বিশ্বকাপ একজন ফুটবলারের জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য : মেসি

‘বিশ্বকাপ জয় তার ক্যারিয়ারের সংজ্ঞা নয়’, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এমন বিতর্কিত মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ জয় একজন ফুটবলারের জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য।’

৮ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসি আর ৫ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী রোনালদো দুজনেই দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলের শীর্ষে থেকে একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং অসাধারণ সাফল্যে খেলাটিকে বদলে দিয়েছেন। এখনো ইউরোপের বাইরে খেললেও, দুজনকে ঘিরে ‘কে সেরা’ এই বিতর্ক থামেনি। ৪০ বছর বয়সেও সৌদি আরবের আল নাসরের হয়ে গোল করে যাচ্ছেন রোনালদো, আর ৩৮ বছরের মেসি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামির হয়ে এমএলএসে দারুণ পারফর্ম করছেন।

অনেকের মতে ২০২২ বিশ্বকাপে মেসির ট্রফি জয়েই এই বিতর্কের ইতি ঘটে। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ৩-৩ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে জয় এনে দেন তিনি দুটি গোল করেন নিজেও। রোনালদো অবশ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিরোপা পেয়েছেন ২০১৬ ইউরো জিতেছেন, এছাড়া দুটি উয়েফা নেশন্স লিগও জয় করেছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ তার নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নেওয়ার পর টানেলের পথে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়েন তিনি। সেই সময় ইনস্টাগ্রামে রোনালদো লিখেছিলেন, ‘পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপ জয় আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং উচ্চাকাক্সক্ষী স্বপ্ন।’

তবে সম্প্রতি পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোনালদো বলেন, তার ক্যারিয়ার বিশ্বকাপ জয়ে সংজ্ঞায়িত নয়, ‘একটা টুর্নামেন্টে জেতা ছয়-সাতটা ম্যাচের ব্যাপার এর ওপর ভিত্তি করে যদি বলা হয় কে ইতিহাসের সেরা, তা কি ঠিক?’

মেসি অবশ্য বিষয়টিকে একেবারে ভিন্নভাবে দেখেন। তার মতে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া ‘একজন ফুটবলারের জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য’, যা তার কাছে নিজের ক্যারিয়ারের এক পরিপূর্ণ সমাপ্তি। বুধবার ফ্লোরিডায় আমেরিকা বিজনেস ফোরামে মেসি বলেন, ‘সেই মুহূর্তের অনুভূতি ব্যাখ্যা করা কঠিন। ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে, সতীর্থদের জন্য, আর দেশের জন্য ওই শিরোপার মানে ছিল অপরিসীম। দেশের আনন্দ উদযাপনেই বোঝা যাচ্ছিল, কতটা আকাক্সক্ষা ছিল আমাদের সেই সাফল্যের জন্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার জন্য এটা বিশেষ ছিল, কারণ কোনো খেলোয়াড়ের জন্য বিশ্বকাপ জয়ই সবচেয়ে বড় অর্জন। অন্য যে কোনো পেশার মতোই এটা নিজের কাজের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো। এরপর আর কিছু চাওয়ার থাকে না। আমি সৌভাগ্যবান যে এর আগে ক্লাব ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সব কিছুই জিতেছিলাম। জাতীয় দলের হয়ে কোপা আমেরিকাও পেয়েছিলাম। শুধু বিশ্বকাপটাই ছিল বাকি টুকরো। সেই ট্রফিটা হাতে পাওয়াই যেন আমার পুরো ক্যারিয়ারের পরিসমাপ্তি।’

মেসি তার ক্যারিয়ারের পরিবর্তনের সময়গুলো নিয়েও খোলাখুলি বলেন, ‘বার্সেলোনা থেকে প্যারিসে যাওয়া কঠিন ছিল, কারণ আমরা সেখানেই জীবনের বড় সময় কাটিয়েছি। শহরে মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম, কিন্তু ফুটবল জীবনে তখন আনন্দ পাচ্ছিলাম না। তবুও পারিবারিকভাবে অনেক ইতিবাচক অভিজ্ঞতা হয়েছে।’

ইন্টার মায়ামিতে নতুন শুরু নিয়ে মেসি বলেন, ‘মায়ামিতে আসাটা ছিল একেবারে পরিবারের সিদ্ধান্ত। যেখানেই থাকতে চাও, সেখানে থাকা সবকিছু সহজ করে দেয়। এখানে আসার পর থেকেই অভিজ্ঞতা অসাধারণ। শহরটা অবিশ্বাস্য, মানুষগুলো প্রথম দিন থেকেই দারুণ ভালোবাসা দেখিয়েছে।’

মেসি বলেন, ব্যর্থতা থেকে শিখেছেন তিনি, ‘আমি সবসময় হার থেকে ইতিবাচক কিছু নিতে চেষ্টা করেছি। বুঝেছি, খেলায় জয়-পরাজয় দুটোই থাকবে। সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে আমার পরিবার আর কাছের মানুষগুলো পাশে থেকেছে ওরাই আমার শক্তি।’

যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের উত্থান প্রসঙ্গে মেসি বলেন, ‘ইন্টার মায়ামির পাশাপাশি পুরো এমএলএসই এখন বদলে গেছে। আমরা পূর্ণ দর্শকে খেলে যাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের জনপ্রিয়তা অসাধারণভাবে বেড়েছে।’ নিজের নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ মাস মেসি ড্রিংক, মিলানেসা ক্লাব নিয়ে মেসি বলেন, ‘দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষে নতুন কিছু শেখার সময় এসেছে। ফুটবলেরও একসময় শেষ হয়। ব্যবসায়িক জগৎ আমাকে আকর্ষণ করে, এখনো শেখার পর্যায়ে আছি, কারণ এ বিষয়ে আমি নতুন।’

২০২৬ বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে মেসি বলেন, ‘যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, এবারও তারা অসাধারণ কিছু করবে। আমি বিশ্বাস করি, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হবে এক অনন্য আয়োজন স্টেডিয়াম, আয়োজন ক্ষমতা ও দর্শকসংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্র সেরা।’

সাক্ষাৎকারের শেষে মেসিকে মায়ামি শহরের প্রতীকী চাবি প্রদান করেন মেয়র সুয়ারেজ।