জুলাইবিরোধী হওয়ায় ৬৩ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলো ইবি প্রশাসন

সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) জুলাইবিরোধী ৩০ জন শিক্ষক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত ও ৩৩ জন ছাত্রলীগ নেতার সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই শাস্তির আওতায় আনা হয়নি মূল হোতাদের বলে অভিযোগ উঠেছে। বাদ পড়েছেন আওয়াপন্থী সাবেক ভিসি, প্রোভিসি, প্রক্টর ও শাখা ছাত্রলীগ সভাপতিসহ কট্টর জুলাইবিরোধী শিক্ষক-কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগ নেতারা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষক ও ছাত্রসংগঠনগুলো। একইসঙ্গে এই কার্যক্রমকে পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ বলে আখ্যা দেন তারা। এদিকে এক সপ্তাহের মধ্যে জুলাইবিরোধী সকলকে শাস্তির আওতায় আনার দাবিও জানান ছাত্র সংগঠনগুলো। 

ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ মার্চ জুলাইবিরোধী শিক্ষক-কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের চিহ্নিতকরণে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রশাসন। কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলে অভিযুক্তদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭১ তম সিন্ডিকেট সভায় জুলাই বিরোধী ৬৩ শিক্ষক কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীকে সাময়িক বরখাস্ত এবং সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া বহিষ্কৃত শিক্ষকদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে শাস্তি নির্ধারণ কমিটি করবেন বলে জানান উপাচার্য।

তবে এই শাস্তির তালিকায় নাম আসেনি কট্টর জুলাইবিরোধী শিক্ষক-কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগ নেতাদের। তাদের মধ্যে-সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, অধ্যাপক ড. হারুনূর রশীদ আসকারি, সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক ড. শাহিনুর রহমান, সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেন আজাদ, অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেন, সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন ভূঁইয়া, সাবেক সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. আরিফুল ইসলাম, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মামুনুর রহমান। এছাড়া শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাতের নামও আসেনি এই তালিকায়। এদের নাম না আসার প্রতিবাদে রবিবার বিক্ষোভ মিছিল করেন শাখা ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আওয়ামী শাসনামলে এই শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অরাজকতা ভিন্নমত দমন পীড়ন, নিয়োগ বাণিজ্য, ক্রসফায়ারের হুমকিসহ জঙ্গি নাটক, আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে নানা চক্রান্ত করে তাদেরকে নৈরাজ্যকারী বলে পুলিশে দেওয়ার অভিযোগ করেছে একাধিক শিক্ষার্থী। এসব অভিযোগ থাকা সত্বেও কেন তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হলো না প্রশ্ন তুলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ বলেন, তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও চক্রান্তমূলক। ফ্যাসিস্ট ভিসি-প্রো-ভিসি ও তাদের সহযোগীদের নাম তালিকায় নেই। ৪ আগস্ট আন্দোলনবিরোধী মিছিলে অংশ নেওয়া অনেকের নামও বাদ দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতিবাজ ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদেরও রহস্যজনকভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে তিনি ফেসবুক পোস্টে দাবি জানান।

সমন্বয়ক এস এম সুইট জানান, যারা গণহত্যার বৈধতা দিয়েছিল তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে প্রশাসন থেকে একটা তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু সেই তালিকায় অনেক রাঘব-বোয়ালদের নাম আসে নাই। যারা গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে তাদেরও নাম আসে নাই। আগামী এক সপ্তাহে মধ্যে জুলাইবিরোধী সকলকে শাস্তির আওতায় আনার জন্য হুশিয়ারি দেন তিনি। 

জুলাইবিরোধীদের চিহ্নিতকরণ তদন্ত কমিটির সদস্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কমিটিকে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে তাদের নাম এসেছে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আকতার হোসেন বলেন, আমাদের কাজ ছিল তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কারো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপেক্ষিত হয়েছে বা কম প্রভাবশালী কেউ অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এটা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। আমরা ব্যক্তিগত আক্রোশ, পক্ষপাত বা প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করেছি। যে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি, তার আলোকে নিরপেক্ষভাবে রিপোর্ট দিয়েছি। তথ্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল হল, বিভাগ ও দপ্তরে উন্মুক্ত চিঠি পাঠিয়েছিলাম। বিভিন্ন লিখিত অভিযোগ, পত্রিকার প্রতিবেদন, ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে এই রিপোর্ট তৈরি করেছি। 

সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি কেউ প্রমাণ দিতে পারেন যে তদন্ত কমিটি অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা নিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তাহলে আমি নিজেই চাকরি থেকে অব্যাহতি নেব।