিল। ‘নিখোঁজ’ মানেই প্রতিটি ক্ষেত্রে অপহরণ বা অপরাধের শিকার হওয়া নয়, তবু এত বিপুলসংখ্যক শিশুকে ঘিরে উদ্বেগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। অন্যদিকে মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, কিশোর অপরাধ, ছিনতাই এবং স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতা নিয়ে মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে। সম্প্রতি রাজধানীর অটোরিকশাচালকদের একটি অংশের মাদক গ্রহণ ও মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগ অবশ্যই তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন; কোনো পেশার একটি অংশের আচরণ দিয়ে পুরো পেশাজীবী গোষ্ঠীকে বিচার করা যায় না। তবে মাদক অর্থনীতি যদি নগর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে, সেটি অবশ্যই জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। এখানে মূল প্রশ্নটি হলো মানুষ পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সুশাসনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে কেন? এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। বিরোধী বা ভিন্নমতের মানুষকে হয়রানি কিংবা ক্ষমতাবানদের স্বার্থে আইন প্রয়োগের অভিযোগ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে পুলিশ কি আইনের অধীন, নাকি ক্ষমতাবানদের অধীন? একইভাবে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা বেআইনি আচরণের অভিযোগও পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণœ করে। র্যাবের পরিবর্তে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি প্রতিষ্ঠার সাম্প্রতিক উদ্যোগকে তাই শুধু নাম পরিবর্তনের দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। নতুন বাহিনীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে তার পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। মানুষের আস্থা নতুন নাম দিয়ে নয়, বাস্তব আচরণ দিয়ে অর্জন করতে হবে।
বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সমস্যা কম নয়। মামলার দীর্ঘসূত্রতা, বিপুল মামলাজট, বিচারপ্রক্রিয়ার ব্যয় এবং আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা সাধারণ মানুষের জন্য বড় বাধা। একজন মানুষ মামলা করে যদি বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে থাকেন, তাহলে তার কাছে বিচার পাওয়ার অধিকারটি ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে উঠতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা। সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে আইন দ্রুত প্রয়োগ হচ্ছে, কিন্তু প্রভাবশালী ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই আইন ধীরগতিতে চলছে এমন ধারণা তৈরি হলে আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমে যায়। রাষ্ট্রের বৈধতা অনেকাংশে নির্ভর করে একটি মৌলিক বিশ্বাসের ওপর আইনের চোখে আমি এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তি সমান। রাষ্ট্রীয় সুশাসনের আরেকটি বড় বাধা হলো জবাবদিহির ঘাটতি। কোনো সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তি অন্যায় করেও যদি দায়মুক্তি পান, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে একটি ধারণা জন্ম নেয়, ক্ষমতার কাছে আইন দুর্বল। দুর্নীতির ব্যাপকতাও এই আস্থার সংকটকে আরও গভীর করে। পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে সমাধান পাওয়া কঠিন। একজন নাগরিকের ন্যায়বিচারের যাত্রা শুরু হয় থানায় অভিযোগ থেকে; এরপর তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ, প্রসিকিউশন, আদালত, রায় এবং শেষ পর্যন্ত রায় কার্যকর সবকিছু একটি ধারাবাহিক শৃঙ্খলের অংশ। এই শৃঙ্খলের একটি অংশ দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হয়। তাই প্রয়োজন সমন্বিত আইন, বিচার ও সুশাসন সংস্কার। প্রথমত, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পদায়ন ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, তদন্তে পেশাগত স্বাধীনতা এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, তদন্ত ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রমাণভিত্তিক করতে হবে। ফরেনসিক, ডিএনএ, ডিজিটাল প্রমাণ, সাইবার তদন্ত ও তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বিচারব্যবস্থায় মামলা জট ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কেস ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল নথি ও দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। দরিদ্র মানুষের জন্য আইনি সহায়তা আরও সহজলভ্য করতে হবে। চতুর্থত, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইন ভাঙলে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের ভিত্তি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গণপিটুনি বা মব জাস্টিস কোনোভাবেই বিচারব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।
মানুষ যখন মনে করে রাষ্ট্র বিচার দিতে ব্যর্থ, তখনই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সুশাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কোনো সরকারের বক্তব্যে নয়; একজন সাধারণ নাগরিকের থানায়, আদালতে কিংবা সরকারি অফিসে গিয়ে পাওয়া আচরণে। একজন মা কিংবা বাবা যখন নিখোঁজ সন্তানের সন্ধানে থানায় গিয়ে বিশ্বাস করেন পুলিশ তার পাশে আছে সেটিই রাষ্ট্রের শক্তি। একজন দরিদ্র মানুষ যখন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে বিশ্বাস করেন আইন তাকে রক্ষা করবে সেটিই আইনের শাসন। যখন একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে চরম শোক ও ক্ষোভে জর্জরিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম অপ্রতিমের মা বলেন, ‘এ দেশটি ধ্বংস হয়ে যাক। এ দেশের দরকার নাই’ আর একজন সন্তানহারা বাবা যখন বলেন, ‘আমি বিচার চাই না’, তখন সেটি শুধু একটি পরিবারের হতাশা নয়; রাষ্ট্রের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার অস্ত্র নয়, জনগণের আস্থা। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
আইনশৃঙ্খলা, সুশাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার গুরুত্বের বিষয়ে কয়েকটি বহুল উদ্ধৃতির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার রবার্ট পিলের সঙ্গে বহুলভাবে যুক্ত একটি কথা হলো ‘পুলিশ জনগণেরই অংশ এবং জনগণও পুলিশের অংশ’। এই নীতির অন্তর্নিহিত বার্তা হলো, পুলিশ ও জনগণের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা, ভয় নয়। এ প্রসঙ্গে আরও বলা হয়, ‘মানুষ যখন পুলিশকে বিশ্বাস করার পরিবর্তে ভয় পেতে শুরু করে, তখন পুলিশের সংকট আর শুধু পুলিশের সংকট থাকে না; তা রাষ্ট্রেরই সংকটে পরিণত হয়।’ চব্বিশের গণআন্দোলন ও ৩৬ই জুলাই সেই শিক্ষাই আমাদের দিয়েছে। ১৮২৯ সালের ১৬ মে কেন্টাকির লেক্সিংটনে এক ভাষণে মার্কিন রাজনীতিক হেনরি ক্লে বলেছিলেন, ‘সরকার একটি আমানত, আর সরকারের কর্মকর্তারা সেই আমানতের রক্ষক; সেই আমানত ও তার রক্ষক উভয়ই জনগণের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি।’ আর বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত জনাব বাকা বনাম রাষ্ট্র (হাঙ্গেরী) মামলায় ২০১৬ সালে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেছে, ‘আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের রক্ষক হিসেবে বিচার বিভাগকে তার দায়িত্ব সফলভাবে পালনের জন্য জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। আদালত আরও বলেছে, ‘গণতান্ত্রিক সমাজে আদালত যে ন্যায়বিচার প্রদানের যথাযথ প্রতিষ্ঠান সে বিষয়ে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস বিচার বিভাগের কর্র্তৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।’
প্রত্যাশা করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, প্রশাসনের বিভিন্ন অঙ্গের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং সর্বোপরি, সম্মানিত বিচার বিভাগের বিজ্ঞ বিচারকরা এসব অমূল্য বাণীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করবেন। কারণ রাষ্ট্রের ক্ষমতা জনগণের আস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিমূর্ত শক্তি নয়; এটি জনগণের অর্পিত দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ন্যায়, সততা, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি, মানবিকতা এবং আইনের সমান প্রয়োগই পারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের হারানো আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসুক পুলিশে নিরাপত্তার, প্রশাসনে সেবার এবং বিচারব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা থেকেই সেই আস্থার পুনর্জন্ম হোক।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মেজর, গবেষক এবং নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষক